”সাকসেসফুল! অ্যাঁ, মধুছন্দা তা হলে পারল!” ভচটায প্রায় হাততালি দিয়ে ফেলেছিলেন যদি না তখন মালবিকা ‘হ্যাঁচ্চেচা’ করে উঠতেন।
”ওহহ, আই অ্যাম সরি।” ঘুনু কাঁচুমাচু হলেন।
”নস্যি একটা খুব বাজে নেশা।” এতক্ষণে রেখা গুপ্ত মুখ খুললেন। ঘুনু মিত্তিরকে এই প্রথম কোণঠাসার মতো দেখাল। শুধু নস্যির গুঁড়ো ছড়িয়ে একজন মাহিলাকে হাঁচিয়ে দেওয়ার জন্যই নয়, রেখা গুপ্তর বিরক্তি উৎপাদনের কারণ হওয়াটাই তাঁকে কিছুটা ঘাবড়ে দিল। আসলে তিনি এসেছেন তো নাকুর পিসিকে তুষ্ট করতে। ঘুনু খবর নিয়ে জেনেছেন; সমীরণ গুপ্তকে তুলতে হলে জালটা ফেলতে হবে তার পিসির ওপর। পিসি হ্যাঁ বললে ভাইপো কখনও না বলবে না।
”নস্যি আমি এখনিই ছেড়ে দেব। ঠিক বলেছেন, খুব বাজে নেশা।” ঘুনু ডিবেটা বাড়িয়ে দিল শ্যামলার দিকে, ”মা, তুমি এটা এখুনি বাইরে ফেলে দাও তো।”
সারা ঘরে থতমত অবস্থা। চারজন বেগার সমস্বরে ”না না না” বলে উঠলেন। শ্যামলা নিজের হাত টেনে নিল। রেখা গুপ্ত রীতিমতো অপ্রস্তুত।
”না কেন? আমি এখনই…ওঁর সম্মান, ওঁর কথা, ওঁর নির্দেশ আমি এখনই রক্ষা করব।” ঘুনু উত্তেজিত হয়ে মোড়া থেকে উঠে জানলার কাছে গেলেন। ডিবেটা কপালে ঠেকিয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইরে ছুড়ে বলে উঠলেন, ”হতভাগা নস্যি, দূর হ। জীবনে আর তোকে নাকে ঢোকাব না।”
”আমি তো আর ফেলে দিতে বলিনি।” রেখা গুপ্তর গলায় অনুশোচনার মতো ক্ষীণ সুর। ঘুনুর কানে সেটা ধরা পড়ল। একটা নস্যির ডিবে, ক’টাই বা টাকা! কিন্তু চারভাগের তিন ভাগ কাজ তো এগিয়ে রইল।
”হ্যাঁ, কী যেন বলছিলাম?” ঘুনু যেন সদ্য ঘুম থেকে উঠলেন এমনভাবে তাকালেন।
”মধুছন্দা বেরিয়ে আসছে বটা বিশ্বাসের ফ্ল্যাট থেকে, সঙ্গে দুলাল আর কোলে বাচ্চচা।” ভটচায সঙ্গে সঙ্গে সূত্র ধরিয়ে দিলেন।
”হ্যাঁ, ওরা বেরিয়ে এসে ট্যাক্সিতে উঠল। ট্যাক্সি ওদের বাড়ির দিকে চলতে শুরু করল। মধুছন্দা তখন খুশিতে ডগমগ হয়ে কী বলল জানেন?” ঘুনু চোখ বিস্ফারিত করে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
”বটা বিশ্বাসের কবজা থেকে দুলালকে বের করে এনেছি।” সরোজ বললেন।
”সারথির টাকার ফাঁস খুলে দুলালকে বাঁচিয়ে দিলাম।” জি. সি. দত্তর অনুমান।
”পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বেশি দেবেন বলেছেন, মনে থাকে যেন।” মালবিকা নিশ্চিত স্বরে আন্দাজ করলেন।
ভটচায মাথা নেড়ে জানালেন তিনি কিছু বলতে চান না।
‘মধুছন্দার গলায় একটা সোনার হার ঝুলছে যেটা আগে দেখিনি। সেইটা হাতে করে তুলে আমায় বলল, ‘বটাদা এত ভাল, এত সুন্দর মানুষ, দেখুন হারটা, প্রায় দু’ভরি তো হবেই। জানেন, বউদিকে উনি বললেন, তোমার বোন আজ প্রথমবার এসেছে, ওকে একটা উপহার তো দেবে। তারপর নিজেই বউদির গলা থেকে হারটা খুলে আমার গলায় পরিয়ে দিয়ে বললেন, সুন্দর মেয়ের গলাতেই এই হার মানায়। উহ বটাদা যে কী ভাল! না না, দুলাল সারথিতেই থাকবে, বাড়তি পঁয়ত্রিশ হাজারে আমাদের দরকার নেই। বুঝলেন এবার?” ঘুনু সবার মুখের দিকে না তাকিয়ে এবার জানলার বাইরে দৃষ্টি পাঠালেন।
খুক খুক করে প্রথমে হেসে উঠল শ্যামলা। তারপর ঘুনু বাদে অন্যরা।
”কিন্তু দুলাল যে অ্যাডভান্স আর গুঁড়ো নিয়েছিল, তার কী হল?” জি সি দত্ত মনে করিয়ে দিলেন।
”ট্যাক্সি থেকে নেমে মধুছন্দা বাচ্চচা কোলে বাড়িতে ঢুকে যাওয়ার পর দুলাল আমার হাত ধরে বলল, ঘুনুদা পারিবারিক অশান্তির মধ্যে আর যাব না। অ্যাডভান্সের টাকা আমি ফিরিয়ে দেব তবে গুঁড়োটা খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু ভেবো না যে মেরে দেব। সামনের বছর যাত্রীতেই আবার ফিরে আসব, তখন অ্যাডজাস্ট করে নিয়ো।”
”অ্যাঁ, সারথিতে সইসাবুদ করার আগেই বলে দিল পরের বছর দল পালটাবে! এ কী রে বাবা!” সরোজকে হতভম্ব দেখাচ্ছে।
”কলকাতায় হাতে গোনা যে—ক’জন ফুটবল খেলতে পারে, দুলাল তাদের একজন। গত এগারো বছরে সাতবার সারথি আর যাত্রী করেছে। বয়স হয়ে গেছে, সত্তর মিনিটের ম্যাচ আগের মতো আর খেলতে পারে না। না পারলেও এক্সিপিরিয়েন্সের তো দাম আছে। সেটাও অনেকখানি কাজ দেয়। বহুবার ইন্ডিয়া টিমে খেলেছে, নাম আছে, সাপোর্টাররাও নামী প্লেয়ার চায়।” ঘুনু মিত্তির এর বেশি আর কিছু বললেন না।
”তা হলে এ—বছর দুলাল চক্রবর্তী যাত্রীতে আসছে।” মালবিকা জানতে চাইলেন না, ঘোষণা করলেন। ঘুনু স্মিত হেসে মাথা কাত করলেন।
”তা আপনি এই সাতসকালে নাকুর খোঁজে এখানে এসেছেন, কী ব্যাপার?” রেখা গুপ্ত গম্ভীর গলায় সোজা প্রশ্ন রাখলেন।
”বুঝতেই তো পারছেন। যাত্রীতে নাকু এই বছর খেলবে এই প্রার্থনা নিয়েই আপনার কাছে আসা।” ঘুনু প্রার্থনা বোঝাতে হাতজোড় করলেন।
”ইয়ে,” জি. সি. দত্ত হাতঘড়ি দেখে খবরের কাগজ হাতে উঠে দাঁড়ালেন। ”নাতিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসার টাইম হল।”
বাকি তিনজনও উঠলেন। টাকাকড়ি, দলবদল—সংক্রান্ত আলোচনায় বাইরের লোকেদের থাকা উচিত নয়। অবশ্য ওঁরা জানেন, যা কিছু কথাবার্তা হবে সবই কাল সকালে জেনে যাবেন।
ভেতরের ঘরে ফোন বেজে উঠল। শ্যামলা ছুটে গিয়ে রিসিভার তুলল।
”কে, মলা?”
”দাদা! কোত্থেকে ফোন করছিস?”
”হাওড়া স্টেশন থেকে, ট্রেন বেশি লেট করেনি। পিসি কী করছে?”
”ঘুনু মিত্তির নামে একটা লোক এসেছে তোমায় খুঁজতে, ডাইনিংয়ে বসে আছে।..”
