”ছয়।” গম্ভীর স্বরে জি. সি. দত্ত নিজেদের সংখ্যাটি জানিয়ে দিলেন।
”ছয় নয়, তিন।” ভটচায ভর্ৎসনা করলেন, ”মিছে কথা বলে লাভ কী?”
”আজ শনিবার, কার বাড়িতে চা খাওয়া সেটা কি ভুলে গেছেন?” দত্ত খিঁচিয়ে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন।
সপ্তাহের পাঁচ দিন সকালের চা এবং কিঞ্চিৎ ‘টা’ পাঁচজনের বাড়িতে পর্যায়ক্রমে ওঁরা খান। শনিবারের পালা রেখা গুপ্তর, এইদিন ওঁর স্কুলের ছুটি থাকে। সাধারণত তিনি চায়ের সঙ্গে লুচি দেন, সহযোগে আলুছেঁচকি। অথবা লুচির বদলে হালুয়া। দেওয়ার পরিমাণটা নির্দিষ্ট হয়, ক’চক্কর দেওয়া হল তার ওপর। ছয় চক্কর মানে ছ’টি লুচি অথবা বৃহৎ ছ’চামচ হালুয়া।
চার চক্করের পরই চার বেগার পার্কের বেঞ্চে বসে পড়লেন। রেখা গুপ্ত পার্কের মধ্যে তখন বাচ্চচাদের ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করাচ্ছেন। সাইকেলে দুটি খবরকাগজওলা তিরবেগে সুশোভনে ঢুকল। একজন অন্যদিকে চলে গেল, অন্যজন ওদের কাছে এসে ঝটপট তিনটি কাগজ হাতে ধরিয়েই সাইকেলে লাফিয়ে উঠল। রেখা গুপ্তর কাগজ বাড়িতে দেওয়া হয়। তার দাদা প্রথম পড়ার পর অন্যরা হাতে পায়।
তিনজন তিনটি কাগজ খুলে চোখের সামনে ধরলেন। মালবিকা খবরটবরের ধার ধারেন না। তিনি বাচ্চচাদের ব্যায়াম করার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
”কপিলদেব কলকাতায় এসে কী বলেছে সেটা পড়ে দেখুন।” দত্তমশাই গুরুগম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন।
”কী বলেছে?” ভটচায অবাক চোখে তাকালেন ওর মুখের দিকে।
”আপনার হাতেও তো একটা কাগজ রয়েছে।” দত্ত প্রাক্তন পুলিশি স্বর বের করলেন। ভটচায তাড়াতাড়ি হাতের কাগজটা তন্ন তন্ন দেখে বললেন, ”নাহ আমার কাগজে নেই।”
”আমার কাগজেও নেই।” বসাক যোগ করলেন।
”তা হলে শুনুন—ট্যালেন্ট থাকলেই হয় না, বড় ক্রিকেটার হতে গেলে চাই নিজের প্রচণ্ড ইচ্ছে আর অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাওয়ার ইচ্ছে। … কেউ যদি সত্যি যোগ্য হয় তাহলে তাকে আটকে রাখা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি না। সে ঠিক ফুঁড়ে বেরোবেই। … যে কোনও খেলাকে ঘিরেই কলকাতার লোকের এত উৎসাহ যে, আমার দারুণ লাগে। একই সঙ্গে এটা ভেবেও খারাপ লাগে যে, কেন এই শহর একটা টেস্ট ক্রিকেটার তৈরি করতে পারছে না।” দত্ত অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে দু’জনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আবার বললেন, ”ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন? কপিলদেব কী বলতে চায় সেটা হৃদয়ঙ্গম হল?”
”একটু একটু।” বসাক আমতা আমতা করে বললেন।
”আমি পুরোটাই হৃদয়ঙ্গম করেছি।” ভটচাযের মুখে হাসি ছড়ানো।
”তা হলে বলুন।” দত্ত দাবি জানালেন।
”বাংলায় কিসসু ক্রিকেট খেলা হয় না। এখানে সবাই হুজুগে। ট্যালেন্ট হয়তো আছে, কিন্তু সবাই ফুলবাবু, একটুও পরিশ্রম করে না, কারণ ইচ্ছেটাই নেই। শুধু খবরের কাগজে ছবি বেরোলেই এখানে লোকে ভাবে সে বোধ হয় খুব বড় প্লেয়ার।” ভটচায কথাগুলো বলে উদ্বিগ্ন চোখে দত্তর দিকে তাকিয়ে রইলেন। দত্ত চোখ বন্ধ করে মাথাটা ঈষৎ কাত করে অনুমোদন দিলেন।
”আমাদের নাকু কিন্তু খুব খাটে। ইলেকট্রিক মাঠে সকাল নেই, দুপুর নেই, বিকেল নেই, শুধু বল নিয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি।” বসাক ফাঁক পেয়ে তাঁর কথাটা ঢুকিয়ে দিলেন।
”কথা হচেছ ক্রিকেট নিয়ে, ফুটবল নিয়ে নয়।” ভটচায ছোট্ট একটা দাবড়ানি দিলেন।
”কথাটা আসলে সব খেলা নিয়েই, শুধু ক্রিকেট নিয়ে নয়। বসাকবাবু ঠিকই বলেছেন, এই শুনুন কপিলদেবের আর—একটা কথা। ওকে জিজ্ঞেস করা হয় পরিশ্রম করার ইচ্ছা এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন কী করে? তাইতে বলছে,—’এখানেই আমার মনে হয় পেশাদারদের সঙ্গে সাধারণ মানসিকতাসম্পন্ন লোকেদের তফাত। পেশাদারকে সবসময় সামনের দিকে চোখ রাখতে হয়। আরও, আরও, আরও, আরও। আমি এই নীতিতে বরাবর বিশ্বাসী। হাতির খিদে আমার’।”
”ওরে বাপস, হাতির!” চমকে উঠলেন ভটচায,”আমার তো দুটো লুচি খেলেই অম্বল। আচ্ছা, হাতিরা ক’টা লুচি খেতে পারে?”
”দুটো।” দত্ত খবরের কাগজে চোখ রেখে বিড়বিড় করে বললেন।
”আচ্ছা দত্তবাবু, আমরা কি সাধারণ মানসিকতাসম্পন্ন লোকদের দলে পড়ি?” বসাক কাঁচুমাচু মুখ করে জানতে চাইলেন।
”সাধারণ মানসিকতা…” দত্ত চিন্তায় ডুবে গেলেন এবং আধ মিনিট পর ভেসে উঠে জানালেন, ”পরিস্থিতি—বিশেষে সাধারণ মানুষও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। আমি যখন খোকাকে তাড়া করি কোনও ওয়েপন আমার কাছে ছিল না, কিন্তু ওর কাছে পিস্তল ছিল।” এর পর তোমরা বুঝে নাও গোছের একটা হাসি দত্তর ঠোঁট মুচড়ে দিল।
রেখা গুপ্ত বাচ্চচাদের বাড়ি পাঠিয়ে তখন হাজির হলেন ওঁদের সামনে। ”চলুন, চলুন। রাতে লেচি করে রেখে দিয়েছি, বেলব আর ভাজব। তবে আজ কিন্তু শুধু আলুভাজা, আমি এগোলাম, ব্যাঙ্গালোর ক্যাম্প থেকে নাকুর আজই ফেরার কথা।”
দ্রুত পায়ে শ্যামলাকে সঙ্গে নিয়ে রেখা গুপ্ত বাড়ির দিকে এগোলেন। ওঁদের বাড়িটা সুশোভনের পেছন দিকে ইলেকট্রিক মাঠের লাগোয়া। মাঠে কয়েকটি ছেলে ফুটবল নিয়ে ট্রেনিংয়ে ব্যস্ত। বরেন মুখোটির একটা লন্ড্রির দোকান আছে নামে মাত্রই, আসলে গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে ফুটবলার তৈরি করার কাজেই বেশি সময় দিয়েছেন। এখন পঁয়ষট্টি বছর বয়সেও, কি শীত, কি বর্ষা প্রতিদিন সকালে মুখোটি একটা হুইসল গলায় ঝুলিয়ে মাঠে আসেন।
