”লোকটা হাত নেড়ে আমাকে নীচে ডাকল, যাব?” উত্তেজিত পঞ্চি তাকাল রবিদার দিকে।
”দরজা খুলে ওপরে নিয়ে এসো।” অনুপম শান্ত স্বরে নির্দেশ দিল।
”নিয়ে আয়।” রবিদা অনুমোদন করতেই মেয়েটি নীচে নেমে গেল।
”রবিদা, গত চব্বিশ ঘণ্টা আমাকে চব্বিশ হাজার বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে গেছে, জানি না আরও কত আমাকে দেবে।”
সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। ওরা তাকিয়ে রইল। প্রথমে সুপ্রিয়, তার পেছনে পঞ্চি, তারপর ব্যাগ কাঁধে বেঁটে, টাকমাথা, স্থূলকায় অরবিন্দ পাইন, হাতে ফ্লাশ লাগানো ক্যামেরা।
”কী রে, তুই রেডি হসনি?” ঈষৎ বিরক্ত ও ব্যস্ত স্বরে সুপ্রিয় সিঁড়ি থেকেই বলল।
হেসে অনুপম বলল, ”বসুন। সুপ্রিয়দা।”
আলোর ঝলসানিটা চোখকে সইয়ে সে অরবিন্দর ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে একটু বড় করে হেসে বলল, ”ভাল করে অনেকগুলো নিন অরবিন্দদা আর আমাকে কিন্তু গোটা দুই কপি দেবেন।”
অরবিন্দ কম কথা বলে। মাথা নেড়ে সে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে রবিদা ও পঞ্চিসমেত অনুপমের ছবি নেবে সেটাই ঠিক করায় মনোযোগী হয়ে পড়ল।
সুপ্রিয় চেয়ার টেনে বসে বলল, ”আপনিই রবিদা, নমস্কার, কী ঝামেলায় যে একটু আগে পড়ে গেছলাম।…. অনু। তোকে ক’ ঘণ্টা আগেই বলে গেলাম না, আমাদের ফেভারিট গেম এখন ডাকাত কি ছেলেধরা বলে লোককে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা, সেটাই ঘটতে যাচ্ছিল আমাদের প্রায় চোখের সামনে, এই এখানকার বাজারের কাছে। অশথ গাছটার নীচে একটা পাথর বসিয়ে যেখানে পুজোটুজো হয়, তার থেকে দু—তিনশো হাত আগে, বাসা—রাস্তাতেই!…. আমাদের উলটো দিক দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে সাইকেল চালিয়ে একটা ছোকরা মোটরের গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল আর তার ষাট—সত্তর গজ পেছনে তাড়া করে আসছিল তিরিশ—চল্লিশটা লোক। সাইকেলটাকে ধরতে পারেনি, বাঁ দিকে একটা রাস্তায় নেমে গেল। শুনলাম আর একজনকে ধরে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেছে। হয়তো এতক্ষণে লাশ ফেলে দিয়েছে।… নে, তাড়াতাড়ি চল, কিছু নেওয়ার তো নেই?”
সুপ্রিয় উঠে দাঁড়াল। অনুপম স্থির হয়ে বসে রইল। রবিদার ভ্রূ কুঁচকে উঠেছে। পঞ্চি ছেলেধরার গল্প শুনে রোমাঞ্চিত।
”আমি যাচ্ছি না সুপ্রিয়দা।”
”সে কী! অফিস থেকে ব্যবস্থা করে গাড়ি আনলাম, তোর থাকারও ব্যবস্থা করেছি, দেশে আর তোকে যেতে হবে না। আমাদের চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্টের দাদার খালি বাড়ি রয়েছে উলুবেড়েয়, গঙ্গার ওপর। চল, এখন না বেরোলে সন্ধে হয়ে যাবে পৌঁছতে।”
”যা বলার বলে দিয়েছি, যাচ্ছি না। নীচের ভদ্রলোক গতকাল হাসপাতালে মারা গেছেন। আমি তাঁর বাচ্চচা ছেলেটাকে কাল সকালে বেহালায় পৌঁছে দিয়ে আসব মায়ের কাছে। সেখানে ফোটোগ্রাফার নিয়ে আসুন, আমাদের ফেভারিট গেমের রিপোর্ট করার, ছবি তোলার প্রচুর সুযোগ তখন পাবেন।”
অনুপমের মুখভাব এবং কণ্ঠস্বর থেকে সুপ্রিয় জেনে গেল, সিদ্ধান্তটার নড়চড় হবে না। থমথমে হয়ে উঠল তার মুখ। একটা দুর্দান্ত স্টোরির টোপ ফেলে, সম্পাদককে রাজি করিয়ে সে গাড়িটা এনেছে। এখন সে খালি হাতে ফিরে গিয়ে বলবে কী?
”তা হলে তুই এটা আগে বললি না কেন? এত তেল পুড়িয়ে, সময় নষ্ট করে এভাবে হ্যারাসড হওয়ার কোনও দরকার ছিল না।”
”কে বলল দরকার ছিল না। এটাই তো তোমার স্টোরি। অনুপম বিশ্বাসটা যে কত পাজি, শুধু সারথি থেকে কেন, ভদ্রসমাজ থেকেই তাকে তাড়ানো যে কত মঙ্গলজনক কাজ হবে সেটা এবার তুমি কলম খুলে লিখতে পারবে। সুপ্রিয়দা, এতগুলো লোকের মৃত্যু, জখম, কেউ কেউ পঙ্গুও হতে পারে, এ সবের জন্য আমি একা দায়ী নই। যে সিস্টেমে, যে কাঠামোয়, যে পদ্ধতিতে আমাদের ফুটবল চলছে তাই থেকেই বেরিয়ে আসছে এই বিষ। অপরাধের বোঝা আমি একা কেন বইব, অনুশোচনা, অনুতাপ একা আমি কেন করব? সবাইকে বইতে হবে, করতে হবে, আপনাকেও এর ভাগ নিতে হবে। চারদিকে শুধু তো শুঁয়োপোকার ভিড়। মানুষ … বুদ্ধিমান, হৃদয়বান মানুষ কোথায়? কলকাতার ফুটবল চালাচ্ছে যারা, ক্লাব চালাচ্ছে যারা, সেখানে কাদের দাপট, কাদের প্রতিপত্তি? ধান্দাবাজ, আত্মমর্যাদাবোধহীন, পা—চাটা, চোর—জোচ্চেচার ক্লাসের বারিন দত্ত, দুলাল শীল, সুবোধ বোসদের হাতে ফুটবল গেলে এই অবস্থাই হয় ; আগুন জ্বলে, টেন্ট ভাঙে, মানুষ মরে। আর বলির পাঁঠা করার জন্য প্লেয়াররা তো আছেই। আর আছেন আপনারা।”
সুপ্রিয় উঠে সিঁড়ির দিকে এগোতেই অনুপম ঝটিতি হাত বাড়িয়ে ওর বাহু ধরে টান দিল। সুপ্রিয় টানের চোটে পিছিয়ে টেবিলে ধাক্কা খেল। অনুপমের দু’চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে, রগ দুটো দপদপাচ্ছে, ফুলে উঠেছে গলার দু’ধারের শিরা। মুঠো করা পুরো বাহুর পেশি স্ফীত।
সুপ্রিয় এবং অরবিন্দ কিছুটা ভয় পেয়ে রবিদার দিকে তাকাল। অনুপম কিছু যদি ঘটিয়ে ফেলে তা হলে এই লোকটি তাদের রক্ষাকর্তার ভূমিকায় যেন অবতীর্ণ হয়, এমন একটা প্রত্যাশা তাদের দৃষ্টিতে। কিন্তু রবিদার হাবভাবে এই ভূমিকা পালনের কোনও ইচ্ছা ফুটে উঠেছে বলে তাদের মনে হল না। বরং মনোযোগী শ্রোতার ভূমিকাটাই তাদের চোখে পড়ল।
”অনুপম গলাবাজি তো এখন খুব করছিস। কিন্তু গড়াপেটা ম্যাচে গোল দিয়ে ছোট ছোট টিমগুলোকে হারিয়ে বীরদর্পে যখন মাঠ থেকে বেরোস, ভক্তদের সাষ্টাঙ্গ প্রণামগুলো অবলীলায় যখন গ্রহণ করিস, তখন তোদের এই ন্যায়—নীতি বোধগুলো থাকে কোথায়? তোরা যদি ফুটবলটা খেলতে জানতিস, পরিশ্রম করে খেলাটা শিখতিস, তা হলে কি ম্যাচ গড়াপেটা করার দরকার হত?” সুপ্রিয় এবার কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মরিয়া হয়ে গলা চড়াল।
