”চাকর বলেছিলিস? ঠিক আছে, চাকরের কাজই করবি। বাড়ির সব জানলার কাচ…।
সমীরণ হিসাব করে দেখেছে। বিচার ও শাস্তিদানপর্ব দু’মিনিটেই সারা হয়েছিল। এখন যদি পিসি শোনে তার বন্ধুদের সে আড়ালে বেগার বলে, তা হলে নিশ্চিত তাকে বেগিং—এ নামিয়ে দেবে। হয়তো বলবে, ‘যাও, শ্যামবাজার কি মৌলালি মোড়ে এই বাটিটা হাতে নিয়ে ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ভিক্ষে করো। ভিক্ষের পয়সা থেকে আট আনা খাবার জন্য খরচ করে বাকিটা আমায় রাত্রে দেবে। বেগারদের জিলিপি কিনে খাওয়াব।” পিসিমার বেগার মানে সত্যিকারের ভিখারি, যারা রাস্তায় ভিক্ষা করে।
মাঝে মাঝেই বাজার করে ফেরার সময় হিমাদ্রি গরম জিলিপি কিনে রাস্তা দিয়ে খেতে খেতে আসত। বলাবাহুল্য, বাড়ি পৌঁছনোর আগেই জিলিপিগুলো শেষ করে ফেলত। হপ্তার ছ’টা দিন তাকে বাজার যেতে হয়। রবিবারে রবিবারে শ্যামলাকে সঙ্গে নিয়ে বাজার করতে যান পিসি নিজেই। হিমাদ্রির জিলিপি খাওয়াটা একদিন দেখে ফেলে বেগারদের একজন, স্বাস্থ্য দফতরের রিটায়ার্ড ডেপুটি সেক্রেটারি অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য্য। যথারীতি পিসির কাছে ‘নোংরা হাতে, ধুলোবালি বীজাণু ওড়া রাস্তা দিয়ে, আন—হাইজিনিক পরিবেশে তৈরি চিনির রসে ডোবানো জিলিপি, যা খেলে ডায়বিটিস হতে পারে”, এমন জিনিস খাওয়ার সাঙ্ঘাতিক খবরটা পৌঁছে গেল।
সুশোভন পল্লিতে ঢোকার মুখে ভি আই পি রোডের ওপরই ‘জয় মা তারা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। হিমাদ্রি যথারীতি সেদিন বাজার থেকে বাঁচানো পয়সায় আটটা জিলিপি কিনে, ঠোঙাটার মুখ খুলে দু’আঙুলে ধরে, একটাকে টেনে সবেমাত্র বের করেছে আর ঠিক তখনই পেছন থেকে ”ঠোঙাটা আমায় দে তো কানু।” আঙুল থেকে জিলিপিটা প্রথমেই জমিতে খসে পড়েছিল। তারা মা—র সামনে বসে থাকা কুকুর জগা অত্যন্ত হৃষ্টচিত্তে একটা গোটা জিলিপি, সম্ভবত জীবনে প্রথম, পাওয়ার জন্য যার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লেজ নেড়েছিল, সে তখন ফ্যাকাশে মুখের পিসির দিকে তাকিয়ে।
”তোর হাতটা দেখি।”
হিমাদ্রি ডান হাতের তালু মেলে ধরল। রেখা গুপ্ত তীক্ষ্ন চোখে পর্যবেক্ষণ করতে করতে নাক কোঁচকালেন। ”এই তো আলুর মাটি, মাছের গন্ধ লেগে রয়েছে…এই হাতে…।”
ছেঁড়া গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরা এক বৃদ্ধ সঙ্গে বাচ্চচা একটা ছেলেকে নিয়ে দোকানের একধারে হাত পেতে চুপ করে দাঁড়িয়ে। পিসি হাতছানি দিয়ে ছেলেটিকে ডেকে জিলিপির ঠোঙা তার হাতে দিয়ে বলল, ”খেয়ে নে।”
হিমাদ্রি তখন ক্ষীণস্বরে বলেছিল, ”পিসি ওর হাতেও ময়লা আছে।”
”থাকুক, ও আমার ভাইপো নয়।”
এহেন পিসি প্রতিদিন ভোরে শ্যামলা আর সাত—আটটি বাচ্চচা ছেলেমেয়েকে নিয়ে ট্র্যাকস্যুট পরে সুশোভন পল্লিতে চক্কর দিয়ে ছোটেন। খুব জোরে নয়, আবার বেগারদের মতো অত ধীরেও নয়। ট্র্যাকস্যুটটা সমীরণের। গত বছর ইন্ডিয়া টিমের ক্যাম্পে নতুন একটা পাওয়ায় সে পিসিকে বলেছিল, ”শাড়ি পরে কি জগ করা যায়! কোনওদিন হোঁচট খেয়ে পড়বে, হাত পা ভাঙবে, বরং আমার একস্ট্রা একটা রয়েছে, তুমি এটা পরেই ছোটো।’
পিসি—ভাইপোর উচ্চতা এবং ওজন সমান সমান। বাড়িতে ট্র্যাকস্যুট পরে নাককানমলাদের সামনে ট্রায়াল দিতে পিসি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় আটবার ছুটে ওঠানামা করে বলেছিলেন, ‘জিনিসটা ভালই মনে হচ্ছে। অনেক ফ্রি লাগছিল। ওদেরও বলব ট্র্যাকস্যুট পরে দৌড়তে।”
ওঁরা অর্থাৎ বেগাররা একদিন আলোচনায় বসেছিলেন রেখা গুপ্তর প্রস্তাবটা বিবেচনা করতে। বসাক দম্পতি অর্থাৎ বিল্ডিং কন্ট্রাক্টর সরোজ ও তাঁর স্ত্রী মালবিকা তাঁদের প্রধান অসুবিধার কথা জানিয়েছিলেন এই বলে—ট্র্যাকস্যুট পরলে তাঁদের যে হাইট তাতে আরও বেঁটে মনে হবে। স্বামী পাঁচ—এক, স্ত্রী চার—দশ। উচ্চতার ঘাটতি দু’জনেই পুষিয়ে নিয়েছেন প্রস্থে। ঢোলা জিনিসটার মধ্যে ঢুকে দৌড়লে তাঁদের যে চলমান পিপের মতো দেখাবেই, তাতে কোনওরকম সন্দেহ তাঁরা পোষণ করছেন না।
এহেন অকপট স্বীকারোক্তির পর ট্র্যাকস্যুট পরিধানের জন্য তাঁদের ওপর আর চাপাচাপি কেউ করলেন না। জি. সি. দত্ত অবশ্য বলামাত্র রাজি, তবে একটা শর্তে, ”আমাদের স্পিড বাড়াতে হবে।” যে স্পিডে তিনি সাব ইন্সপেক্টর থাকাকালীন একবার খোকাগুণ্ডার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে ধরেছিলেন তিন মাইল দৌড়িয়ে (প্রতি দশ দিন অন্তর গল্পটা বলে থাকেন), তিনি সেই স্পিডে ফেরার বাসনাটাই জানিয়ে দিলেন। প্রাক্তন পুলিশ অফিসারের বক্তব্যের বিরুদ্ধে ঘোর প্রতিবাদ জানালেন প্রাক্তন ডেপুটি সেক্রেটারি।
”আমরা চোরগুণ্ডা ধরার জন্যই কি তা হলে রোজ সকলে দৌড় প্র্যাকটিস করব? ব্লাড সুগার, অম্বল, ডিসপেপসিয়া, এই তিনটেকেই আমি কন্ট্রোলে রাখার জন্য ঘড়ি ধরে মেপে হিসাব করে পা ফেলি, এর একটা ছন্দ আছে, তাল আছে। হুট করে স্পিড বাড়ানোটা উচিত হবে কি না সেটা ভেবে দেখা দরকার।”
এরপর ট্র্যাকস্যুট পরার জন্য অনুরোধ জানিয়ে ফললাভ হবে না বুঝে আর কথা বাড়ানো হয়নি। রেখা গুপ্ত একাই পরেন। আজও তিনি দৌড়চ্ছিলেন। প্রথমে রেল এঞ্জিনের মতো, তারপর সাত—আটটি ক্ষুদ্র বগি, শেষ গার্ডের মতো শ্যামলা। চারজন বেগার উলটো দিক দিয়ে ‘বেগিং’ করেন। আজও তাঁরা মুখোমুখি হতেই শ্যামলা বললে, ”আট”। অর্থাৎ, তাঁদের আট চক্কর দৌড় সম্পূর্ণ হল।
