”বাবা, ইনি বিখ্যাত ফুটবল প্লেয়ার অনুপম বিশ্বাস। রবি জ্যাঠামশায়ের ভাই, এখানে একবার এসেছিলেন।”
কথাটা শুনেই অনুপম চোখ খুলল। চন্দনের সঙ্গে চোখাচোখি হল। মুখে হাসি ছড়িয়ে চন্দন ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
এইবার মনে পড়েছে। সেই ফরসা, রুগণ, লম্বাটে মুখ। সেইভাবেই পাতাকাটা চুল কপালে ঝুলে রয়েছে। চারটে বছর ওকে আর একটু বড় করে দিয়েছে আকারে। চোখ দুটিকেও। গলার স্বর অতটা মিষ্টি আর নেই। গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া সবই তো আগের মতো।
তাই কি? সেই চাহনি, সেই দৃষ্টি! সরল, গভীর আয়ত চোখে ফুটে ওঠা অপমানের ব্যথাটা তো অনুপম দেখতে পাচ্ছে না! অত লোকের সামনে অপ্রতিভ হওয়ার লজ্জা কাটাতে হাসির জন্য মর্মান্তিক চেষ্টাটা এখন আর ওর ঠোঁটে নেই। কাগজটা পাকিয়ে ছুড়েছিল ওর কপালে। বাইরে কোনও ইনজুরি হয়নি, কোনও আঁচড় স্মৃতিতে পড়েছিল কি? ওর কি কিছুই মনে নেই! তাই কি হয়!
‘আমি কে সেটা আগে জেনে এসে…’, হায় রে, কে এখন অনুপম বিশ্বাস? তাকে এবার নিজের মুখে নিজের পরিচয় দিয়ে ভিখিরির মতো বলতে হবে, আমাকে বাঁচাও, আমাকে ক্ষমা করে দাও।
”আমাকে যদি রবিদার বাড়ি পৌঁছতে একটু সাহায্য করেন—” অনুপম ওঠার চেষ্টা করতে করতে আবার বসে পড়ল চেয়ারে।
”নিশ্চয়। গরম জলে আগে জায়গাটা ধুয়ে ওষুধ লাগিয়ে নিন। রবিদার আর আমাদের বাড়ির পেছন যদিও পিঠোপিঠি, তবে দুটো বাড়ির সদর দুই রাস্তায়। আপনাকে ঘুরে অনেকটা হেঁটে যেতে হবে। আমি বরং রবিদাকে খবর দিয়ে আনাচ্ছি।… খুব কি যন্ত্রণা হচ্ছে? আসলে জানেন, কুকুরটাকে আমরা সন্ধের সময়…”
বিব্রত ও উদ্বিগ্ন ভদ্রলোককে থামিয়ে অনুপম বলল, ”যন্ত্রণা হচ্ছে, কিন্তু কুকুর কামড়ানোর জন্য নয়। দাঁতটা সামান্যই বসেছে। আমি রবিদার কথা ভাবছি। একদল লোক ওর বাড়িতে হামলা করতে ঢুকেছিল ছেলেধরা খোঁজার নাম করে। তাদের হাত এড়াতে আমি পাঁচিল টপকে আপনাদের বাগানে নেমেছি।” অনুপম কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীরব থেকে, মাথা নামিয়ে মৃদুস্বরে আবার বলল, ”আমার জন্য, এ সবই আমার জন্য। মানুষের ক্ষতিই শুধু করে গেলাম।… কী যে খেললাম এতদিন ধরে! কারও কোনও উপকারে এলাম না।”
হতভম্ব ভদ্রলোক ওর ব্যথিত বিষণ্ণ কথা শুনে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি বললেন, ”আমি অবশ্য খেলাটেলা বুঝি না, খোঁজখবরও রাখি না, তবে আপনার নাম আমি শুনেছি। বিরাট প্লেয়ার আপনি—”
”বাজে কথা। সব বানানো, সব তৈরি করা। অবিরত লিখে লিখে বিশ্বাস করিয়ে দেওয়া হয়েছে। হতে পারতাম… বড় প্লেয়ার হতে পারতাম। সেই স্বপ্ন নিয়ে বারো বছর আগে ঘর ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছিলাম। প্রচণ্ড খাটতাম, খেলাই ছিল আমার সব কিছু, আমার ধ্যানজ্ঞান, আমার জীবন।”
অনুপম ম্লান চোখ দেয়ালে টাঙানো ম্লান ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। অন্যমনস্কের মতো কিছু যেন ভাবছে। ভদ্রলোক ওর ভাবনায় ব্যাঘাত না ঘটিয়ে চুপ করে রইলেন।
স্বীকারোক্তি করার মতো নিচু গলায় অনুপম কথা বলছে। এই সময় এই সব কথা বলার কী দরকার, তা সে বুঝতে পারছে না। কথাগুলো নিজের থেকে বেরিয়ে এল অন্তর ভেদ করে।
”নিজেকে নিজেই তৈরি করে নিয়েছি, সেজন্য অনেক ব্যাপারে স্বার্থপর হয়েছি। সবাই বলবে অন্যায় করেছি, বলুক তারা। মানুষকে আনন্দ দেওয়া আমার কাজ, এর একটা গুরুত্ব সমাজে আছে। সারথির হাজার হাজার সাপোর্টারকে আনন্দ দিয়েছি, এর কি কোনও দাম নেই?”
অনুপম ছবি থেকে চোখ সরিয়ে রাখল ভদ্রলোকের মুখে। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে নড়ে বসে বললেন, ”আজকের কাগজে দেখলাম—”
”জানি, কী দেখেছেন। আমিই সেই লোক যার জন্য মাঠে এত হিংসা, রক্ত, মৃত্যু ঘটে গেল। ভালবাসার কথা, ভাল কাজ করার প্রেরণা, মঙ্গলের পথ দেখানো—আমার খেলা দিয়ে জানাতে পারিনি, দেখাতে পারিনি।” অনুপমের কণ্ঠস্বর প্রান্তরে হা হা রবে বয়ে—যাওয়া বাতাসের মতো শোনাল।
জল নিয়ে চন্দন ঘরে ঢুকল। শুশ্রূষার দায়িত্ব তাকে দিয়ে তার বাবা রবিদাকে খবর দিতে চলে গেলেন। বালতির জলে মুখ ও হাত থেকে ধুলো—মাটি ধুয়ে ফেলল অনুপম। গরম জলে ক্ষত পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছিল চন্দন। অনুপম ওর শান্ত, অচঞ্চল মুখের দিকে তাকিয়ে আলাপ শুরু করল, ”স্কুলে পড়ো।”
”হ্যাঁ, ক্লাস টুয়েলভ হবে।”
”খেলা দ্যাখো… ফুটবল?”
”আমাদের টিভি নেই। তবে এখানকার খেলা দেখি।”
”কালকের খেলায় যা ঘটেছে তা শুনেছ, পড়েছ?”
”আমাদের পাড়ার একটা ছেলে খেলা দেখতে গেছল, তার কাছে শুনলাম খুব হাঙ্গামা হয়েছে। কাগজেও পড়লাম, লোক মরেছে… আপনার জন্যই সব ঘটেছে।”
”কী করে জানলে আমার জন্যই ঘটেছে?”
”কাগজে লিখেছে।”
তা হলে সুপ্রিয় গুপ্ত সফল। খেলা দেখে না যে ছেলে, তাকেও বুঝিয়ে দিতে পেরেছে অনুপমই সব কিছুর মূলে।
”ট্রাইবেকারে শেষ কিকটা ছিল আমার। যদি গোল দিতাম তা হলে ম্যাচটা ড্র হত, আমরা যুগ্ম বিজয়ী হতাম। আমার কিকটা বারের ওপর দিয়ে চলে গেল। না গেলে আমাকে কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যেত, এত সব কিছুই হত না।” অনুপম হাসার চেষ্টা করল।
”গোল একটা অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না?”
প্রশ্নটা এড়িয়ে চন্দন বলল, ”পল্টন খুব বেশি কিছু করেনি, দু’দিনেই শুকিয়ে যাবে। ভয়টয় দেখায়, তাড়া করে, তবে ফেরোসাস নয়। আপনার প্যান্টটা গোটানোই থাক, নইলে ওষুধ লেগে যাবে।”
