”পিসি, মুন্নিদের বাড়ি যাবে না?” শ্যামলা মনে করিয়ে দিল।
”ওহ হ্যাঁ, স্নানটা করেই…” রেখা গুপ্ত উঠে দাঁড়িয়ে আলোচনায় ইতি টেনে দিয়ে বললেন, ”যা বলার নাকুকেই বলবেন। আমায় বলে কোনও লাভ নেই।”
ঘুনু মিত্তির চলে যাওয়ার পরই পিসি আর ভাইঝির খুকখুক হাসি হোহো—তে রূপান্তরিত হল।
।। ৩ ।।
দুলাল চক্রবর্তী চাকরি করে ব্যাঙ্ক অব বেনারসের চৌরঙ্গি শাখায়। হাওড়া স্টেশন থেকে সমীরণ ট্যাক্সিতে যখন ব্যাঙ্কের সামনে নামল তখন বেলা প্রায় এগারোটা। সঙ্গে একটা সুটকেস। কয়েকবার সে এই ব্যাঙ্কে দুলালের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, অনেকের সঙ্গেই তার চেনা। এখানে সারথি এবং যাত্রী দুই ক্লাবেরই কিছু সমর্থক কাজ করে। কাউন্টারের বাইরে সমীরণকে দেখেই অল্পবয়সি একজন টেবিলের কাজ ফেলে উঠে এল।
”সমীরণদা, বাঙ্গালোর থেকে কবে ফিরলেন?”
”এইমাত্র। হাওড়ায় নেমেই সোজা এখানে।” সমীরণ সুটকেসটা দেখাল। ”অরুণ, দুলালদা কোথায়?”
”এই তো মিনিট কুড়ি আগে সারথির নির্মাল্য রায় এসে ওঁকে ডেকে নিয়ে গেলেন। সামনেই তো ক্লাবের ইলেকশন, হয়তো ভোট ক্যানভাসিংয়ের জন্য গেছে। আপনাকেও যদি পায় তো কাজে নামিয়ে দেবে।” অরুণ গলা নামিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল।
”পাবে না। এসব কাজ যে আমি করি না সেটা সবাই জানে।”
”কারা জিতবে মনে হয়? বটা বিশ্বাসরা তো খুব তোড়জোড় করেই নেমেছে।”
”বটাই জিতুক কি নির্মাল্যই জিতুক, তা নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমার কাজ যেটা, আমি শুধু সেটাই করি।” সমীরণ হাসল। তার কাজটা যে কী সেটা আর বলার দরকার হল না।
”দুলালদার কাছ শুনেছি কেরল থেকে বিনু জন—কে আনার জন্য লোক গেছিল। গোয়ার আলবুকার্কের সঙ্গেও নাকি কথাবার্তা চলছে। দু’জনেই তো স্ট্রাইকার। ওরা এলে তো আপনার…” অরুণের মুখে বিপন্নতার মতো একটা ভাব ফুটে উঠল। যেন সমীরণ নয়, সে নিজেই মুশকিলে পড়বে, এই দু’জন সারথিতে এলে।
সমীরণের কপালে একটা ভাঁজ উঠেই মিলিয়ে গেল। কথাটা সে দিনদশেক আগে বাঙ্গালোরেই শুনেছে কেরলের নুর মহম্মদের কাছে। বিনু জনের বাবার কাছে সারথি থেকে একজন গেছল। সে নাকি বলেছে সমীরণের সঙ্গে ক্লাব অফিসিয়ালদের সম্পর্ক ভাল নয়, তাই সারথি ওকে ছেড়ে দেবে যদি বিনু খেলতে রাজি হয়। সেদিন শুনে সমীরণ মনে মনে হেসে কথাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিল।
তার সঙ্গে অফিসিয়ালদের সম্পর্ক খারাপ, এমন একটা কথা ক্লাবে বছর দুই ধরে চাউর হয়েছে। ক্লাবের দুটো গোষ্ঠীর কোনওটির সঙ্গেই তার মাখামাখি নেই, সে কোনও কর্তার অনুগ্রহে খেলছে না, নিজস্ব কোনও চক্র সে তৈরি করেনি। এই তিনটিই তার বিরুদ্ধে কাজ করছে। সবার সঙ্গে সদভাব রেখে যে চলবে কলকাতার তারকা ফুটবল সমাজে সে সন্দেহজনক লোক বলে চিহ্নিত হবে। সমীরণেরও তাই হয়েছে। শত্রু নেই এ কেমন লোক! সুতরাং এ বিপজ্জনক, একে ভাগাও।
সমীরণকে ভাগাবার চেষ্টা গত বছরই হয়েছিল পঞ্জাব থেকে কার্নাইল সিং আর আলিগড় থেকে ইরানি ছাত্র রফসঞ্জানিকে এনে। দু’জনে মোট চারটে ম্যাচ খেলে কলকাতা থেকে বিদায় নিয়ে আর আসেনি। রটনা হয়েছিল, সমীরণ এবং আর কয়েকজন প্লেয়ার ‘ক্লিক’ করে ওই দু’জনকে খেলার সময় বল না দিয়ে বা ধরা যায় না এমন পাশ দিয়ে হাজার হাজার সমর্থকদের সামনে অপদস্থ করেছে। আরও কী, বন্ধু খবরের কাগজের রিপোর্টারদের দিয়ে নাকি ওদের বিরুদ্ধে ঝাঁঝালো মন্তব্যও লিখিয়েছিল। এই সবই নাকি সমীরণের মস্তিকপ্রসূত!
সমীরণ জানে, সব রটনাই বটা বিশ্বাসের ‘কোটারি’ থেকে বেরিয়েছে। রটনাকে সে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। মাথার মধ্যে গেঁথে থাকা একটা কথাকেই শুধু সে সারসত্য বলে মেনে রেখেছে; এত টাকা যখন নিচ্ছ, সেইমতন খেলাটাও দিয়ো। সারথির সাপোর্টাররা স্বচক্ষেই মাঠে দেখেছে সমীরণের খেলায় আন্তরিকতা। সে জানে ওরাই তার রক্ষাকবচ।
কিন্তু এই জানাটাই তো এখনকার কলকাতার ফুটবলে শেষ কথা নয়। বড় ক্লাবে ক্ষমতা দখল আর প্রতিপত্তি বিস্তারের লড়াই অবিরাম চলেছে। কর্তাদের এক একজনের তাঁবে থাকে দু—চারজন অনভিজ্ঞ, চলনসই, নবাগত ফুটবলার আর ফর্ম ঝরে যাওয়া, বয়স্ক, নামী ফুটবলার। উভয়েই কর্তাদের দলাদলিতে দাবার বোড়ে হয়ে তাদের নির্দেশমতো মাঠে খেলে, পয়েন্ট খুইয়ে কোনও কর্তাকে বিপদে ফেলে দেয়, কোনও প্লেয়ারকে খেলার মধ্যেই অপ্রতিভ করিয়ে তাকে বসিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, চোট আঘাতের অজুহাতে শক্ত ম্যাচগুলোয় না খেলে ক্লাবকে জব্দ করে। বিনিময়ে পায় অনুগ্রহ, আরও এক বছর ক্লাবে থাকার ছাড়পত্র অর্থাৎ টাকা বাড়িয়ে নতুন চুক্তি। সমীরণ এইসব নীচতাকে প্রশয় দেয়নি। সে শুধু নিজের খেলাকে আরও ওপরে তোলার চেষ্টা করে গেছে। সব কর্তারাই জানে সমীরণকে দরকার, কিন্তু একটা গোষ্ঠী তলায় তলায় চেষ্টাও চালিয়ে যাচেছ, বাইরে থেকেও সমমানের কাউকে আনিয়ে সমীরণকে সারথি ছাড়তে বাধ্য করার জন্য।
”দুলালদার কথা থেকে মনে হয়েছে,” অরুণ দু’পাশে আড়চোখে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, ”আপনি সারথিতে থাকুন এটা উনি চান না।”
”কেন?” সমীরণের কপালে আবার ভাঁজ পড়ল।
”মনে হয়, উনি নিজেও বোধ হয় থাকবেন না, আবার যাত্রীতেই ফিরে যাবেন।”
