”কে বলো তো ক্ষিদ্দা?”
”জানি না, কোনো কম্পিটিটারের বাড়ির লোক হবে হয়তো।”
পাড়ের রাস্তা ধরে ধীর গতিতে সবুজ রঙের একটা ফিয়াট চলেছে। গাড়ির জানলায় উৎকণ্ঠিত একটি পুরুষ ও একটি মহিলার মুখ। মাঝে মাঝে হর্ন দিচ্ছে।
”কো ও ও ন ই ই।”
নৌকোটা ছপছপ শব্দে দাঁড় ফেলে এগোচ্ছে। একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে নীলশার্ট পরা যুবকটি দাঁড়িয়ে। ক্রমশ সে ক্ষিতীশের চোখে ছোট হয়ে ঝাপসা হতে শুরু করল। জলের উপর, অনেক পিছনে, দুটি হাতের ওঠানামা হচ্ছে। তারপর আর দেখা গেল না হাত দুটো। পড়ন্ত রোদে মাঝে মাঝে চিকচিক করে উঠছে ছিটকে ওঠা জল।
সামনে হৈ চৈ শোনা গেল। প্রথম প্রতিযোগী সাঁতার শেষ করেছে। সম্ভবত সুবীরই।
কোনি জল থেকে উঠছে। সাঁতার শেষ করে অনেকেই তখন চুল পর্যন্ত আঁচড়ে ফেলেছে। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে একজন ঢাকুরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের সারা বছরের কার্যকলাপের বিবরণ পাঠ করে চলছে একঘেঁয়ে সুরে। কেউ লক্ষ্যই করল না শেষ প্রতিযোগীর সীমায় পৌঁছনোটা।
পাড়ের কাছে কাদা। কোনির পায়ের গোছ কাদায় ডোবা, শরীরটা সামনে ঝোঁকান, পাড়ে উঠতে গিয়ে সেই অবস্থাতেই সে তাকিয়ে রইল। চোখ দুটি লাল। সস্তার একটা কালো কস্ট্যুম শীর্ণ দেহের সঙ্গে লেপটে। হাঁপাচ্ছে, পিঠের দিকে পাঁজরের হাড়গুলো চামড়ার নিচে বারবার কেঁপে উঠছে। কাঁধের হাড় দুটো উঁচু। সরু লম্বা হাত দুটো ঝুলছে কাঁধ থেকে। একটু দূরে নীলশার্ট পরা রুগ্ন যুবকটি দাঁড়িয়ে, মনোযোগে লাডউস্পীকারে কান পাতার ভান করে।
টলতে টলতে কোনি উঠে এল। ওর বয়সীই দুটি ছেলে একটু জোরেই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল।
”তবু তো শেষ করেছে।”
”পরের বছরের কম্পিটিশনে প্রথম প্লেস পেতো যদি আর একটু দেরীতে পৌঁছতো।”
কোনি আর একবার তাকাল। নীলশার্ট পরা যুবকটির মুখ চড় খাওয়া মানুষের মত অপ্রতিভ, অপমানিত।
.
”সাঁতার শিখবে?
চমকে কোনি পিছনে ঘুরল।
সেই লোকটা। কাঁচাপাকা কদমছাঁট চুল। পুরু কাঁচের চশমা।
”লাল কস্ট্যুমপরা মেয়েটি সাঁতার শিখেছে তাই তোমাকে হারালো। তুমিও ওকে হারাতে পারবে যদি শেখো।”
হঠাৎ কোনির দু’চোখ জলে ভরে এল। থরথরিয়ে ঠোঁট দুটি একবার কেঁপে উঠল। তারপরই চোয়াল শক্ত হয়ে বসে গেল।
ক্ষিতীশের চাহনির দপ করে ওঠা শুধু ভেলোই লক্ষ করল এবং অস্বস্তি ভরে সে মাথা নাড়ল।
”ওই যে দাঁড়িয়ে, ও কে?”
”আমার দাদা।”
নিজেকে টানতে টানতে কোনি ড্রেসিং রুমের দিকে চলে গেল। ক্ষিতীশ এগিয়ে গেল কোনির দাদাকে লক্ষ করে।
”আমি একজন সাঁতারের কোচ। আমার নাম ক্ষিতীশ সিংহ। আমি আপনার বোনকে সাঁতার শেখাতে চাই।”
ক্ষিতীশ কোন ভূমিকা না করে সোজাসুজি কথাগুলো বলল।
”আমার নাম কমল পাল। আমি একসময় সাঁতার কেটেছি অ্যাপোলোয়। তখন আপনাকে আমি দূর থেকে দেখতাম।” কমল তার পাণ্ডুর অসুস্থ চোখ দুটোয় ঔজ্জ্বল্য আনার চেষ্টা করল। তারপর মাথা নাড়িয়ে বলল, ”আমরা খুবই গরীব। সাঁতার শেখবার পয়সা নেই।”
”আমাকে পয়সা দিতে হবে না।”
”তা বলছি না। সাঁতার শিখতে হলে খরচ আছে, খাওয়া—দাওয়ার খরচ। আমি পারিনি সেইজন্য, পয়সা ছিল না খাওয়ার। বাবা প্যাকিং কারখানায় কাজ করত, টি বি—তে মারা গেল। সাঁতার কেটে এসে খিদেয় ছটফট করতুম। স্কুলে ঘুমিয়ে পড়তুম। বাবা মারা যেতে স্কুল ছাড়লুম, সাঁতার ছাড়লুম। আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল।”
”কি করেন আপনি?”
”আপনি বললে লজ্জা পাব।”
”বেশ। তুমি কি করো, বাড়িতে আর কে কে আছেন?”
”সাত ভাই—বোন, মা। আমি বড়ো, গত বছর মেজো ভাই ট্রেনের ইলেকট্রিক তারে মারা গেছে, সেজো কাঁচড়াপাড়ায় পিসির বাড়িতে থাকে। তারপর কোনি আর দু’ বোন এক ভাই। আমি রাজাবাজারে একটা মোটর গ্যারেজে কাজ করি, ওভারটাইম করে শ’ দেড়েক টাকা পাই, তাতেই সংসার চলে। থাকি শ্যামপুকুরে বস্তিতে।”
কমল হাঁপিয়ে পড়ল এই ক’টি কথা বলেই। ভিতরে ভিতরে যেন উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। কোন কুণ্ঠা বা সংকোচ না করে সাধারণভাবেই নিজেদের অবস্থার কথা বলল। ওর হাঁপিয়ে ওঠার ধরনটা ক্ষিতীশের ভাল লাগল না। ওর বাবা টি বি—তে মারা গেছে, এটা মনে পড়ে অস্বস্তি বোধ করল।
”নামকরা সাঁতারু হবার সখ আমার ছিল। কোনিটাকে দেখতুম ছোট থেকেই ওর খেলাধুলোয় আগ্রহ। আমার ইচ্ছে করে ওকে কোনো একটা খেলায় দিই। গঙ্গায় সাঁতার কাটে শুনেছি, দেখিনি কখনো। দিনরাত টো টো করে শুনেছি ছেলেদের সঙ্গে। অনেকে অনেক কথা বলে আমাকে। আমি তো বাড়িতে ফিরি শুধু ঘুমোবার জন্য। কে কি করছে কিছুই জানি না। তবু মাথা গরম হয়ে উঠলে দু’চার ঘা লাগাই। এর বেশি ওদের জন্য আমি আর কিছু করতে পারি না। ইচ্ছে থাকলেও ওকে সাঁতার শেখাবার সামর্থ্য আমার নেই।”
”সে দায়িত্ব আমার।”
”তার মানে?” ভেলো ব্যস্ত হয়ে এতক্ষণে মুখ খুলল। ”দায়িত্ব তোমার মানে?”
”মানে বলতে যা বোঝায় তাই।” ক্ষিতীশ বিরক্তি জানিয়ে কমলকে লক্ষ করে বলল ”গার্জেনরা সাহায্য না করলে কোন ছেলেমেয়েকে শুধু কোচিং দিয়ে বড় করা যায় না। আমি শুধু বাড়ির সহযোগিতাটুকু চাই। বাদবাকি দায়িত্ব আমার।”
”আপনি দায়িত্ব নেবেন, সে তো ভাগ্যের কথা।” কমলের চোখের পাণ্ডুরতা চকচক করে উঠল। ”কিন্তু আমি এক পয়সাও খরচ করতে পারব না। ধার করে কালকেই বারো টাকা দিয়ে ওকে কস্ট্যুম কিনে দিয়েছি। খুবই বাজে জিনিস। কখনো ওর সাঁতার দেখিনি, এই প্রথম দেখলাম। কথা দিয়েছিল, মেয়েদের মধ্যে প্রথম হবেই। দেখলেন তো কি হল!”
