”ভেতরে ঢোক, ব্যাটাকে টেনে বের করি।”
অনুপম পুকুরধার দিয়ে, নারকেল গাছগুলো ঘেঁষে পায়ে—চলা সরু জমি ধরে এগোল। তার লক্ষ্য, যত তাড়াতাড়ি দূরে সরে যাওয়া। ওরা শুধু তো বাড়ির মধ্যেই খুঁজবে না, পুকুরের দিকেও আসবে। শুধু একটাই আশা, অন্ধকার হয়ে এসেছে। কিন্তু ওদের কারও সঙ্গে যদি টর্চ থাকে। এখানে ঘন ঝোপজঙ্গল নেই যে, সে আড়াল নেবে। তা ছাড়া দলবেঁধে ওরা খুঁজবে, লুকোনো কাউকে পেলে এক সেকেন্ডও খরচ করবে না পিটিয়ে মারতে।… রডটা চালিয়েছিল এক সেকেন্ডেই মনঃস্থির করে। কিংবা তখন মন বলে কিছু ছিলই না।
পাঁচিলের ধারে এসে অনুপম উচ্চতা অনুমান করে দু’ হাত তুলে লাফাল। পাঁচিলের মাথা দু’হাতের আঙুল দিয়ে আঁকড়ে ধরতেই ঝুরঝুর করে গুঁড়ো চুন—সুরকি এবং তারপর দুটো ইট নিয়ে সে জমিতে পড়েই হাঁটুর যন্ত্রণায় কাতরে উঠল।
রবিদার বাড়ির দোতলা থেকে অনেক লোকের গলা আসছে। ওরা ঘরে ঘরে খোঁজ চালাচ্ছে। ছাদেও নিশ্চয় যাবে। সেখান থেকে পুকুরের দিকে চোখ পড়বেই, আর কিছু লোক খুঁজতে আসবেই।
অনুপম আর একটু সরে গিয়ে পাঁচিলে কয়েকটা কিল মেরে বুঝতে চেষ্টা করল, কতটা মজবুত। তারপর আবার দু’হাত বাড়িয়ে লাফাল।
শক্তই। মনে হয় ইট খসে আসবে না। দু’হাতে চাড় দিয়ে বুক পর্যন্ত উঠে একটা পা পাঁচিলের ওপর রেখে বাকি শরীরটা তুলে নিয়ে পাঁচিলে রাখা। অনুপম চাড় দিয়ে উঠল।
খিড়কির দরজা খোলার শব্দ হল। সে ডান পা তুলল। পাঁচিলের ওপর রেখে বাকি শরীর তোলার জন্য পায়ের ওপর ভর দিতেই ইটটা খসে পড়ল আর সেই সঙ্গে ডান পা ঝুলে নেমে এল।
ইট পড়ার শব্দটা সন্ত্রস্ত করে দিল অনুপমকে। কিছু লোক বেরিয়ে পুকুরের ঘাটলার সিঁড়িতে। মুখ ফিরিয়ে সে কয়েকটা সাদা ধুতির নড়াচড়া দেখতে পেল।
”খিড়কিতে আলো নেই? বললেই হল! জ্বেলে দিতে বল।”
”শিগগির একটা টর্চ নিয়ে আয়। খোঁজ ব্যাটাকে।”
অনুপমের কনুই দুটো জ্বালা করছে। কিন্তু তাই নিয়ে উহু—হু করার সময় এটা নয়। এখন বাঁচা আর মরার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এই পাঁচিল। প্রতিটি সেকেন্ড এখন….। সে আবার লাফিয়ে পাঁচিল ধরল। ডান পা সবেগে পাঁচিলের মাথায় পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একই ঝোঁকে গোটা শরীরটাকে পাঁচিলের ওপর তুলে দিয়ে নিজেকে সে আধপাক গড়িয়ে দিল। আন্দাজ করে নিয়েছিল এদিকের মতো ওদিকেও জমি আট—ন’ ফুট নীচেই হবে।
শরীরে একটা পাক দিয়ে নীচে পড়ার সময় তার মনে একটা ভয়ই তখন ঝলসে গেল—ইট পাথর বা লোহার কোনও খোঁচা জমিতে পড়ে নেই তো! কিন্তু ভয়টা অমূলকই। আঘাত পাওয়ার মতো কিছু ওধারে ছিল না।
পাঁচিল ঘেঁষে দুই তালু আর হাঁটুর ওপর ভর রেখে অনুপম শক্ত জমিতে পড়ল এবং মুখ দিয়ে তার প্রথম কথাই বেরোল, ”হাঁটুটা গেল।”
যন্ত্রণায় সে ধীরে ধীরে কাত হয়ে গড়িয়ে পড়ল। বাঁ হাতের আঙুলগুলো হাঁটুর ওপর নিজের থেকেই এগিয়ে গেল সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে। দেড় বছর আগে ডা. চ্যাটার্জি বলেছিলেন, বাঁ পায়ের কার্টিলেজ অপারেশন করিয়ে নিতে, ‘আবার যদি চোট পাও, তা হলে কিন্তু খেলা ছাড়তে হবে।’ অপারেশনে তার ভীষণ ভয়। তখন সে রাজি হয়নি। এখন তার মনে হল, বোধ হয় এবার খেলা ছাড়তেই হবে।
চিত হয়ে সে শুয়ে রইল। পরিষ্কার আকাশ, কয়েকটা তারা দেখা যাচ্ছে। মাটির আর গাছপালার নিজস্ব মিষ্টি গন্ধ আছে। গাছে পাখির ডানা ঝাড়ার শব্দ। অনুপম উৎকর্ণ হল পাঁচিলের ওধারে গলার আওয়াজে। দূর থেকে ফেলা টর্চের রশ্মিটা পাঁচিলের ওপর দিয়ে একটা সাদা লাঠির মতো ঘোরাফেরা করল।
”আরে, সে কি আর এতক্ষণ বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে আছে, দ্যাখগে ভালমানষির মতো মুখ করে সন্তাোষের দোকানে বসে এখন চা খাচ্ছে।”
”দেখলে তুই চিনতে পারবি?”
”খুব পারব।”
কথাগুলো ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে এল। উঠে বসল অনুপম। কাদের বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে এসে পড়লাম? এরা কেমন লোক? সারথির সাপোর্টার কি? তাকে চিনতে পারলে কি রড দিয়ে পিটিয়ে মারবে? ছেলেধরার লোকগুলো এখন কত দূরে? এখানে কতক্ষণ বসে থাকা যায়? ঝোপজঙ্গলে, বিশেষ করে পাঁচিলের ধারে গর্তে সাপ থাকতে পারে। শীতের ঘুমে যতই আচ্ছন্ন হয়ে থাকুক, ওদের বিশ্বাস নেই।
সুপ্রিয় গুপ্তকেও সে বিশ্বাস করে না। খবর খুঁজে বের করতে না পারলে, বাড়িয়ে লেখায় সিদ্ধহস্ত। মান—অপমান বোধটাও কম, চক্ষুলজ্জারও বালাই নেই। লোকটা যে কী ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসাপরায়ণ, এখন সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
কাছেই একটা কুকুর ডেকে উঠল আর অনুপম ব্যস্ত হয়ে কোনওক্রমে উঠে এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল। তার আর একটি ভয় এখন কাছাকাছিই চার পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলে নিরাপদ হওয়া যাবে কি না, এই নিয়ে যখন সে দ্বিধার মধ্যে, তখন আরও কাছে কুকুরটার ডাক সে শুনতে পেল। আর ডাকের ভঙ্গিটা মোটেই বন্ধুজনোচিত নয়।
অন্ধকারে অপরিচিত লোক দেখলে তেড়ে এসে কামড়াতে পারে। ছুটে পালানোর ক্ষমতা এখন আর নেই। তা ছাড়া পালিয়ে সে যাবে কোথায়! ইট ছুড়ে মারলে বরং আরও চেঁচাবে, আরও তেড়ে আসবে। তা ছাড়া অন্ধকারে এখন কোথায় সে ইট—কাঠ খুঁজবে! অন্ধকার থেকে বেরোনোটাই এখন দরকার। চেহারা দেখলে কুকুরটা কামড়াবার আগে একটু ভেবে দেখবে, ও তো গণপ্রহারের কাজে নামেনি।
