ফুটবল নিয়ে কথা বলায় ছেলেটির কোনও আগ্রহই নেই। অথচ চার বছর আগে আমার অটোগ্রাফ চেয়েছিল! অনুপম এই প্রথম দেখছে, তার উপস্থিতি একদমই উত্তেজিত করল না একটি কিশোরকে।
”তোমার মনে আছে কি, একটা হ্যান্ডবিল নিয়ে তুমি তাতে আমার অটোগ্রাফ চেয়েছিলে?”
”হ্যাঁ।” চন্দনের মুখে লাজুক হাসি ফুটল। ”আপনি দেননি।”
‘সেটা ছুড়ে তোমার কপালে মেরেছিলাম।”
”হ্যাঁ, কিন্তু আমার লাগেনি।”
”তাতে তুমি দুঃখ পাওনি।”
”একটু, তারপর ভুলে গেছলাম।” চন্দনের বড় বড় চোখ দুটিতে অনুপমকে গ্রাহ্যে না এনে তাচ্ছিল্য দেখানোর কোনও চেষ্টা নেই। সরল, অকপট, আন্তরিক চাহনি। অনুপমের ভেতরটা কুঁকড়ে ছোট হয়ে গেল।
”বাবা বলেছিলেন, খুব অন্যায় করেছিস। অতবড় প্লেয়ারকে ওইরকম একটা বাজে কাগজে সই চেয়ে তাকে অসম্মান করেছিস। তারপর আমি ভেবেছিলাম আপনাকে চিঠি লিখে ক্ষমা চাইব। কিন্তু কেমন লজ্জা করল, তাই লেখা হয়নি।…. আচ্ছা এখন যদি আপনার কাছে মাফ চাই?”
অনুপম অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে চন্দনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বলছে কী! ওকে তো আমিই অপমান করেছি, ওরই তো রেগে থাকার কথা। তার বদলে ও আমায় শ্রদ্ধা দিল। একটা আবেগ অনুপমের বুক থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে যেতে লাগল আর সে আবিষ্কার করল তার শরীর থেকে ব্যথা—যন্ত্রণা ক্রমশ যেন মিলিয়ে যাচ্ছে।
”এখন কার কাছে তুমি মাফ চাইবে, আমি তো সেদিনের মতো অত বড় প্লেয়ার আর নই। আজ আমি মার খাওয়ার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার জন্য, কাগজে পড়েছ তো, কত কিছু ঘটে গেল।”
”আপনি নিশ্চয় আবার পরিশ্রম করে বড় হয়ে উঠবেন।” চন্দন খুব সাধারণ গলায় বলল। ”আমি ক্লাস নাইনে ইতিহাসে খুব কম নম্বর পেয়েছিলাম, মাত্র পঞ্চান্ন। বাবা বললেন, একটু জোর দাও, আলাদা যত্ন নাও। প্রতিদিন পনেরো মিনিট সময় দিয়েছি ইতিহাসকে। একদিনও বাদ যায়নি। মাধ্যমিকে লেটার পেলাম। আপনিও যদি… না না, পনেরো মিনিটে হবে না জানি। যতটা দরকার, যদি ততটা সময়—।”
চন্দনের পক্ষে বলা সম্ভব নয় একজন ফুটবলারের কী কী করা দরকার। তাই সে কথা থামিয়ে ফেলল। কিন্তু অনুপমের মনের মধ্যে অজস্র কথা ঘুরপাক খেয়ে উঠল।
”চন্দন, তুমি পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করতে চাও কেন?”
মুশকিলে পড়ে গেল চন্দন। এভাবে কেউ এই প্রশ্ন তাকে এখনও করেনি। সে বিব্রত হয়ে বলল, ”ভাল রেজাল্ট তো সবাই করতে চায়, আমিও চাই। ওপরের দিকে থাকলে খুব ভাল লাগবে, সবাই প্রশংসা করবে।”
”আমিও তাই চেয়ে খুব পরিশ্রম করেছিলাম। কিন্তু কিছুটা উঠেই আর করিনি। আমার কাজটা হয় বডি দিয়ে, তোমারটা ব্রেইন দিয়ে, এইখানেই আমাদের বড় পার্থক্য। শরীরের ক্ষমতা এক সময় তো কমতে শুরু করবেই কিন্তু তোমার ক্ষমতাটা যত চর্চা করবে, তত বাড়তেই থাকবে।”
কথা বলতে বলতে অনুপমের নিজেকে হালকা মনে হতে লাগল। যে গ্লানিটাকে চার বছর ধরে বয়ে চলেছিল, সেটা যেন চন্দনের সঙ্গে কথা বলে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
”আপনার শরীরের ক্ষমতা কি কমে গেছে? বাবা বলেন, কখনও নেগেটিভ চিন্তা কোরো না, তা হলে তুমি ব্যর্থ হবেই। আর শুধুই চিন্তা করে সফল হওয়া যায় না, কাজও করতে হয়। কাজে কখনও ঢিলে দিয়ো না।”
অনুপম চুপ করে রইল। শরীরের ক্ষমতা এই ঊনত্রিশ বছর বয়সে কমবে কেন, তা হলে তার মধ্যে কী ঘটল? নেগেটিভ চিন্তা? কজে ঢিলেমি?
”তোমার বাবা কী করেন?”
”ক্লার্ক। ইস্টার্ন রেলে, হাওড়া অফিসে।”
”তোমাদের বাড়িটা খুব বড়, আর পুরনো।”
”একশো কুড়ি বছর আগের তৈরি। এখানে আমাদের অনেক জমিজমা ছিল।”
”এখন নেই?’
চন্দন হেসে, জবাব না দিয়ে দরজার দিকে তাকাল। পল্টন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। মাঝারি গড়নের, কালো আর বাদামি রঙের দো—আঁশলা কুকুর। চন্দন হাত নেড়ে ওকে চলে যেতে নির্দেশ দিল। পল্টন দু’ পা পিছিয়ে বসে পড়ল।
”এখন আমাদের কিছুই নেই বাড়ি আর বাগানটা ছাড়া। বাবা বলেন, ধনসম্পত্তি আর ফিরিয়ে আনা যাবে না, কিন্তু মানমর্যাদা তো চেষ্টা করলে ফিরে পাওয়া যেতে পারে।”
”কীভাবে?” অনুপম টানটান হয়ে বসল। চন্দনের উত্তর তার কাজে লাগতে পারে।
”আমি যদি বড় হতে পারি। বড় মানে ধরুন… খুব বড় বিজ্ঞানী, বড় ডাক্তার, সুপ্রিম কোর্টের জজ, ব্যারিস্টার কি ভাইস চ্যান্সেলার, ইকনমিস্ট। তা হলে আবার আমাদের বাড়ির কথা এই অঞ্চলের লোকেরা বলবে, তাতে আমারও গর্ব হবে।”
”গর্ব তুমি চাও?”
”নিশ্চয়।” চন্দন এমনভাবে তাকাল যেন অঙ্কের সার বোর্ডে দুই আর দুইয়ে পাঁচ লিখে ফেলেছেন। অনুপমের মনে হল, চন্দন যাকে ‘আমাদের বাড়ি’ বলল, সেটাই তার কাছে সারথি সঙ্ঘ। সারথির মান—মর্যাদা তিন বছর ধরে ধুলোয় লুটোচ্ছে, তাই তারও আজ কোনও সম্মান নেই। এই ছেলেটি আবার তার বংশের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য মন দিয়ে লেখাপড়া করছে। আর সে?
অনুপমের সারা শরীর মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়েই পেশিগুলো ধকধক করে উঠল। এখনই যেন ভেতরে কোনও বিস্ফোরণ ঘটে যাবে। রক্ত চলাচল দ্রুত হয়ে উঠছে। তার ইচ্ছে করছে এখনই বল নিয়ে মাঠে ট্রেনিংয়ে নেমে পড়তে। এক মিনিটও আর সে অপেক্ষা করতে পারবে না।… চন্দনের বয়সে তার এমনই হত!
আর সেই সময়েই চন্দনের বাবা ফিরে এলেন, সঙ্গে রবিদা। আর তাদের পেছনে অনুপম যাকে দেখল, তাতে তাজ্জব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
