”কী সব্বোনাশ, বাড়িতে এসে গেছে! বাঙ্গালোরেও এসেছিল যাত্রীর একজন, মহাদেব সামুই…কার সঙ্গে কথা বলছে?”
”পিসির সঙ্গে এবার কথা শুরু করবে। বেগারদা এতক্ষণ ছিল তাই…”
”শিগ্গিরি পিসিকে ডাক আমি কথা বলব, কায়দা করে ডাকিস ঘুনুদা যেন বুঝতে না পারে।”
শ্যামলা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ”পিসি ফোন, তোমার এক ছাত্রীর মা কথা বলবেন।”
রেখা গুপ্ত তাড়াতাড়ি এসে ফোন ধরলেন, ”হ্যালো, আপনি…”
”পিসি আমি নাকু, লোকটা কেন এসেছে?”
”বোধ হয় তোকে ওদের ক্লাবে খেলতে বলবে।”
”তুমি কিচ্ছু কমিট করবে না, বলবে যা বলার নাকুকেই বলুন।”
”তাই বলব। তোর ভাত তা হলে রাখব তো?”
”না, রাখার দরকার নেই। এখন আমি বাড়িমুখোই হব না। দুপুরে কোথাও খেয়ে নেব, রাতে ফিরব। এখন একবার দুলালদার মানে দুলাল চক্রবর্তীর অফিসে যাব। ঘুনুদা আশপাশে কোথাও নির্ঘাত ঘাপটি মেরে থাকবে। সন্ধে পর্যন্ত আমি বাড়ির দিকে মাড়াব না।”
”তা হলে ওকে এখন কী বলব?”
”বললাম তো, নাকুর সঙ্গে কথা বলবেন, নাকুর ফুটবলের ব্যাপারে আমি নাক গলাই না, ব্যাস। এখন রাখলাম।”
রেখা গুপ্ত চিন্তিত মুখে রিসিভার রাখলেন। সেই মুখ নিয়েই এসে বসলেন ঘুনু মিত্তিরের সামনে।
”কোনও দুঃসংবাদ?”
”হ্যাঁ। আমার এক ছাত্রীকে কারা যেন কিডন্যাপ করার চেষ্টা করছে। ওর মা ভয় পেয়ে মেয়েকে আমার কাছে কিছুদিন রাখতে চাইছে।” রেখা গুপ্ত খুবই অস্বস্তিভরে বললেন। মিথ্যা কথা অম্লান বদনে তিনি বলতে পারেন না।
”কী ভয়ঙ্কর কথা! পুলিশে খবর দিয়েছে? ছাত্রীর বয়স কত? নিশ্চয় খুব বড়লোক।’ উত্তেজিত ঘুনু মোড়া থেকে নিজেকে বিঘতখানেক তুলে আবার নামিয়ে রাখলেন।
”দিয়েছে। কিন্তু পুলিশ কী করতে পারে? তারা বলেছে মেয়েকে এখন বাড়ি থেকে বের করবেন না। আট বছর বয়স, সারাদিন বাড়িতে বন্দি থেকে বেচারার কী কষ্ট হচ্ছে ভাবুন তো? ওকে বরং আমার এখানেই নিয়ে আসি।”
”কিন্তু এখান থেকেও তো কিডন্যাপ হতে পারে।” ঘুনু বিপদ সম্পর্কে হুঁশ করিয়ে দিলেন।
”আমার এখান থেকে!” রেখা গুপ্ত যেন স্তম্ভিত হলেন ঘুনু মিত্তিরের অজ্ঞতার পরিচয় পেয়ে। ”আমি রয়েছি, মলা রয়েছে, এই ওঁরা এতক্ষণ যাঁরা এখানে ছিলেন, পেছনের নেতাজিনগর আর শহিদ কলোনির লোকেরা—কিডন্যাপওলাদের সাহস হবে? বরং ওদের ধরে আমিই কিডন্যাপ করে রেখে দেব।”
”কিন্তু তাদের পাবেন কী করে? তারা তো মোটরে করে আসবে, মেয়েটার মুখ বেঁধে গাড়িতে তুলেই বোঁওও করে… দেখেন না টিভি সিরিয়ালে কীভাবে বাচ্চচাদের ধরে?”
”দেখেছি। ওইভাবে ধরতে আসুক না। তা হলে আমিও এইভাবে…” রেখা গুপ্ত হঠাৎ ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে ঘুনু মিত্তিরের বুশ শার্টের কলার ধরে উঠে দাঁড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে ঘুনুও উঠলেন। ”কিডন্যাপ করতে আসা?…অ্যাঁ কিডন্যাপ? দেখাচ্ছি মজা।” কলার ধরে পাকা জাম পাড়ার মতো ঘুনুকে ঝাঁকি দিয়ে আবার বললেন, ”কিডন্যাপ করে টাকা কামাবে ভেবেছে?”
”আ—আমি কিডন্যাপার নই, উঁহুহু লাগছে, ছাড়ুন ছাড়ুন।” ঘুনুর মুখে রক্ত জমে লাল, চোখ দুটি গর্ত থেকে প্রায় এক কিলোমিটার বেরিয়ে এসেছে।
রেখা গুপ্ত লজ্জিত হয়ে কলার ছেড়ে দিলেন। ”একসাইটেড হয়ে…ছি, ছি, আমায় মাফ করবেন।” হাত জোড় করলেন তিনি।
”উফফ কী গায়ের জোর!” বিড়বিড় করলেন ঘুনু মিত্তির। শ্যামলা চুপচাপ ব্যাপারটা দেখছিল। নম্রস্বরে বলল, ”বরফ আনব? গলায় ঘষলে ব্যথা আর থাকবে না।”
”না না, বরফ টরফ দরকার নেই, আমার কিছু হয়নি।”
”পিসি একটু রাগি, নইলে মানুষটা খুবই নরম।” শ্যামলা ঢোঁক গিলল কটমট তাকিয়ে থাকা পিসির সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে।
”সত্যিই আমার মনটা খারাপ লাগছে। আমার এখন মুন্নির কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে, মলা যাবি আমার সঙ্গে?” বলেই রেখা গুপ্ত ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। ”হ্যাঁ, বলছিলেন কী যেন দরকার আছে আমার সঙ্গে? তাড়াতাড়ি বলুন।”
ঘুনু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছেন পিসির এলোমেলো কথা আর আচরণে। নিজেকে ধাতস্থ করতে করতে বললেন, ”নাকু এ বছর যাত্রীতে আসুক…ওর পুরনো যা পাওনা সবই পেয়ে যাবে আর সারথিতে যা পাচ্ছে তার থেকে…আপনি জানেন তো নাকুকে আমিই দর্জিপাড়া থেকে যাত্রীতে এনেছিলাম ষাট হাজার টাকায়? আজ আবার আমি এসেছি এক লাখ ষাট হাজার দর নিয়ে।”
”তা আমার কাছে কেন? নাকুর আর ফুটবলের ব্যাপার এটা, আমি এর মধ্যে নাক গলাতে চাই না।” রেখা গুপ্ত মৃদু শান্ত স্বরে বললেন।
”আপনি যে নাকুর কতখানি তা কি আমি জানি না? রোজগারের এটাই বয়স। টপ ফর্মে থাকার সময় কিছু কামিয়ে নেওয়া। এবার আমরা খুব ভাল টিম করব, ওর মতো একটা স্ট্রাইকারের যা দাম তা আমরা নিশ্চয়ই দেব। সারথিতে পাচ্ছে তো এক—তিরিশ, আমরা এক ষাট দেব।” ঘুনু ধীরে মেপে মেপে কথাগুলো বলার সময় রেখা গুপ্তর মুখভাব লক্ষ করছিলেন। কিন্তু কোনও ভাবান্তর দেখতে না পেয়ে অস্বস্তিতে পড়লেন।
”আপনি এসব কথা নাকুকেই বলবেন। আমি চাকরি করি, দাদা চাকরি করেন, নাকু তো করেই, আমাদের এতেই মোটামুটি চলে যায়।” রেখা গুপ্ত আরও মৃদু স্বরে বললেন।
”না, না, টাকার লোভ আপনাদের দেখাব, এত ধৃষ্টতা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। নাকু এখন বড় প্লেয়ার। ইন্ডিয়া ক্যাম্পে রয়েছে, ক্যাপ্টেন হবে বলেই শুনেছি। দেশের ক্যাপ্টেন হওয়া তো বিরাট মর্যাদা। আমাদের ক্লাবও সেই মর্যাদার কিছুটা পাবে যদি নাকু যাত্রীতে আসে।” ঘুনুর অস্বস্তি আরও বাড়ল কারণ রেখা গুপ্তর মুখভাব এখনও ধ্যানী বুদ্ধের মতোই রয়ে গেছে।
