অনুপম মাথা নাড়ল। বারিন দত্ত জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
”বাচ্চচুকে নিয়ে ওর মার কাছে যাব বলেছি—এইখান থেকেই শুরু হবে আমায় গোড়ায় ফিরে যাওয়া। বারিনদা, আগে এক্স—রে নয়, আগে বাচ্চচু—আমার মোটিভেশন।”
”অনু ওকে নিয়ে বেহালায় যেতে যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে।” রবিদা বোঝাবার চেষ্টা করল। ”আগে বরং এক্স—রেটা করিয়ে নে। কাল তো আমি দিয়ে আসবই। তুই পরে নয় বেহালায় একদিন গিয়ে—।” তার কথায় কান না দিয়ে, মাথা নাড়তে নাড়তে অনুপমকে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে রবিদা কথা থামিয়ে ফেলল।
ঘরের বাইরে দালানে চন্দন উবু হয়ে বসে পল্টনের মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছিল আর পল্টন চোখ বুজিয়ে তার লেজ মৃদু মৃদু নাড়ছিল। অনুপমকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে চন্দন উঠে দাঁড়াল।
”রবি জ্যাঠামশাই যে কথাটা বললেন সেটাই কিন্তু করা উচিত—আগের কাজ আগে।” চন্দন মৃদু শান্ত স্বরে অনুরোধের ভঙ্গিতে বলল।
”কোন কাজটা আগে করার কথা বলছ?” অনুপম থতমত হল আচমকা এমন একটা কথা শুনে।
”একটু আগে যে বললেন আপনার কাজটা করতে হয় বডি দিয়ে! তা হলে এখন আগের কাজ হল, বডিটাকে হান্ড্রেড পারসেন্ট ফিট রাখা, তৈরি রাখা। তা না রাখলে আপনার মধ্যে নেগেটিভ চিন্তা আসবেই। হাঁটুতে জখম থাকলে আপনি কি পুরো ক্ষমতা নিয়ে খেলতে পারবেন?….. মোটিভেশন যতই থাকুক না।”
”তা হলে?” অনুপমকে বাচ্চচাছেলের মতো অসহায় দেখাচ্ছে।
ডা. চ্যাটার্জি অনুপমের পিছনে দাঁড়িয়ে চন্দনের কথাগুলো শুনেছেন। তিনি এবার বললেন, ”তা হলে উচিত এখনি এক্স—রে করা। আর আমার যা মনে হচ্ছে, অপারেশন করতেই হবে, কালকেই। প্রচণ্ড ক্ষতি, তা না হলে কিন্তু হয়ে যাবে।”
অনুপম মুখ নামাল ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য। পায়ের কাছে মুখ তুলে পল্টন বসে। দুজনে চোখাচোখি হতেই পল্টন কানদুটো ঘাড়ের সঙ্গে মিশিয়ে লেজ নেড়ে ছোট করে একটা ”ভ্যাক” করল। অনুপম ঝুঁকে দুহাত বাড়াতেই পল্টন সামনের দুপা তুলে দাঁড়িয়ে উঠল। ওর মাথাটা ধরে পেটের কাছে টেনে এনে হাত বোলাতে বোলাতে অনুপম বলল, ”বাচ্চচুর সঙ্গে দেখা করতে বেহালায় আমি যাব, রবিদা তুমি আমায় নিয়ে যেয়ো। বারিনদা, দুলোদা, সামনের বছরের জন্য যে টাকাটা আমাকে দেবেন সেটা বাচ্চচুর মায়ের হাতে… আচ্ছা পরে এ নিয়ে কথা বলব। চলুন তা হলে।” অনুপম হাত বাড়িয়ে চন্দনের কাঁধ ধরে গাড়ির দিকে এগোল।
সামনের আসনে বারিন দত্ত, পেছনে দুলাল শীলের কোলে পা ছড়িয়ে আধশোয়া অনুপম। অন্য গাড়িতে ডা. চ্যাটার্জি। গাড়ি ছাড়ার সময় দুলাল স্বগতোক্তি করল, ”কী ভয়ঙ্কর যে চব্বিশটা ঘণ্টা কেটে গেল!”
অনুপম চোখ বন্ধ করল। জানলা থেকে রবিদার গলা শোনা গেল, ”তোকে নিয়ে একদিন বেহালায় আমি যাব।”
গাড়ি তেঁতুলতলা থেকে পাকা বাস—রাস্তায় পড়তেই অনুপম দু’হাতে চোখ চেপে ধরল।
দলবদলের আগে
দলবদলের আগে – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
।। ১ ।।
দমদম থেকে ভি আই পি রোড ধরে কলকাতার দিকে যেতে ডান দিকে পড়বে সুশোভন পল্লি। তিরিশ ফুট চওড়া একটা পাকা রাস্তা ভি আই পি রোড থেকে বেরিয়ে ঢুকে গেছে এই পল্লির মধ্যে। রাস্তাটা বেড় দিয়ে রয়েছে বাইশ বিঘার এই বসতিকে। নামের সঙ্গে ‘পল্লি’ শব্দটা থাকায় অনেকেরই মনে হতে পারে এখানে মাটির বা ছ্যাঁচা বাঁশের দেয়াল দেওয়া খড় বা টালির চালের ঘর, চালের ওপর লাউ বা কুমড়ো গাছের পাতা, কাঁচা নর্দমা আর তাতে জমে থাকা পাঁক, দড়িতে বাঁধা দু—চারটে গোরু বা ছাগল এবং প্রতি বাড়ির সামনে কুকুর আর শুকোতে দেওয়া ভিজে শাড়ি—ব্লাউজ, পাজামা ইত্যাদি দেখা যাবে, তা হলে তিনি কিন্তু ভুল করবেন।
সুশোভন পল্লি সম্পন্ন গৃহস্থদের একটা ছোটখাটো উপনিবেশ। পঁচাত্তরটি প্লট নিয়ে এটি গড়ে উঠেছিল কুড়ি বছর আগে। প্রতি বাড়ির সামনে পনেরো ফুট চওড়া রাস্তা, বাড়িগুলোর অধিকাংশেরই বুকসমান ছোট্ট লোহার ফটক, তারপর সিঁড়ি আর ছোট একটা দালান, যেটা গ্রিল ঘেরা। চেয়ার পেতে সেটা বৈঠকখানাও করা যায়। অধিকাংশ ফটকের পাশের দেয়ালে পাথরের ফলকে বাড়ির নাম আর নম্বর। নামের সঙ্গে স্মৃতি, ভিলা, কুঞ্জ, নীড়, কুটির, নিকেতন প্রভৃতি যোগ করা।
একটি ছোট পুকুর ও চিলড্রেনস পার্ক আছে সুশোভনে। পুকুরে স্নান করা বারণ এবং মাছধরাও। তবে পুঁটি ও মৌরলা ছাড়া আর কিছু যে নেই, সে সম্পর্কে পল্লির বাসিন্দারা নিশ্চিত। কেননা, মাছ—চোরেরাই জানিয়ে দিয়েছে, এই পুকুরে জাল ফেলে তারা আর বোকামি করবে না। আধ বিঘার ছোট্ট পার্কটিতে দুটি দোলনা ও দুটি সি—শ্য ছাড়া আছে মুখোমুখি দুটি কংক্রিটের বেঞ্চ। পার্কের চারদিক ঘিরে কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছ এবং রাস্তা। পার্কটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার কালে দোপাটি, গাঁদা, কামিনী, জবা প্রভৃতি ফুলগাছ দিয়ে সাজানো হয়েছিল। পল্লির অ্যাসোসিয়েশন থেকে একজন মালিও রাখা হয়। কিন্তু এক বছরের মধ্যে অধিকাংশ গাছ উধাও হওয়ায় সুশোভনকে শোভনীয় করার চেষ্টা থেকে অ্যাসোসিয়েশন ক্ষান্তি দেয়। পার্কের চারধারে যে বাড়িগুলি তার কয়েকটি চারতলা, কয়েকটি দোতলা এবং বাকিসব একতলা। পল্লির পেছন দিকে, যাঁরা দেরিতে প্লট কিনেছিলেন, তাঁদের বাড়িগুলির অধিকাংশই একতলা। কয়েকটা প্লটে প্লাস্টার ছাড়াই অসমাপ্ত বাড়িতে লোক বসবাস করছে। এই বাড়িগুলির পেছনে অর্থাৎ সুশোভন পল্লির এলাকার বাইরেই বন্ধ হয়ে যাওয়া একটা ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানার মাঠ।
