অনুপম বাঁ পা ফেলেই কাতরে উঠল। সে মাথা নেড়ে বিড়বিড় করল, ”অসম্ভব, অসম্ভব।” তারপরই দেখল হাত—কুড়ি দূরে কুকুর। মাঝারি আকৃতির, গায়ের রং নিশ্চয় সাদা নয়, তা হলে ঘোলাটে দেখাত। ভয় পেয়েই অনুপম, ”হ্যাট, হুশশ, হুশশ” শব্দ করল মুখ দিয়ে, আর সঙ্গে সঙ্গে জেনে গেল ভীষণ বোকামি করে ফেলেছে।
কুকুরটা মুখ নিচু করে, হিংস্র ডাক ছেড়ে তেড়ে এল তার দিকে। পায়ের ব্যথা ভুলে অনুপম খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাড়িটার দিকে এগোল। কুকুরটা পেছন থেকে এসে ডান গোড়ালির কাছে তার প্যান্ট কামড়ে টান দিল।
”অ্যাই, অ্যাই।” অনুপম পা ছুড়ল। নিচু হয়ে হাতড়ে হাতড়ে একটা মাটির ঢেলা পেয়ে কুড়িয়ে নিল। কুকুরটা চার—পাঁচ হাত দূর থেকে গজরাচ্ছে।
ঢেলাটা ভেঙে একটা টুকরো ছুঁড়েই সে বাড়িটার দিকে মরিয়া হয়ে এগোল। প্রায় ছুটেই। পেছনে আবার গজরানি এবং বাঁ পায়ের ডিমের কাছে প্যান্ট ভেদ করে দাঁত বসানোটা টের পেয়েই সে ঘুরে নিচু হয়ে ঘুসি চালাল। কুকুরটার মাথায় লেগেছে। একটু পিছিয়ে গিয়ে তারস্বরে জানোয়ারটা চিৎকার করতে লাগল।
”পল্টন, আয় আয়, পল্টন।” বাড়ির ভেতর থেকে পুরুষকণ্ঠের ডাক শোনা গেল। পল্টন নিশ্চয় এই কুকুরটাই, কেননা ওর ঘেউ ঘেউ আরও বেড়ে গেল ডাকটা শুনে কিন্তু আর কামড়াতে এগোল না।
বাড়ির সামনের দিকে যাওয়ার পথটা যে কোনদিকে অনুপম তা ঠাওর করতে পারছে না। সেই সময় দোতলার জানলা থেকে বয়স্ক পুরুষ গলায় কে বলল, ”দ্যাখ তো, পল্টনটা চেঁচাচ্ছে কেন। শুনছি ছেলেধরা নাকি তাড়া খেয়ে এদিকে এসেছে।”
”দয়া করে একটু কুকুরটাকে ডেকে নেবেন?” ডুবন্ত মানুষ সামনে দিয়ে ভেসে যাওয়া কাঠের টুকরো দেখলে যেমন মরিয়া হয়, অনুপম সেইভাবেই বলল, ”আমি আপনাদের পাশের রবি সরকারের বাড়ির লোক।”
দোতলায় বিস্ময়জনিত একটা শব্দ হল। ”আপনি এখানে কী করছেন… পল্টন, এই পল্টন।” ধমকে উঠল লোকটি। ”আয়, ভেতরে আয়।”
অনুপমকে এড়িয়ে ঝোপের পাশ দিয়ে কুকুরটা ছুটে চলে গেল। দোতলা থেকে নির্দেশ এল, ”ডানদিক দিয়ে ঘুরে আসুন।”
অনুপমের আর হাঁটার ক্ষমতা নেই। বাঁ পা ফেললেই হাঁটু থেকে একটা তীক্ষ্ন যন্ত্রণা মাথার তালু পর্যন্ত পেশি, শিরা, অস্থি চিরে চিরে উঠে আসছে। জ্বালা করছে পায়ের ডিমের কাছটা। দাঁত বসিয়েছে তো বটেই, মাংসও তুলে নিয়েছে কি না সে বুঝতে পারছে না।
সে জমিতে দুই তালু রেখে হামা দিতে গেল। পারল না। ব্যথাটা আরও অসহ্য হয়ে তাকে উপুড় করে প্রায় শুইয়ে দিল। কুকুরটা যদি ফিরে আসে তা হলে কিছুই তার করার থাকবে না। তবে ওটা কুকুরই, প্রভুর আদেশ মেনে চলে।
বাড়ির কোনও লোক যদি এখন এসে পড়ে তা হলে সে এই অসহায়তা থেকে রেহাই পেতে পারে। অনুপম করুণ চোখে জানলাটার দিকে তাকাল। অন্ধকার। কুকুরটা বাড়ির মধ্যে একবার ডেকে উঠল।
আজ এই অবস্থা আমার হল কেন? মাটিতে মুখ ঠেকিয়ে অনুপম চোখের জল আটকে রাখার কোনও চেষ্টা করল না। এত অপমান, এত হীনতা স্বীকার, এত ভয় পাওয়া, এত হেনস্থা আর লাঞ্ছনা! কী পাপ আমি করেছি? মাটিতে গড়াগড়ি খেতে হবে কেন? কী আমার দোষ? ভারতের এত বড় ফুটবলার এমন শাস্তি পাবে কোন রুলস বইয়ের নিয়মে?
টর্চের আলো তার দেহের ওপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ”ওমা!” বলে একটা ভয়—পাওয়া কণ্ঠস্বর অনুপমের মাথার কাছে থমকে পড়ল।
মুখ তুলে তীক্ষ্ন রশ্মির আঘাতে সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
”কে আপনি? এখানে কেন?” একটি ছেলের গলা। অনুপম ওঠার জন্য দু’ হাতে ভর দিয়ে দেহটা তুলতে গিয়ে পারল না।
”আমাকে একটু ধরে তুলে দেবে ভাই। আমার বাঁ পা—টা জখম হয়েছে, চলার ক্ষমতা নেই।”
”নিশ্চয়, নিশ্চয়।”
হাতের লাঠিটা আর টর্চ মাটিতে রেখে অনুপমকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল ছেলেটি। ”আমি বাড়ি থেকে বরং কাউকে ডেকে আনি। দু’জনের কাঁধে ভর না রাখলে আপনি চলতে পারবেন না। ততক্ষণ লাঠিটায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকুন।”
ছেলেটি দ্রুত ডেকে আনল একজনকে। দু’জনের কাঁধ ও গলা জড়িয়ে ধরে অনুপম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এল নিচু তক্তপোশ পাতা একটা ঘরে, যার বিবর্ণ দেয়ালে তেলরঙে আঁকা ধূলিমলিন অস্পষ্ট দুটি ছবি। ভারী কাঠের একটা টেবলে পড়ার বই ছড়ানো। ঘরের একমাত্র বালবটা কম পাওয়ারের।
অনুপমকে ওরা চেয়ারে বসাল। এতক্ষণে সে ভাল করে লক্ষ করল তার উদ্ধারকারীদের। মুখের মিল থেকে অনুমান করল বাবা ও ছেলে। কিন্তু ছেলেটির মুখ যেন তার চেনা চেনা মনে হল। কবে, কোথায় যেন সে দেখেছে! চোখ বুজে মাথাটা পেছনে হেলিয়ে সে মনে করার চেষ্টা করল।
ওরা অবাক হয়ে দেখছিল অনুপমকে। সারা মুখ মাটি আর ময়লা মাখা। জামা আর প্যান্টের সামনের দিকও তাই। প্যান্টের তলা ছেঁড়া। পায়ে রক্ত লেগে।
”পল্টন বোধহয় কামড়েছে। চন্দন তাড়াতাড়ি গরম জল করতে বল, তুলো আর ডেটল আন। মারকিউরোক্রোম দিলেই হবে। আর ওনার মুখ হাত ধোয়ার জন্য এক বালতি জলও আনিস।”
বয়স্ক লোকটি উবু হয়ে অনুপমের প্যান্টটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে তুলে পরীক্ষা করে অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ”বাড়ির পোষা কুকুর, কামড়ালেও ইঞ্জেকশন নেওয়ার দরকার হবে না। কিন্তু আপনি কে? বাগানে এখন এলেনই বা কীভাবে?”
