সিরিয়াস কথাবার্তায় পরিবেশ ভারী হওয়ার দিকে গড়াচ্ছে দেখে শ্যামলা হালকা করার জন্য বলেছিল, ”ওসব মান—ইজ্জতের কথা রাখো তো এখন, বলো এতগুলো টাকা নিয়ে তুমি কী করবে? তবে আমায় জিজ্ঞেস করলে বলব, একটা কালার টিভি আর—”
”আর দাদার জন্য একটা স্কুটার।” হিমাদ্রি থামিয়ে দিয়েছিল বোনকে। থতমত হয়ে শ্যামলা বলে, ”তা তো দাদা কিনবেই, তবে একতলা বাড়িতে থাকাটা এতবড় প্লেয়ারের পক্ষে একদমই মানায় না। ছাদে একটা অন্তত ঘর না তুললে দোতলা বাড়ি বলা যাবে না।”
সবাই কথাটা শুনে চুপ হয়ে গেছল। অবশেষে পিসিই বলেন, ”ঘরে কে থাকবে?”
”তুমি।” সমীরণ বলেছিল।
”না। ওপরে আমায় তুলে দিয়ে নীচে তোমরা ভূতের নাচ নাচবে, এসব মতলব ছাড়ো। যদি ঘর হয় তো থাকবে দাদা, সঙ্গে বাথরুমও থাকবে।”
হাঁপ ছাড়ার নীরবতাটা কাটিয়ে উঠে সমীরণ বলেছিল, ”কারেক্ট ডিসিশন। আমার প্রস্তাবটা প্রত্যাহার করছি। কিন্তু, পিসি, তোমার কি কিছু দরকার নেই?”
”আমার দরকার!” পিসি হতচকিত হলেন এবং তিনজনের পীড়াপীড়িতে অবশেষে বলেন, ”একদিন আমার সকালের বন্ধুদের পেটভরে রেঁধে খাওয়াব।”
”তোমার সকালের বন্ধুদের?” হিমাদ্রি চোখ কপালে তুলে বলেছিল, ”তার মানে বেগা—আ—আ—আ—কথাটা সে শেষ করতে পারেনি যেহেতু শ্যামলার এক প্রচণ্ড রামচিমটি তখন অতি তৎপরতায় তার বগলের নীচে কামড় বসিয়েছিল। হিমাদ্রি অবশ্য খুব স্মার্টলি ”আ—আ—আ”—টাকে দম আটকানো কাশিতে রূপান্তরিত করে কাশতে কাশতে চেয়ার থেকে উঠে বেসিনের দিকে ছুটে গেছল।
”কী হল তোর? বেগা বলে বিষম খেলি কেন?” পিসি উৎকণ্ঠিত হয়েছিলেন।
”কানু হয়তো বলতে চেয়েছিল, রান্নাবান্নার মতো কাজে কেন ব্যাগার খাটবে তার থেকে চিনে দোকানের খাবার এনে—তাই তো রে?” সমীরণ ভাইয়ের দিকে তাকায়। মুখে জল দিতে দিতে হিমাদ্রি শুধু বলে, ”হুঁউ।”
”রান্না করে খাওয়ানোটাকে ব্যাগার খাটা বলছিস! কী আনন্দ হয় জানিস লোককে খাওয়াতে? টাকা থাকলে আমি রোজ ধরে এনে লোক খাওয়াতাম।”
রেখা গুপ্ত তাঁর সকালের বন্ধুদের অবশ্যই ভূরিভোজন করিয়েছিলেন। কালার টিভি এবং স্কুটারও কেনা হয়েছিল। দোতলায় সে বছর আর ঘর তোলা যায়নি। পরের মরসুমেই সারথি সংঘ একলাখ দশ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমীরণকে সই করায়। যুগের যাত্রীর কাছে তখন তার পাওনা ছিল দশ হাজার টাকা। সেটা আর সে পায়নি।
ময়দানের ঘাস এরপর থেকেই সে চিনতে শুরু করে।
।। ২ ।।
”না, না, আর না, আমার চারখানা খাওয়া হয়ে গেছে।’ ভটচায তাঁর প্লেটের ওপর দুই তালু ছড়িয়ে রেখা গুপ্তর লুচি নামাবার পথ বন্ধ করলেন। ”হাতিরা নাকি দুটো খায়, এই দত্তবাবুই বললেন।”
”হ্যাঁ দুটোই খায়…মিস গুপ্ত আমায় আর—একটা, আজ সাত চক্কর টোটাল—”
খুক খুক করে মালবিকা কেশে উঠলেন। দত্ত কটমটিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ”মিসেস বসাকের গণনায় কি সাত চক্কর হয়নি?”
”সাত মানে! আট হয়ে নয় হচ্ছিল তখনই তো ভটচাযদা বসতে বললেন।’ মালবিকা গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলেন।
”তা হলে বোধ হয় গুনতে ভুল করেছি, ইয়ে, আমায় তা হলে আর—একখানা।” দত্তবাবু বলা শেষ করেই জুড়ে দিলেন, ”আর মিসেস বসাককেও।”
‘নাকুও ঠিক গুনে আটখানা খায়।” রেখা গুপ্ত তাঁর কাজ শেষ করে বসলেন সরোজ বসাকের পাশের চেয়ারে। ”বসাকদা আপনি তো ভটচাযদার মতোই চারটের বেশি নিলেন না!”
”আমরা এক পালকের পাখি তো, ওনার অম্বল আমার মেদ, চারটের বেশি হলেই প্রবলেম দেখা দেবে।”
ভটচায জোরে জোরে মাথা নাড়লেন দক্ষিণ ভারতীয় ঢঙে। আর সেই সময় বাইরে ফটকের কাছ থেকে কে বলল, ”এটা কি সমীরণ গুপ্তর বাড়ি?”
”মলা, দ্যাখ তো কে একজন নাকুকে খুঁজছে।” রেখা গুপ্ত চেয়ার থেকে নিজেকে সামান্য তুলে জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। ”দলবদলের সময় এসে পড়ল আর সেইসঙ্গে সমীরণ, সমীরণ, নাকু, নাকুদা, ভিখিরিদের মতো ফটকের কাছে ডাকাডাকিও শুরু হয়ে গেল। এরপর চলবে হাত—পা ধরে টানাটানি। কী অদ্ভুত যে এই দলবদলের নিয়মকানুন!”
”বাড়িতে কেউ আছেন?”
ফটকের কাছ থেকে উঁচু গলায় ডাক এল।
”ওরে মলা, দ্যাখ না।”
”রেখা, যত ডাকাডাকি আর টানাটানি, ততই তো দরবৃদ্ধি।” মালবিকা চোখ পিটপিট করলেন আড়চোখে তাকিয়ে।
”মিস গুপ্ত, এবার যদি হাত—পা ধরে টানাটানি করে, টেলিফোনটা তুলে আমাকে শুধু একটা খবর দেবেন, তারপর দেখব কার হাত কোথায় কার পা কোথায় থাকে।” দত্তবাবু দুই মুঠো পাকিয়ে সেই দুটি টেবিলে ঠুকলেন। ”অনেকদিন অ্যাকশনে নামিনি তো, শরীরটা কেমন যেন মাখন মাখন হয়ে যাচ্ছে।”
শ্যামলা বাইরে থেকে ঘুরে এসে বলল, ”দাদাকে খুঁজতে এসেছে যুগের যাত্রী থেকে। বললাম, দাদার তো আজ সকালে হাওড়ায় নামার কথা। বললেন, তিনি জানেন, বাঙ্গালোর থেকে মাদ্রাজ, সেখানে মাদ্রাজ মেলে উঠে আজ সকাল সাতটায় হাওড়া স্টেশনে নামবে। ট্রেন অবশ্যই লেট হবে। সেই সময়টা ধরেই স্টেশন থেকে ট্যাক্সিতে বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে কম করে দশটা বেজে যাবেই।”
”এখন তো আটটাও বাজেনি!” ভটচায বললেন, ”তা হল উনি এত হিসেব কষেও এখন কেন হাজির হয়েছেন?”
”আমিও তাই বললাম। পিসির সঙ্গে দেখা করতে চায় বলল।”
”যুগের যাত্রীর লোক রেখার সঙ্গে দেখা করতে চায়!” মালবিকা চোখ ছানাবড়া—প্রায় করে রেখা গুপ্তর দিকে তাকালেন, ”তুমি আবার কবে থেকে ফুটবল খেলতে শুরু করলে?”
