স্থানীয় লোকেরা এটাকে বলে ইলেকট্রিকের মাঠ। এখানে সকাল—বিকেল ফুটবল খেলা হয়, একটা ফাইভ—এ—সাইড, হাইটের টুর্নামেন্টও পাঁচ বছর আগে শুরু হয়েছে। বিন্দুবাসিনী চ্যালেঞ্জ শিল্ড বিজয়ীর জন্য, আর পাঁচকড়ি দে কাপ বিজিতের জন্য। কারখানা মালিকরা চার বছর আগে জমিটা বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল এক বিল্ডিং প্রোমোটারের কাছে। কিন্তু কীভাবে যেন সেটা জানতে পেরে নেতাজিনগর আর শহিদ কলোনির ছেলেরা বিক্রি বন্ধের দাবিতে লাঠি, বোমা এবং আরও কী সব জিনিস নিয়ে এমন রইরই কাণ্ড বাধিয়ে দেয় যে মালিকরা আজও কারখানামুখো হতে সাহস পাচ্ছে না।
এপ্রিলের মাঝামাঝি চৈত্রের শেষাশেষি এমন একটা দিনের ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ সুশোভন পল্লির চারজন রাস্তা দিয়ে স্বাভাবিক গতির থেকে একটু জোরে হাঁটছেন। বেড়ানোও নয় জগিংও নয়, সমীরণ নাম দিয়েছে বেগিং। এইভাবে যাঁরা ভোরে রাস্তায় হনহনিয়ে হাঁটেন তাঁদের সে বলে ‘বেগার’। বাংলা করে বলে, ‘স্বাস্থ্য ভিক্ষুক’। ওর বোন শ্যামলা (শ্যামলী নয়) আর ভাই হিমাদ্রি ছাড়া এই নামকরণের ব্যাপারটা আর কেউ জানে না।
আর কেউ বলতে অবশ্য একজনকেই বোঝায়, তাদের পিসিমা রেখা গুপ্তা। মধ্য কলকাতায় মৌলালির কাছে মেয়েদের একটা স্কুলে ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টরের কাজ করেন আর কখনও কোনও শিক্ষিকা অনুপস্থিত থাকলে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ক্লাস ঠাণ্ডা রাখতে। পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি, সত্তর কেজি ওজনের, ছেচল্লিশের কাছাকাছি বয়সি রেখা গুপ্ত তখন ক্লাসে ঢুকেই সারা ঘরে প্রথমে চোখ বুলিয়ে শুধু একবার ”হুম” বলেন। সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ—পঁয়তাল্লিশ জোড়া চোখ ডেস্কের ওপর দৃষ্টি নামিয়ে আনে। ”তোমরা কি চাও এখন আমি তোমাদের পড়াই?” ক্লাস নিরুত্তর থাকে। ”গুড। তোমরা কি চাও এখন আমি গল্প করি?” মুহূর্তে একটা ”হ্যাঁ—আ—আ” শব্দ সিলিংয়ের দিকে উঠতে উঠতে রেখা আন্টির আর একটা হুম—এর ধাক্কায় ডেস্কের ওপর গোঁত খেয়ে নেমে আসে। কিন্তু দশাসই ধড়ের ওপর বসানো মিষ্টি মুখটিতে ঝকঝকে আয়ত চোখজোড়া যখন প্রশয়মাখা দুষ্টুমিতে পিটপিট করে ওঠে, তখনই ”আন্টি, গ অল—পোও” এই শব্দটা এবার প্রজাপতির মতো উড়তে উড়তে সিলিং ছুঁয়ে ঘরে ছড়িয়ে যায়। ঘণ্টা বাজলে আন্টি যখন বেরিয়ে আসেন, তখন সারা ঘর হাসিতে লুটোপুটি কিংবা ছলছল চোখে গম্ভীর। টিচার্সরুমে রেখা গুপ্তকে বলতে শোনা যায়, ”মেয়েগুলো গল্পের কাঙাল; এদের বাবা—মায়েরা কেমন লোক! রোজ গল্প শোনায় না কেন? কল্পনাপ্রবণ না করে তুললে মনের বিকাশ ঘটবে কী করে? আমি তো রোজ রাতে গল্প শোনাতাম।”
তিনি গল্প শোনাতেন নাককানমলা—দের। ডাকনাম অনুসারে নাক হল নাকু অর্থাৎ সমীরণ, কান হল কানু বা হিমাদ্রি আর মলা বলাবাহুল্য শ্যামলা। রেখা গুপ্ত বাস্কেটবল খেলায় ইউনিভার্সিটি আর স্টেটের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন কুড়ি বছর আগে পর্যন্ত। যখন তাঁর বউদি তিনটি শিশুকে রেখে মারা গেলেন এবং দাদা সুনীলবরণ আধা—সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন শুরু করলেন, তখন ছাব্বিশ বছরের পিসি চার ও দুই বছরের নাকু কানু আর তিন মাসের মলাকে বুকে তুলে নিয়ে একই সঙ্গে ওদের বাবা—মা হয়ে যান। রেখা গুপ্ত বিয়ে করেননি।
সমীরণ যাদের বেগার বলে, তাদের মধ্যমণিটি হলেন তারই পিসি। সুতরাং বেগার শব্দটি যাতে কোনওক্রমেই ওই একজনের কানে না পৌঁছয় সেই ব্যাপারে তিন ভাইবোন হুঁশিয়ার। পৌঁছলে কী হতে পারে সে বিষয়ে সমীরণের মোটামুটি একটা ধারণা আছে।
পাঁচ বছর আগে তিনটি শোবার ঘর, রান্নাঘর, কলঘর এবং খাবার দালানের মোট দশটি ছোট ও বড় জানলার কুড়িটি কাচের পাল্লা সাবান জল ও ন্যাতা দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়েছিল এবং এমনভাবে, যেন ন্যাতা বোলানোর দাগ না থাকে। ছিল বলে তিনটি জানলার রিপিট পরিষ্কার করতে হয়। যখন সে প্রথম ফার্স্ট ডিভিশন লিগে দর্জিপাড়া একতা—য় খেলতে শুরু করেছে তখন যুগের যাত্রীকে সে গোল দিতেই রেফারি অফসাইড জানিয়ে গোলটি বাতিল করে। অবশ্যই অনসাইড থেকে করা গোল, তা ছাড়া সমীরণের মতো আনকোরা ফুটবলারদের কাছে যাত্রীর মতো গত বছরের চ্যাম্পিয়ন দলকে ঘেরা মাঠে প্রথম খেলতে নেমেই গোল দেওয়া তো চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো ব্যাপার। রাগে জ্বলে উঠে সে মনের ভারসাম্য নষ্ট করে রেফারিকে বলেছিল, ”যাত্রীর চাকর” এবং আরও কিছু কথা। সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড তাকে দেখতে হয়েছিল। পরদিন কাগজে তাকে মাঠ থেকে বের করে দেওয়ার খবরটা পড়ে বেগারদের একজন, রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের অবসারপ্রাপ্ত কম্যান্ডান্ট জি. সি. দত্ত, এই ‘আনস্পোর্টিং ইনডিসিপ্লিনড বিহেভিয়ার”—এর দুঃসংবাদটি পিসির কানে তুলে দেন। ”লজ্জায় মাথাকাটা যাওয়া” রেখা গুপ্ত অতঃপর অপরাধী ভাইপোর আত্মপক্ষ সমর্থন শোনা ও রায় দেওয়ার জন্য কতক্ষণ সময় নিয়েছিলেন?
”রেফারিকে তুই চাকর বলেছিস! এই পরিবারের ছেলে এমন অভব্য, অসভ্য, জন্তু, এমন আনকালচার্ড হবে ভাবতেও পারি না!’
”পিসি, এর থেকেও খারাপ নোংরা কথা ছেলেরা রেফারিকে বলে। আমি তো সেই তুলনায়—”
”চুউপ।”
”পিসি, রেফারি ইচ্ছে করেই আমার গোলটা—”
”আবার কথা!”
”রেফারি যাত্রীর টাকা—” সমীরণের চুল ততক্ষণে পিসির হাতের মুঠোয় বন্দি।
