”আরে, ফুটবলারের পিসিমাসিরাও দলবদলের আগে ভি আই পি হয়ে যায়।” সরোজ বসাক স্ত্রীকে বোঝাবার জন্য জুড়ে দিলেন, ”আমাদের দেশের ফুটবলাররা খুবই পরিবার—অন্ত—প্রাণ তো, তারা দিদি—বউদি, মা—মাসি, ভাই—বোন, এদের মত না নিয়ে দল বদলায় না, সেজন্য প্লেয়ারদের আগে এদেরই ধরাধরি করা হয়।”
সরোজের কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই দরজার কাছ থেকে মিহিস্বর ভেসে এল, ”আমি কি ভেতরে আসতে পারি?” বলার সঙ্গে সঙ্গে লোকটি ভেতরে ঢুকে এলেন।
নাতিউচ্চ মাঝারি গড়ন, ঈষৎ ক’টা চোখ, গায়ের রং এককালে গৌরবর্ণ ছিল, এখন তামাটে, বয়স ষাট—পঁয়ষট্টির মধ্যে, পাতাকাটা কাঁচাপাকা চুল, বিস্কুট রঙের ট্রাউজার্স ও একরঙা নীল বুশশার্ট, পাম্পশুটা অন্তত চারশো টাকা দামের। ”না বলেই প্রায় ঢুকলাম।” হাতজোড় করে সবাইকে নমস্কার জানিয়ে বললেন, ”আমার নাম ঘুনু মিত্তির, বিখ্যাত লোক নই যে, নামটা শোনা থাকবে। যুগের যাত্রীকে ভালবাসি, ওদের কমিটিতেও আছি, আর প্লেয়ারদের সঙ্গে দুঃখেসুখে একাকার হয়ে গেছি। ওরা মুশকিলে পড়লে আমি সাহায্য করি, আমি অসুবিধায় পড়লে ওরা আমায় দেখে। এইমাত্র শুনলাম, কে যেন বলছিলেন ছেলেরা দলবদলের আগে মা—মাসি দিদি—বউদিদের মত নেয়! কথাটা ওয়ান—ফোর্থ সত্যি। বাকিটা খবরের কাগজের বানানো। ওরা কি দুগ্ধপোষ্য শিশু যে, এখনও মা—মাসির কথামতো চলবে? কেউ কেউ চলে, কারণ তাদের মা কি বউ টাকাকড়ির ব্যাপারটা তাদের থেকেও ভাল বোঝে। আমি কি বসতে পারি?”
”নিশ্চয় নিশ্চয়, বসুন।” রেখা গুপ্ত উঠে দাঁড়ালেন। ডাইনিং টেবিলে খালি চেয়ার আর নেই। তাই দেখে বেগারদের অন্য চারজনও চেয়ার থেকে উঠে পড়ল।
”আরে আপনারা বসুন বসুন। মা, একটা টুল কি মোড়া থাকলে এনে দাও তো।” ঘুনু মিত্তির বললেন শ্যামলাকে।
প্রায় ছুটে গিয়ে শ্যামলা পিসির ঘর থেকে মোড়া আনল।
”নাকুর বাড়ি তো আমারও বাড়ি। এখানে আমি মেঝেতেও বসতে পারি।” এই বলে ঘুনু অবশ্য মোড়াটাতেই বসলেন। ”মনে হচ্ছে কারুরই চা বোধ হয় খাওয়া হয়নি।”
”না, এইবার চা হবে। আপনাকেও—” রেখা গুপ্ত ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়লেন।
”চিনি ছাড়া, আমার ব্লাড সুগার একটু বেশির দিকেই।”
”কত এখন?” ভটচায দমবন্ধ অবস্থায় জানতে চাইলেন।
”দুশো একানব্বই।” ঘুনু খুব সহজ স্বরে বললেন। ”ওষুধপত্তর খাই না। ডাক্তার বলেছে স্ট্রেস আর টেনশন থেকে শুধু দূরে থাকবেন, আমি তাই থাকারই চেষ্টা করি।”
রেখা গুপ্ত ইশারায় শ্যামলাকে ডেকে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। সমীরণের কাছে তিনি ঘুনু মিত্তির সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছেন। তাই মনে মনে হঁশিয়ার হয়েও কিঞ্চিৎ সিঁটিয়ে রইলেন।
”যুগের যাত্রীতে কেউ কি টেনশন ছাড়া থাকতে পারে? শুনেছি ক্লাবের কুকুরগুলো পর্যন্ত নাকি ক্লাবের খেলা থাকলে টেনশন সইতে না পেরে বাবুঘাটে চলে যায়।” ভটচায কিন্তু কিন্তু করে বলে ফেললেন।
”কার কাছে শুনেছেন?”
”আমার শালার ছেলে যাত্রীর মেম্বার, সে বলেছে।”
”বাজে কথা, একদমই বাজে কথা। টেনশন একটু হয় ছোট ক্লাবের সঙ্গে খেলা থাকলে। তা সেজন্য তো আমি আছি। ওদের গোলকিপার আর একটা স্টপার কী একটা ব্যাককে ম্যানেজ করে ফেলি, সেটা মোটেই শক্ত ব্যাপার নয়।”
”নাকুকে কিন্তু পারেননি। লাস্ট ফাইভ ইয়ার্সে চার বছর যাত্রীর এগেনস্টে খেলেছে, রোভার্স, ডুরান্ড, ফেডারেশন, লিগ, শিল্ড সব মিলিয়ে সাতটা গোল দিয়েছে, তিনটে ডিসঅ্যালাউড হয়েছে। গত দশ বছরে কে পেরেছে … সোজা কথা, দশবার যাত্রীর জালে বল!” ভটচায উত্তেজনা দমন করতে করতে মুখ লাল করে ফেললেন। ”কিন্তু আমাদের নাকুকে ম্যানেজ করতে পারেননি।”
”জীবনে আমার এই একটাই ফেলিওর। দশ হাজার টাকা ক্লাব ওকে দেয়নি, সেই রাগটা দ্বিগুণ বিক্রমে ওকে খেলিয়ে দেয় যাত্রীর এগেনস্টে। তবে এবার তো একেবারেই নতুন কমিটি, নাকুকে টাকা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। ওর দশ হাজার পাওয়ার ব্যবস্থা আমি করে দেব।”
পাঁচ কাপ চায়ের ট্রে নিয়ে শ্যামলা প্রথমেই ঘুনুর সামনে ধরে বলল, ”ডান দিকে কর্ণার ফ্ল্যাগের কাছেরটা চিনি ছাড়া।”
ঘুনু হাসিমুখে কাপটা তুলে নিয়ে বললেন, ”ফুটবলারের বাড়ি তো, কথাবার্তাও সেরকম! আপনার বাড়িতে আজই প্রথম এলাম। বেশ বাড়িটা করেছেন।” রেখা গুপ্তর উদ্দেশে কথাগুলো বলে, ঘুনু ঘরটায় চোখ বুলিয়ে চায়ে চুমুক দিলেন।
”বাড়ি আমার নয়, দাদার।”
”ওই হল। জায়গাটা ভাল, বেশ নিরিবিলি, খোলামেলা। দোতলায় ক’খানা ঘর?”
”একখানা।”
”কেন! আরও দু’খানা করতে পারেন, জায়গা তো রয়েছে! ক’তলার ভিত, তিনতলার নিশ্চয়।”
”হ্যাঁ।”
”তা হলে আরও দুটো ঘর তুলে ফেলুন।”
”সেজন্য টাকা লাগে।” রেখা গুপ্ত সন্তর্পণে কথাটা বলে ভাবতে শুরু করলেন, লোকটা শেষপর্যন্ত কোথায় আলোচনাটাকে নিয়ে যাবে।
”টাকার জন্য আপনার ভাবনা! ওসব নিয়ে কিছু ভাববেন না, আমি করে দেব।”
”আপনি করে দেবেন মানে!” রেখা গুপ্তর আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা হল। ”আপনি কেন করে দেবেন?”
”কত লাগবে দুটো ঘর করতে? হাজার তিরিশ? সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। যাত্রীতে নতুন যে কমিটি এবার এসেছে, টাকার ব্যাপারে কোনওরকম কেপ্পুনি তারা করবে না। দু’লাখ দেব বললে দু’লাখই দেবে, দেড় লাখ অ্যাডভান্স। চাইলে গুঁড়োও দেবে।”
