পাঁচ বছর আগে তাঁরই হাতে গড়া সমীরণকে তিনি দর্জিপাড়া একতার সেক্রেটারির কাছে নিয়ে যান। ”ছেলেটা ভাল খেলবে, ফুটবল সেন্সটা আছে, খাটিয়েও। সব থেকে বড় কথা স্বভাবচরিত্র ভাল। একে কয়েকটা ম্যাচ খেলিয়ে দেখুন।” মুখোটির এই ক’টি কথাই যথেষ্ট ছিল। অবশ্য সমীরণ তার প্রথম ম্যাচেই রেড কার্ড দেখে। সেক্রেটারি তখন বলেছিল, ”নিমাই আর দুলালকে এক ঝটকায় টলিয়ে ভেতরে ঢুকে কী শটটা নিল দেখলি? ওকে সব ম্যাচ খেলাব।”
সমীরণ সে বছর তেরোটা গোল দেয়। ষাট হাজার টাকায়, পরের বছর যুগের যাত্রী তাকে সই করায়। সই করাবার জন্য কথাবার্তা বলেছিল ঘুনু মিত্তির। তার পোশাকি নামটা যে কী, কেউ আর তা জানে না। পঁয়ত্রিশ বছর আগে খেলার দিন ক্লাবের সদস্য গেটে দাঁড়িয়ে সে কার্ড দেখে লোকেদের ভেতরে যেতে দিত। এরপর সেক্রেটারি নারায়ণ সেন—এর গাড়ির দরজা খুলে দেওয়ার অধিকার অর্জন করে। যাত্রীর কোনও ফুটবলার চোট পেলে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য যখন লোক পাওয়া যায় না তখন ঘুনু মিত্তিরই এগিয়ে যেত। এইভাবেই ধাপে ধাপে উন্নতি বা কুরে কুরে সেঁধিয়ে এখন সে কার্যকরী সমিতির সদস্য এবং নতুন সেক্রেটারি পতিতপাবন ওরফে পতু ঘোষের প্রায় ডান হাত।
ঘুনু প্রথমেই সমীরণকে জানিয়ে দিয়েছিল, ”তোর গোলটা ঠিকই হয়েছিল। তবে বড় ক্লাবের এগেনস্টে ছোট ক্লাব গোল করে সিজনের শুরুতেই দুটো পয়েন্ট নিয়ে নেবে আর বিশ লাখ টাকা দামের টিমের সাপোর্টাররা সেটা দাঁত বের করে দেখবে, তা তো হতে পারে না। সেটা ময়দানের নিয়ম নয়। সারথিকে গোল দিলেও রেফারি অফসাইড করে দিত। নইলে টেন্ট জ্বলে যাবে। কিছুদিন ময়দানের ঘাস চেন, তখন নিজেই সব বুঝতে পারবি। যাকগে, তোকে আমি যাত্রীতে নিয়ে যাব। বড় ক্লাবে খেলার সুযোগ এক বছর ছোট ক্লাবে খেলেই পাওয়াটা যে কত ভাগ্যের ব্যাপার সেটা কি তুই বুঝিস?” আকাশবাণী ভবনের ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে তাদের কথা হচ্ছিল। সমীরণ আবেগে আপ্লুত হয়ে শুধু মাথা কাত করে জানিয়েছিল, সে বোঝে।
”কিন্তু একটা কথা।’ ঘুনু গলা নামিয়ে চাপা স্বরে বলেছিল। ”যা কনট্রাক্ট হবে তার টেন পার্সেন্ট আমার। অ্যাডভান্স পাবি সিক্সটি পার্সেন্ট, ক্যাশ।”
সমীরণ এবারও মাথা কাত করে ঢোঁক গিলে বলেছিল, ”বেশ তাই হবে। কিন্তু কত দেবে আমায়?”
”চেষ্টা করব যাতে বেশি পাস, তুই বেশি পেলে তো আমিও বেশিপাব।”
ষাট হাজার টাকার টেন পার্সেন্ট ছ’ হাজার ঘুনু কেটে নিয়েছিল ছত্রিশ হাজার টাকার অ্যাডভান্স থেকে। একশো টাকার তিনশোখানা নোট যখন সে পিসিমার সামনে খাওয়ার টেবিলের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে প্রণাম করেছিল তখন তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করতে বা বলতে পারেননি। শ্যামলা আঁতকে উঠে বলেছিল, ”দাদা পুলিশ টুলিস আসবে কি? ব্যাঙ্ক ডাকাতি করিসনি তো?” হিমাদ্রি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতে করতে মন্তব্য করেছিল, ”কমই দিয়েছে। দাদার যা খেলা তাতে এক লাখ ষাট হাজার পাওয়া উচিত।”
নোটগুলো গুছিয়ে দু’হাতে তুলে রেখা গুপ্ত ছুটে গিয়েছিলেন কোণের ছোট ঘরটায়, তার দাদার কাছে। একটু পরে চোখের জল মুছতে মুছতে ফিরে এসে বলেছিলেন, ”খুব অবাক হয়ে গেল, বলল, ফুটবল খেলে এত টাকা পাওয়া যায় জানতাম না তো! বললাম আরও চব্বিশ হাজার পাবে। তুই গিয়ে প্রণাম করে আয়।”
সমীরণ গোঁজ হয়ে বসে থেকেছিল। বাবার সঙ্গে ছেলেমেয়েদের কোনওরকম সম্পর্ক নেই বললেই চলে। অফিস থেকে এসে ঘরে ঢোকেন, শুধু স্নান আর খাওয়ার সময়ই তাঁকে ঘরের বাইরে দেখা যায়, কারও সঙ্গে কথা বলেন না।
”যা না, খুব খুশিই হবে।”
সমীরণ ঘরে ঢুকে সুনীলবরণকে প্রণাম করতেই হাতের বইটা নামিয়ে তিনি ইজিচেয়ারে সোজা হয়ে বসেন। বড় ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেছিলেন, ”এত টাকা যখন নিচ্ছ, সেইমতন খেলাটাও দিয়ো। নিজেকে অপমান কোরো না।”
বাবার কথাগুলো সমীরণের মাথায় কীভাবে যেন গেঁথে গেছল। খাওয়ার টেবিলের কাছে এসে দেখল, পিসি কিছু নোট আলাদা করে গুনে রাখছেন।
”ওগুলো কী জন্য?” সমীরণ রীতিমতো অবাক হয়ে বলে।
”প্রণামীর টাকা। যে গুরুর কাছে প্রথম শিক্ষা নিয়েছিস, যিনি তোকে হাতে ধরে এগিয়ে দিয়েছেন, তাঁর ঋণ কোনওদিনই তো শোধ করতে পারবি না। তবু প্রণামী বলে এই ছ’হাজার কাল সকালেই দিয়ে আসবি। খুব কষ্টে আছে ভাইপোদের সংসারে। দোকানটারও যা হাল হয়েছে।”
”দাদার আরও টেন পারসেন্ট গেল।” হিমাদ্রি হালকা স্বরে বলতেই হাত তুলে সমীরণ তাকে চুপ করিয়ে দেয়।
”কানু, এটাকে গেল বলিসনি। পিসি কেন গ্রেট লেডি জানিস? যে কাজটা সবার আগে করা উচিত সেটাই মনে করিয়ে দিয়ে অপরাধের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। বরেনদার কাছে কাল ভোরেই যাব। কিন্তু পিসি, আমাকে দিয়ে আবার যদি জানলার কাচ পরিষ্কার করাও তা হলে আমার মান—ইজ্জত আর থাকবে না।”
কথাটা গ্রাহ্যে না এনে পিসি ভ্রূ কুঁচকে সমীরণকে একপলক দেখে নিয়ে বলেন, ”মান—ইজ্জত বলতে কী বুঝিস? নিজের বাড়ির জানলা নিজের হাতে পরিষ্কার করলে ইজ্জত খোয়া যায়? কতবার তোদের বিদ্যাসাগর মশায়ের গল্প শুনিয়েছি না? আসলে তোর মান—ইজ্জত নির্ভর করবে তোর খেলার ওপর। টিম যেদিন হারবে, গোল যেদিন দিতে পারবি না সেদিন তোর ইজ্জত থাকবে কি?”
