ডা. চ্যাটার্জি, তাঁর পেছনে বারিন দত্ত আর দুলাল শীল!
”এখানে শুয়ো পড়ো, পা—টা দেখি।” ডা. চ্যাটার্জি ব্যস্ত এবং কড়া গলায় প্রথম কথাটি বললেন।
”আপনারা?”
”ওসব পরে শুনো। আগে শোও।”
অনুপমকে দু’ পাশ থেকে ধরে তুলল বারিন দত্ত ও দুলাল শীল। তাদের কাঁধে ভর দিয়ে সে তক্তপোশের ওপর বসল। পা তুলে ছড়িয়ে দেওয়ার সময় যন্ত্রণায় আবার সে কাতরে উঠল।
”এটা কী?”
”কুকুরে কামড়াতে গেছল, পারেনি।” চন্দন সবার আগে উত্তরটা দিল। ”বাড়ির পোষা কুকুর।”
ডা. চ্যাটার্জি হাঁটুর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে মুখ গম্ভীর করে মাথা নাড়লেন। তারপর আলতো করে আঙুল রেখে সামান্য চাপ দিতেই অনুপম ”উহহ লাগছে” বলে উঠল। হাঁটুটা মুড়ে ওপরে তুলতে গেলেন। অনুপম, ”না, না, পারব না।” বলে পিঠ বাঁকিয়ে তুলল।
”আর দেখার কিছু নেই। এখনই কলকাতায় নিয়ে চলুন। এক্স—রেটা আজই করাতে হবে। কালই অপারেশন করব।” ডা. চ্যাটার্জি সাদামাঠা শান্ত পেশাদারি গলায় বললেন।
সারা ঘর চুপ। প্রথম কথা বলল দুলাল শীল। ”ফেডারেশন কাপে খেলতে পারবে তো? আর দেড় মাস পরেই—”
”থাম দুলো,” বারিন দত্ত হাত তুলে বিরক্ত দৃষ্টিতে দুলালকে মৃদু ধমকাল। ”ডাক্তার চ্যাটার্জি যা বলছেন…. গাড়িটা ভেতরে আনতে বল। আমার অ্যাম্বাসাডারেই যাবে।… দেড়মাসে কি কখনও হাঁটু ঠিক হয়? তিরিশ বছর ধরে হাঁটুর চোট কম তো দেখিনি। তাড়াহুড়ো করে মাঠে নামিয়ে দিয়ে কত ছেলের কেরিয়ারও শেষ হতে দেখেছি। ফেডারেশন আমার দরকার নেই, সামনের লিগটা নিয়েই আমি ভাবছি।”
”এই পা নিয়ে হাঁটাচলা করলে কী করে?” ডা. চ্যাটার্জির বিস্ময় দেখে অনুপম ফিকে হাসল। শুধু হাঁটাচলাই নয়, আট—দশ ফুট ওপর থেকে একটা লাফও সে দিয়েছে।
”ফুটবলারের পা।” এতক্ষণে রবিদা একটা কথা বলার সুযোগ পেয়ে বলল।
বাইরে মোটর এঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল। অনুপম রবিদাকে জিজ্ঞেস করল, ”ওরা কোনও ঝামেলা করেনি তো?”
”না, না। সারা বাড়ি ঘুরে, পেছনে পুকুর টুকুর দেখে বেড়াচ্ছে, তখন পঞ্চি পাশের বাড়ি থেকে এসে হাজির। লোকগুলো তো সব ওর পাড়ারই—গাঁদালপাড়া, বাঁশতলার। মেয়েটা চেঁচিয়ে মেচিয়ে বলল, এ বাড়িতে কোনও বাইরের লোক ঢোকেনি, কোনও লোক দু’দিন ধরে আসেও নি। তাই শুনেই ওরা সরে পড়ল।”
”রবিদা, আমি বলেছিলাম কাল সকালে বাচ্চচুকে নিয়ে আমি—” অনুপম উৎকণ্ঠায় উঠে বসল।
”থাক এখন ওসব। তোর নিজের অবস্থার কথা আগে ভাব। দেরি করলে তোর ক্ষতি হতে পারে, ফুটবল—জীবনটাই শেষ হতে পারে, কিন্তু—বাচ্চচুরা তো রইলই। কোন কাজটা তা হলে আগে করা উচিত?” রবিদা শান্ত গলায় কথাগুলো বলে ওর মাথায় হাত রাখল। ”যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এখন যে ক্ষতি হতে পারে সেটা বন্ধ হোক।”
অনুপম অসহায় বেদনার্ত চোখে সবার দিকে তাকিয়ে অবশেষে চন্দনের মুখের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাল, যেন তার কী করা উচিত সেটাই বলে দিক চন্দন।
কিন্তু চন্দন চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে চলে গেল।
”আর দেরি নয়, রাত হয়ে যাবে পৌঁছতে।” দুলাল শীল তাড়া দিল।
”না।”
ঘরের সবাই সচকিতে অনুপমের দিকে তাকাল। ওর গলার স্বরের সঙ্গে একটা অটল ইচ্ছা বেরিয়ে এসেছে যেটা সবারই কানে ধরা পড়েছে।
”আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। আমাকে কথা রাখতে হবে।” অনুপম দাঁড়িয়ে উঠে বলল। এক পায়ে জোর না থাকায় সে টলছে।
”কীসের প্রায়শ্চিত্ত?” বারিন দত্ত অবাক এবং বিব্রত হয়ে অনুপমকে ধরার জন্য হাত বাড়াল।
”আমার ভাড়াটে ভদ্রলোক কাল খেলা দেখতে গিয়ে মারা গেছে। তারই চার বছরের একমাত্র ছেলে বাচ্চচু। অনু বলেছিল ওকে বেহালায় কাল সকালে মামার বাড়িতে নিজে গিয়ে দিয়ে আসবে।” রবিদা মৃদুকণ্ঠে ধীরে ধীরে কথাগুলো বলল।
”একটা বাচ্চচা পিতৃহারা হল কেন, কী জন্য, কার জন্য?” অনুপম সবার মুখের দিকে এক এক করে তাকাল। কোনও মুখ থেকেই সে উত্তর খুঁজে পেল না।
”আমি, এই আমি।” অনুপম নিজের বুকে আঙুল ঠেকাল। তারপর ফিসফিস করে বলল, ”আমার জন্য, আমার জন্য।”
”শুধু তোর জন্য কেন, ফুটবল কি আর একজনের খেলা? গোটা টিমটাই…।”
”না, না দুলোদা, আমি শুধু আমিই দায়ী।” অনুপম উত্তেজিত হয়ে এগোতে গিয়ে টলে উঠল। বারিন দত্ত তাকে জড়িয়ে ধরে না নিলে পড়েই যেত।
”ছ—সাত বছর আগেও আমি একাই টেনে নিয়ে যেতে পারতাম সারথিকে, আজ আর পারি না। … কেন, কেন এমন হল? আমার নিজের কাছে আমার কোনও মর্যাদা নেই, এর থেকে যন্ত্রণাকর আর কিছু কি হতে পারে?… আমাকে খুঁজে দেখতে হবে কেন এমন হল। আমাকে আবার গোড়ায় যেতে হবে যখন আমি ছিলাম অনামা অখ্যাত এক উঠতি প্লেয়ার, সেই সময়ে যেতে হবে যখন আমি খাটতুম বড় হবার স্বপ্ন নিয়ে, যখন আমার মোটিভেশন ছিল।” অনুপমের উত্তেজনা, আবেগ তার কণ্ঠস্বরের সঙ্গে দেহকেও থরথর কাঁপাচ্ছে। কথাগুলো যে তার অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসছে সেটা বুঝতে পারছে সবাই।
”দুলোদা, বারিনদা, মানমর্যাদা চেষ্টা করলে ফিরে পাওয়া যেতে পারে, আমি আবার চেষ্টা করব।”
”তা হলে তাড়াতাড়ি চল।” দুলোদা ঘড়ি দেখল, ”এক্স—রে আজ আর বোধহয় করা যাবে না, কসবায় আমাদের এক মেম্বারের এক্স—রে প্লান্ট আছে, ব্যবসা করে। তাকে গিয়েই ধরব যদি আজই করে দেয়।”
