কেউ খেয়াল করেনি ঘরের পরদা সরিয়ে বিষাদে আচ্ছন্ন, ফোলা ফোলা দুটি অশ্রুসজল চোখ নিয়ে বউদি দরজায় দাঁড়িয়ে। রবিদার দৃষ্টি হঠাৎ সেই দিকে পড়তেই সচেতন হয়ে নম্র স্বরে বলে উঠল, ”এই নিয়ে এখন তর্কাতর্কি এখানে না করলেই ভাল হয়। বাড়ির কারও এখন মন ভাল নেই।”
রবিদার কথা গ্রাহ্যে না এনে সুপ্রিয় সমানে গলা চড়িয়ে বলে চলল, ”আমরা লিখে—লিখে তোর পপুলারিটি, তোর ইমেজ ধরে রেখেছি অনুপম, তা যদি না করতাম তা হলে আজ তুই দেড় লাখ—দু’ লাখ এইরকম খেলে কামাতে পারতিস না। তুই একটা বেইমান, তাই কাগজকে দোষী করছিস। তোকে যে কোনও সময় ময়দান থেকে বিদেয় করে দিতে পারি, সেটা যেন মনে রাখিস।”
”তার আগে আমিই তোমায় এখান থেকে বিদেয় হতে অনুরোধ জানাচ্ছি, নইলে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে—” অনুপম দু’পা এগোল সুপ্রিয়র দিকে।
”অনু।” ধমক দিয়ে রবিদা দাঁড়িয়ে উঠল। অরবিন্দ ততক্ষণে সিঁড়ির মাঝামাঝি নেমে গেছে। সুপ্রিয় নামতে নামতে মুখ ঘুরিয়ে বিষাক্ত চোখে তাকিয়ে বলল, ”একটা ক্রিমিনালের মতো ফেরার থেকে ভেবেছিস বেঁচে যাবি। দেখি কেমন করে তুই বাঁচিস।”
সুপ্রিয় গুপ্ত নেমে গেল। একটু পরেই গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার শব্দ শোনা গেল। অনুপম তখন স্বগতোক্তি করল, ”আপদ বিদায় হল।”
এর পর বউদি আর পঞ্চি পাশের বাড়ি গেল বাচ্চচুকে দেখার জন্য। রবিদা নীচে নেমে এসে সদর দরজার বাইরের রকটায় বসল। কলকাতা থেকে সে ফিরেছে জানলে প্রদীপ হালদার সম্পর্কে খবর নিতে কেউ কেউ নিশ্চয় আসবে। বাড়ির বাইরেই তাদের সঙ্গে কথা বলা ভাল, তা হলে দোতলায় অনুপম নির্বিঘ্ন হতে পারবে।
.
বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যার এগিয়ে আসাটা অনুপম ঘরের পেছনের জানলা দিয়ে দেখছিল। কালকের থেকে ঠাণ্ডাটা কম, গরম জামা পরার মতো নয়। বাড়ির খিড়কি দরজা খুললেই ডোবার মতো একটা পুকুর। তাকে ঘিরে নারকেল গাছ। আরও কিছু গাছ রয়েছে যার মধ্যে পেয়ারা, আম আর বাতাবিলেবু গাছগুলোকে সে চিনল।
এই সবের পেছনে পুরনো, ভেঙেপড়া ইটের পাঁচিল—ঘেরা দোতলা বাড়ি, যেটা সে কাল দেখেছিল। ইটগুলো ক্ষয়ে যাওয়া, শ্যাওলায় কালো। জানলায় রং নেই, শিকও সবগুলোতে নেই। এইরকম এক সময়ের অবস্থাপন্ন কিন্তু এখন কোনওক্রমে দিন গুজরান করা পরিবার সে মফস্বলের বা গ্রামের যেখানেই গেছে, দেখেছে। বাড়িটার পেছনে ও পাশে বড় বড় গাছ আর আগাছার জঙ্গল।
ম্লান হয়ে আসা আলোয় ক্রমশ আবছা হয়ে আসছে পুকুরে ছায়া ফেলা গাছেরা। অনুপমেরা বুকের মধ্যে দম বন্ধ করা স্মৃতিগুলো জানলা দিয়ে খোলা প্রকৃতির মধ্যে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে। এই বাড়িতে আর কিছুক্ষণ থাকলে সে পাগল হয়ে যাবে কি না, এমন চিন্তাও তার মধ্যে এল।
সিঁড়িতে দ্রুত উঠে আসা পায়ের শব্দ আর উত্তেজিত চাপা গলায় রবিদার, ”অনু, অনু… কোথায় তুই” শুনে অনুপম বলল, ”এই যে, ঘরে।”
”সব্বোনাশ হয়েছে। এ বাড়িতে নাকি ছেলেধরা তাড়া খেয়ে ঢুকেছে। আর তাকে নাকি আমি লুকিয়ে রেখেছি ভাই পরিচয় দিয়ে!”
ঘরের দরজায় রবিদা ছায়ামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। এখন তাকে দেখেই অনুপমের গা শিরশির করল।
”সে কী, কে বলল?”
”ছুটতে ছুটতে এসে পাড়ার ছেলে দেবাশিস খবর দিল, গ্যাঁদালপাড়া বাঁশতলার লোকে খেপে উঠেছে। তারা দলবেঁধে আসতে পারে।”
”এসব রটাল কারা?”
”দেবাশিসকে একজন বলেছে, মোটরে করে যাচ্ছিল দুটো লোক, গাড়ি থামিয়ে তারা বলল, যে ছেলেধরাটাকে সবাই তাড়া করেও ধরতে পারেনি, সেই লোকটাকে চুপিচুপি রবি সরকারের বাড়িতে ওরা ঢুকতে দেখেছে। … তোর সেই রিপোর্টারের কাজ। কী শয়তান লোক! অনু কোনও রিসক নেওয়া নয়। তোকে খিড়কির দরজা দিয়ে—”
রবিদার কথা শেষ হওয়ার আগেই চিৎকার করতে করতে একটি ছেলে ওপরে উঠে এল, ”রবিকাকা, রবিকাকা ওরা এসে পড়ছে, অনেক লোক… আপনি শিগগির নীচে গিয়ে কথা বলে আটকান, নয়তো….”
ছেলেটি আসার মতোই বেগে নেমে গেল। রবিদা উদভ্রান্তের মতো এধার—ওধার তাকাচ্ছে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। অনুপমের সিক্সথ সেন্স বলল, এ বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকা নয়। জনতা মানেই বোধবুদ্ধিহীন, অন্ধ এক দানব। ঘটনা ঘটিয়ে তারপর ভাবতে বসে।
কোলাহলের মতো শব্দ ভেসে এল। অনুপম ধাক্কা দিয়ে রবিদাকে সিঁড়ির দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে যেতে বলল, ”খিড়কির দরজাটা কোথায় দ্যাখাও।”
একতলায় সিঁড়ির পাশে বাড়ির পেছনে যাওয়ার দরজা। সেখানে সিমেন্টের উঠোন, টিউবওয়েল, পাম্প, কলঘর ইত্যাদি এবং বাইরের পুকুরে যাওয়ার ছোট দরজা। অনুপম দরজা দিয়ে বেরিয়ে নিজেই টেনে বন্ধ করার আগে রবিদাকে বলল, ”বলবে, কেউ আসেনি… খিলটা দিয়ে দাও।”
কোলাহলটা এখন চিৎকার আর তর্জনগর্জন। কিছু কিছু কথা স্পষ্টই শোনা যাচ্ছে।
রবিদা বলছে, ”আস্তে আস্তে, কালকেই এই বাড়ির একজন মারা গেছে, বাড়ির মানুষ এখন শোকে দুঃখে…”
”রাখুন রাখুন, ওসব অনেক শোনা আছে।”
”বের করুন, নয়তো বাড়ি জ্বালিয়ে দেব।”
রবিদা বলছে, ”আমি এখানে এতদিনকার বাসিন্দা, আমি কেন এখানকার ছেলে চুরি করব! এখানে আমার ব্যবসা, দোকান … বাড়িতে এখন একটা লোকও নেই।”
”আরে মশাই পুরনো বাসিন্দে ফাসিন্দে বুঝি না। ব্যবসা—দোকান আছে বলে পয়সার গরম দেখাচ্ছেন? ছেলে ধরে বিদেশে পাচার করার, সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত বের করে নেওয়ার কারবারেও অনেক পয়সা। বড়লোকেরাই এসব করে।”
