”গুঁড়ো কী জিনিস?” জি. সি. দত্ত কৌতূহলী হলেন।
”সব টাকা তো আর কাগজে কলমে থাকে না, পঁচিশি—তিরিশ হাজার এধার—সেধার করে দেওয়া হয়। ওটা হিসাব ছাড়াই, লিখিত চুক্তির বাইরে। ওটাকেই গুঁড়ো বলি।”
”ধরুন, একটা প্লেয়ার অ্যাডভান্স নিল, গুঁড়োও নিল, তারপর অন্য ক্লাবে সই করে বসল—।”
সরোজ বসাকের কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘুনু কথাটা ছোঁ মেরে তুলে নিল। ”ঠিক এই ব্যাপারই তো গত বছর দুলাল চক্রবর্তী করল। সওয়া লাখ অ্যাডভান্স আর কুড়ি হাজার গুঁড়ো নিয়ে বলল যাত্রী ছাড়া আর কোনও ক্লাবে মরে গেলেও খেলবে না। ব্লেড দিয়ে হাতে আঁচড় কেটে রক্ত বের করে বলল, ”দেখুন এর প্রত্যেক কণিকায় যুগের যাত্রীর নাম লেখা রয়েছে।”
”অ্যাঁ! রক্তে নাম লেখা?” মালবিকা চমৎকৃত হয়ে বললেন, ”তাও কখনও হয় নাকি!”
”হয়। কলকাতার ফুটবলাররা ক্লাবের প্রতি এতই অনুগত, ক্লাবের ভালমন্দ, মানমর্যাদা নিয়ে এতই ভাবিত যে, ওদের রক্তে ক্লাব মিশে যায়, ওদের নিঃশ্বাসেও ক্লাবের নাম বেরিয়ে আসে।”
”কী জানি বাবা, আমি তো সায়েন্স পড়েছি, বটানিতে বি. এস. সি., এমন কথা তো কখনও চোখে পড়েনি।” মালবিকা মিনমিন করে দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বললেন।
”আপনার চোখ নিশ্চয়ই ভাল। কিন্তু আমাদের ফুটবলারদের শরীরে বিশেষ এক ধরনের রক্ত বয়, সেটা ভাল চোখে দেখা যায় না।” ঘুনু মিত্তির এমনভাবে হাসলেন যার সাত—আট রকম অর্থ হয়। ”এই বছর যে প্লেয়ারের রক্তে যুগের যাত্রীর নাম, পরের বছর তারই রক্তে পাবেন সারথি সংঘের নাম, তার পরের বছর হয়তো লেখা থাকবে জুপিটারের নাম।”
”খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার তো!” জি. সি. দত্তর ঘাবড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হল। ”এদের আসল রক্ত, মানে বাপ—মা’র কাছ থেকে পাওয়া রক্তটা তো দেখছি আর নেইই। এদের রক্ত যদি ক্লাব—রক্ত হয় তা হলে মানুষের শরীরে দিলে তারা তো মারা যাবে।”
”যেতে পারে। ফুটবলার জানলে ব্লাড ব্যাঙ্ক হয়তো ভবিষ্যতে এদের রক্ত নেবে না। অবশ্য আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, এরা কখনও ব্লাড ডোনেট করে না।” ঘুনু মিত্তির সহজ স্বরে কথাটা বলেই পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরলেন। ”হ্যাঁ, গুঁড়োর কথা হচ্ছিল। দুলাল অ্যাডভান্স আর গুঁড়ো নিয়ে সই করার দু’দিন আগে সারথি—র বটা বিশ্বাসের ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠল। সেখান থেকে ফোন করে আমায় বলল, বটার ছেলেরা ওকে রাস্তা থেকে ধরে, পিস্তল দেখিয়েই অবশ্য, গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছে।”
”আপনারা পুলিশের হেলপ নিলেন তো?” ভটচায বলতে বলতে আড়চোখে জি. সি. দত্তর দিকে তাকালেন।
”মাথা খারাপ! পুলিশের কাছে গিয়ে কী হবে? দুলাল তো নিজেই ট্যাক্সি করে বটার ডেরায় গিয়ে উঠেছে। খবর আমি দশ মিনিটের মধ্যেই পেয়ে গেছলাম। আমাদের থেকে পঁচিশ হাজার বেশি দেবে বলাতেই দুলাল টোপ খেয়ে নিল।”
”কিন্তু রক্তে যে যাত্রীর নাম লেখা!” মালবিকা আঁতকে উঠে বললেন। ঘুনু তাতে কান না দিয়ে বলে চললেন, ”আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, ওরা কত বেশি দেবে বলেছে? বলল পঁচিশ হাজার। আমি বললাম, আরও তিরিশ হাজার দেব, চলে আয়। বলল, যাব কী করে, দরজার বাইরে, রাস্তায় ছেলেরা পাহারা দিচ্ছে। তখন ফোন রেখে আমি দৌড়লাম দুলালের বাড়ি। ওর বউ মধুছন্দাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়ে বললাম, তোমার স্বামী তিরিশ হাজার টাকা হারাবে যদি সারথিতে সই করে। তুমি ওকে সারথির ডেরা থেকে এখুনিই উদ্ধার করে আনো।”
”তারপর মধুছন্দা উদ্ধার করে আনল?” ভটচায চেয়ারের কিনারে টানটান হয়ে বসলেন। ঘরের সবাই উদগ্রীব।
”মধুছন্দা তখন আট মাসের ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে আমায় বলল, চলুন তো, কোথায় ও রয়েছে সেখানে আমায় নিয়ে চলুন। তিরিশ হাজার টাকা ফ্যালনা নাকি! হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে দেওয়া! পা দিয়ে ফুটবল খেলে বলে কি লক্ষ্মীকেও খেলবে?” ঘুনু অবিকল মধুছন্দার কণ্ঠস্বরে কথাগুলো বললেন।
”আপনি ওকে নিয়ে গেলেন তো?” উৎকণ্ঠিত মালবিকা জানতে চাইলেন।
”অবশ্যই। নিয়ে যাওয়ার জন্যই তো গেছি। ট্যাক্সি করে বটা বিশ্বাসের বেহালার ফ্ল্যাট বাড়ির সামনে ছেলেকোলে মধুছন্দাকে নামিয়ে দিয়ে বললাম, তিনতলায় ডান দিকে, আমি ট্যাক্সি নিয়ে এখানে অপেক্ষা করছি, দুলালকে একেবারে সঙ্গে করে আনা চাই। মনে রেখো তা না হলে তিরিশ হাজার হারাবে।” ট্যাক্সি থেকে নামতে গিয়েও থমকে গেল মধুছন্দা, বলল, ”হারাব আমি? তিরিশটা পঁয়ত্রিশ করুন।”
”কী মেয়ে ভাবুন তো! দরাদরি শুরু করল কিনা এই সময়ে, ট্যাক্সি থেকে এক পা রাস্তায় রেখে।”
”আপনি কী বললেন, পঁয়ত্রিশ দেবেন?” জি. সি. দত্ত যে মনে মনে হিমশিম হয়ে পড়েছেন সেটা তাঁর ঢোঁক গেলা থেকে বোঝা গেল।
”তা ছাড়া তখন আর উপায় কী। বললাম, পঁয়ত্রিশ দেব যদি দুলালকে এখনিই বের করে আনতে পারো।”
”কিন্তু বাইরে যে ছেলেরা পাহারা দিচ্ছে?” সরোজ মনে করিয়ে দিলেন।
”কোথায় ছেলেরা!” ঘুনু মিত্তির পকেট থেকে নস্যির ডিবে বের করলেন। ”ছেলে ফেলে পাহারা দিচ্ছে, ওসব দুলালের বাজে কথা। যাই হোক, আমি তো ট্যাক্সিতে বসে রইলাম। দশ মিনিট, পনেরো মিনিট, আধঘণ্টা কেটে গেল। বাড়ি থেকে ওরা কেউ আর বেরোয় না। ভাবলাম হলটা কী! মধুছন্দাকেও আটকে রাখল নাকি?” ডিবে থেকে একটিপ নস্যি বের করে ঘুনু নাকের কাছে এনে থমকে গেলেন। ”তারপর দেখি ছেলেকে কাঁখে নিয়ে মধুছন্দা বেরিয়ে আসছে, একমুখ হাসি, সঙ্গে দুলালও।” নস্যিটা ঘুনু নাকে গুঁজে হাত ঝাড়লেন।
