দোতলায় উঠে এসে চেয়ারে বসে শরীর এলিয়ে দিয়ে রবিদা অস্ফুটে ”আহহ” বলে চোখ বন্ধ করল। অনেকক্ষণ পর চোখ খুলে অনুপমকে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল, ”বোস। রাতেই এসেছিস। কাল রাত থেকে ছোটাছুটি চলছে। বউমার বাপের বাড়ি বেহালায় গেলাম। অত রাতে বাড়ি খোঁজাও এক দুর্ভোগ, তারপর আবার এলাম এখানে, তোর বউদি আর বউমাকে নিয়ে যেতে। হাসপাতাল, ডাক্তাররা অবশ্য খুব হেলপ করেছে নইলে এত তাড়াতাড়ি বডি বের করতে পারতাম না। বউমার ভাইয়ের, কাকা, পাড়ার ছেলেরা রয়েছে, তারাই যা কিছু করার করছে। প্রদীপ হাসপাতালে যখন পৌঁছয় তখনও প্রাণ ছিল, ঘণ্টা দুই বেঁচে ছিল। আমাদের আর কিছু করার ছিল না তাই চলে এলাম।… তোর পায়ে নাকি বড় চোট পেয়েছিস?”
”নীচের উনি ফিরলেন না? ওঁর ছেলেটি তো এখানেই রয়েছে।” মাথা নিচু রেখেই অনুপম বলল।
”না, বউমাকে আর আসতে বললাম না। কী হবে এসে? বাপের বাড়িতেই নিয়ে গেল। বাচ্চচুকে কাল আমি পৌঁছিয়ে দিয়ে আসব।”
বউদি ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। পঞ্চি ঘুমভাঙা চোখে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
”একটু চা খাওয়াবি রে।” রবিদার শ্রান্ত গলা থেকে সজল করুণ একটা সুর যেন বেরিয়ে এল।
পঞ্চির ঘুমের ঘোর কাটেনি। সে সরাসরি জিজ্ঞেস করে ফেলল, ”নীচের দাদা এসেছে?”
রবিদাই শুধু নয়, অনুপমও প্রশ্নের আকস্মিকতায় অপ্রতিভ হয়ে গেল। সেটা কাটিয়ে উঠে রবিদা নরম স্বরে বলল, ”আনতে পারলাম না রে।”
উত্তরটা বোধগম্য না হওয়ায় পঞ্চি তাকাল অনুপমের দিকে। একটা ঝাঁঝালো রাগ তখন অনুপমের দু’চোখ দিয়ে মাথার মধ্যে ঢুকে গেল।
”মারা গেছে।” সে ঝলসানো শব্দ দুটো মুখ থেকে বের করে আনল কঠিন গলায়।
”অ্যাঁ, দাদা মরে গেছে!… দাদা মরে গেছে!… তা হলে বাচ্চচুর কী হবে, ও মেসোমশাই কার কাছে বাচ্চচু থাকবে…” বলতে বলতে পঞ্চি সারা বাড়ির অব্যক্ত শোককে মুখর করে ফুঁপিয়ে উঠল। কেউ তাকে কাঁদতে বারণ করল না।
রবিদার চোখের পাতা ধীরে ধীরে নেমে এল। অন্ধ দৃষ্টি আকাশের দিকে তুলে ফিসফিস করে শুধু বলল, ”টিকিটটা আমিই দিয়েছিলাম।”
অনুপম তখন দালানে আবদ্ধ ফোঁপানো বাতাসের উদ্দেশে মনে মনে বলল, ”পেনাল্টিটা আমিই মিস করেছি।”
কারও মুখ থেকে পঞ্চির জন্য একটিও সান্ত্বনা—বাক্য বেরোল না। কাঁদতে কাঁদতে সে ঘরে গিয়ে তার মাসিমার কাছে মনের কষ্ট, বেদনা জানাতে লাগল। কিন্তু সেখানেও কোনও জবাব না পেয়ে সে চোখ মুছতে মুছতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
”সন্তুকে বলেছি বাচ্চচুটাকে আজ তোদের কাছেই রাখ। ওরও একটা দু’ বছরের বাচ্চচা আছে, ভালই থাকবে।” রবিদা মন্থর ম্লান গলায় বলল।
”কাল ওকে কখন দিতে যাবে?” অনুপম চেয়ারে বসে, কিছু একটা বলে সজীবতা তৈরি করার জন্য কথা বলল। কালকের ঘটনা এবং তার জন্য কে বা কারা দায়ী, এই ধরনের কথাবার্তা থেকে দূরে থাকতে চায় সে।
”সকালেই যাব। ছ’টার সময় গাড়িটাকে আসতে বলেছি। আমাদের নিয়ে কাল রাত থেকে গাড়িটা খাটছে। সফিকুলের আজ সকালে কাকদ্বীপে যাওয়ার বুকিং ছিল, সেটা ক্যানসেল করে অ্যাডভান্স ফিরিয়ে দিয়েছে। একবার পেট্রল নিল দশ লিটার, দাম দিতে গেলাম, নিল না।… সফিকুলের বাড়ির অবস্থা কিন্তু মোটেই ভাল নয়, ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে পুরনো গাড়িটা কিনেছে।” রবিদা মুখ ফিরিয়ে অনুপমের মুখের দিকে তাকিয়ে অবশেষে বলল, ”ছেলেটা তোদেরই বয়সি।”
চোখ নামিয়ে নিল অনুপম। রবিদার এই শেষ কথাটা বলার উদ্দেশ্য কী। সফিকুল আমারই বয়সি তো কী হয়েছে? ও ভাল কাজ করে আর আমি খারাপ কাজ করি?
”তোর পায়ের অবস্থা এখন কেমন?”
”ভাল।”
সেই সময় পঞ্চি দু’জনের জন্য চা এনে ওদের হাতে দিল।
”ইতিমধ্যে কোনও অসুবিধে হয়েছি কি তোর? ডাক্তার দেখাবার মতো সিরিয়াস কিছু হয়ে থাকে…।”
বাইরে থেকে মোটরের হর্নের শব্দ ভেসে এল। কাউকে ডাকার মতো ছোট ছোট করে দু’বার বাজল। অনুপমের হাতের কাপটা একবার নড়ে উঠেই স্থির হয়ে গেল। সুপ্রিয় গুপ্ত গাড়ি নিয়ে এসেছে।
”রবিদা, কাল সকালে বাচ্চচুকে নিয়ে তোমার আর যাওয়ার দরকার নেই। আমি ওকে নিয়ে গিয়ে ওর মায়ের কাছে পৌঁছে দেব।” ধীর এবং দৃঢ় গলায় অনুপম কথাটা বলে পঞ্চির দিকে তাকাল। ”দ্যাখ তো, মোটর গাড়িটা এই বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে আছে কি না।”
”তুই ওকে নিয়ে যাবি!” বিশ্বাস করা রবিদার সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। ”তোর নিজের কথা তুই ভাব, এসব নিয়ে চিন্তা আমি করব।”
”আমি ভেবেচিন্তেই বলেছি।”
পঞ্চি ছুটে ফিরে এল। ”হ্যাঁ গো, দুপুরে যে লোকটা এসেছিল, সে আর ব্যাগ কাঁধে একটা লোক গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে।”
”দুপুরে কে এসেছিল?” রবিদার বিস্মিত প্রশ্ন।
”প্রভাতী সংবাদের রিপোর্টার সুপ্রিয় গুপ্ত।”
”জানল কী করে তুই এখানে…. উদ্দেশ্যটা কী?”
”উদ্দেশ্য নিজের স্বার্থ, নিউজের সন্ধানে আসা, আমি তো এখন বড় নিউজ। এত বড় ঘটনার পর উধাও…. সেই পলাতক ভিলেনকে তার গোপন ডেরায় খুঁজে বের করে তার ইন্টারভিউ নেওয়া…. ডিটেকটিভ গল্পের মতো গা—ছমছম করা একটা লেখার সুযোগ পেলে সুপ্রিয় গুপ্ত ছাড়বে কেন!”
আবার হর্নের শব্দ। এবার একটু বড় করে। পঞ্চি আবার ছুটে গেল বারান্দায়।
”যে আমাকে কাল এখানে পৌঁছে দিয়েছে সে—ই ওকে জানিয়েছে। সুপ্রিয় গুপ্ত আমাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাবে বলে গাড়ি এনেছে।” অনুপম চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে থেমে বলল, ”কিন্তু আমি যাব না। আমি যাব কাল, বাচ্চচুকে নিয়ে।”
