ভাইয়ের কাঁধে হাতে রেখে খোঁড়াতে খোঁড়াতে কোনি চলে যাচ্ছে।
ক্ষিতীশ একদৃষ্টে তাকিয়ে। মাথাটা উঁচু, কঞ্চির মত শরীরটা দুলছে। সঙ্গে ওর বন্ধু ভাদু আর চণ্ডু। পার্ক থেকে বেরিয়ে ওরা ধীরে ধীরে দৃষ্টির বাইরে চলে যাচ্ছে। ক্ষিতীশের মনে হল, ওর বাড়ির ঠিকানাটা নিয়ে রাখলে হতো।
”আপনাকে বেষ্টা দা ডাকছে।”
‘কে বেষ্টা দা?” অন্যমনস্ক ক্ষিতীশ বলল।
”আজ যিনি সভাপতি।”
ক্ষিতীশকে দেখেই বিষ্টু ধর একগাল হেসে বলল, ”ফিনিশিংটা সবাই বলছে দারুণ হয়েছে। ” তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, ”ইনকিলাব জিন্দাবাদটা অ্যাড করলুম, তার কারণ আছে। আমার প্রগ্রেসিভ নেচারটা বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। চলুন চলুন, আমার গাড়ি রয়েছে, আপনাকে সব বলছি, আমার বাড়ি চলুন।”
বিষ্ণু ধর আগামী সাধারণ নির্বাচনে দাঁড়াবে। তাই এখন থেকেই সে তোড়জোড় শুরু করছে। পাড়ায় পাড়ায় নানান ব্যাপারে টাকা দিয়ে অনুষ্ঠান করাচ্ছে আর তাতে সভাপতি হয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে। নির্দলীয় সমাজসেবক হিসাবে সে ভোট চাইবে।
বিষ্টু ধর গাড়িতে বসে কথাগুলো জানিয়ে দিল।
বাড়ি পৌঁছে বলল, ”আপনাকে আমার দরকার।”
”আমাকে!”
”হ্যাঁ, আপনি আমার ইস্পীচ—রাইটার হবেন, বক্তৃতা লিখে দেবেন। অবশ্য এজন্য টাকা দোব। রাজী?”
”আমি তো খেলার ব্যাপার ছাড়া আর কিছু জানি না!” ক্ষিতীশ বিস্ময়ের ধাক্কা সামলাতে সামলাতে বলল।
”সেইজন্যেই তো আপনাকে চাই। খেলা নিয়েই বক্তৃতা দিতে চাই, আর কিছু নিয়ে নয়। বিনোদ ভড় হচ্ছে সিটিং এম এল এ। খেলার লাইনের লোক। অনেক ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। আমিও খেলার লাইন ধরে ক্যামপেন করব। বিনোদ ভড় মিনিস্টার হতে চায়।”
সিঙ্গাড়া মুখে দিয়ে ক্ষিতীশ বলল, ”ভেবে দেখি।”
।। ৫ ।।
রবীন্দ্র সরোবরে এক মাইল সাঁতার প্রতিযোগিতা।
পঁচিশজন প্রতিযোগী। বাইশটি ছেলে ও তিনটি মেয়ে।
স্টারটিং পয়েন্টে ভীড়। প্রতিযোগীরা তেল মাখায় ব্যস্ত। উদ্যোক্তা ঢাকুরিয়া স্পোর্টস ক্লাবের অনুরোধে ক্ষিতীশ প্রতিযোগিতার রেফারী অফ দ্য কোর্স। সাঁতারুদের সঙ্গে সঙ্গে যাবে নৌকোয়।
স্টারটিং পয়েন্ট থেকে একটু এগিয়ে সে আর ভেলো নৌকোয় বসে।
”ক্ষিদ্দা, কে জিতবে বলো তো? সুবীরই মনে হচ্ছে।”
”সুবীরের নামা অন্যায় হয়েছে। এসব কম্পিটিশনে নামীদের থাকা উচিত নয়। ও তো ন্যাশনাল জুনিয়ার রেকর্ড হোল্ড করছে।”
”যা বলেছ। তবে বেশির ভাগই আনকোরা দেখছি।”
ভেলো সারি দিয়ে দাঁড়ানো সাঁতারুদের পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল, ”ওই লাল কস্ট্যুমপরা মেয়েটা কে বলো তো? কখনো তো দেখিনি!”
এত দূর থেকে ক্ষিতীশ, পুরু লেনসের মধ্য দিয়ে, শাদা টুপি মাথায়, লাল রঙে মোড়া তুষারধবল একটি দেহমাত্র দেখতে পেল।
”কে, তা আমি জানব কি করে!”
”না, এমনিই বলছি। বালিগঞ্জ ক্লাবের ট্রেনার প্রণবেন্দু বিশ্বাসকে দেখলুম কিনা মেয়েটার সঙ্গে। খুব বড়লোক মনে হল। ওই যে সবুজ মোটরটা, ওটায় করে এসে নামল। সঙ্গে বাবা—মাও যেন রয়েছে।”
”তুই বড্ড বেশি দেখিস।”
”না দেখে উপায় আছে, মোমের পুতুলের মত চেহারা! ওর পাশেই দ্যাখো, পোড়ামাটির কেলে পিলসুজের মত একটা। কি অদ্ভুত দেখাচ্ছে দ্যাখো।”
ক্ষিতীশ দেখার চেষ্টা করল। সেকেন্ড কয়েক তাকিয়ে থেকে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল একটা শব্দ ”কোনি!”
ঠিক তখনই স্টার্টারের বন্দুক গর্জে উঠল।
সাঁতারুরা এগিয়ে যাবার পর ক্ষিতীশদের নৌকোটা পিছু নিল।
সুবীর এবং আরো গুটি দশেক ছেলে এক ঝাঁকে এগিয়ে গেছে। তারপরেও আর এক ঝাঁক। সব শেষে তিনটি মেয়ে ও দুটি বাচ্চচা ছেলে।
পাঁচশো মিটার পর্যন্ত এরা পাঁচজন প্রায় একসঙ্গেই ছিল। তারপরই লাল কস্ট্যুম ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে শুরু করল।
”ক্ষিদ্দা, স্ট্রোক দেখেছ! শরীরটা কেমন ভাসিয়ে রেখেছে!”
ক্ষিতীশ কিছুক্ষণ লক্ষ করে বলল, ”মাথাটা ঠিকমত নাড়ানো হচ্ছে না। সেন্ট্রাল পোজিশনে না থাকলে শরীরের ব্যালান্স নষ্ট হয়, স্পীডও কমিয়ে দেয়; শরীরটা রোল করছে বড্ড বেশি। কনুই আরো উঠবে…”
”অ্যাই, অ্যাই, অমনি তোমার শুরু হয়ে গেল খুঁত ধরা।’
”খুঁত না ধরলে দোষ সারবে কি করে!”
”ও কি তোমার ছাত্তর?”
”নাইবা হলো।”
সামনের দু ঝাঁকের সাঁতারুদের কেউ কেউ এবার মন্থর হয়ে পিছিয়ে পড়ছে। ক্ষিতীশ ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকাল। বাচ্চচা ছেলে দুটির সঙ্গে কোনি আসছে বৈঠার মত হাত চালিয়ে, দু’ধারে মাথা নাড়াতে নাড়াতে। ওদের থেকে অন্তত কুড়ি মিটার সামনে আর একটি মেয়ে, সমান তালে একই গতিতে সাঁতরে চলেছে। লাল কস্ট্যুমের মেয়েটি তার থেকে আরো তিরিশ মিটার সামনে এবং একটি ছেলের থেকে হাত দশেক পিছনে।
”কো ও ও নি ই ই।”
সরোবরের পূর্ব তীর থেকে একটা চীৎকার ভেসে এল।
ক্ষিতীশ আর ভেলো একসঙ্গেই তাকাল বছর পঁচিশের শ্যামবর্ণ একটি রুগ্ন যুবক পাড় ঘেঁষে ছুটছে। পরণে ধুতি ও নীল শার্ট। চটি জোড়া হাতে।
”কো ও ও নি ই।”… কো ও ও নি ই ই।”
গলার স্বরটা আর্তনাদের মত শোনাচ্ছে। পাড়ে ভীড় জমেছে। সাঁতার দেখতে। তাদের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে সে ছুটছে। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে তাকাচ্ছে। মুখখানি অসহায়।
”কো ও ও নি ই।”
চীৎকারটা হতাশায় ভেঙ্গে পড়ল। ক্ষিতীশ দেখল কোনিকে পিছনে ফেলে বাচ্চচা দুটি এগোচ্ছে। লাল কস্ট্যুম দুটি ছেলেকে পিছনে ফেলে দিয়েছে।
