সে আবার এসে চেয়ারে বসল। কলকাতায় গিয়ে গাড়ি জোগাড় করে এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসা কি সম্ভব? গাড়িই বা পাবে কোত্থেকে, সুপ্রিয়র নিজের তো গাড়ি নেই!
তা হলে কি দুলোদার কাছ থেকে চেয়ে আনবে! অসম্ভব, ওই লোকটার কোনও দয়া সে নেবে না। যদি দুলোদার গাড়ি নিয়ে আসে তা হলে সে যেতে অস্বীকার করবে। গত বছর সে একদিন তাই করেছিল, তবে প্রবল ঘৃণায় নয়, প্রচণ্ড রাগে।
.
সারথি কোচ বদল করে নতুন কাউকে আনবে এটা গত বছর সিজনের আগেই কমিটি ঠিক করে। একটার পর একটা টুর্নামেন্ট হেরে, লিগ চ্যাম্পিয়নশিপে চতুর্থ হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত অবধারিতই ছিল। টিম নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর জন্য বাড়তি বাজেটও বরাদ্দ হয়।
তা ছাড়া রোভার্স কাপের সেমি ফাইনালে লিডার্স ক্লাবের কাছে ৩—০ হারের পর অনুপমের যে ইন্টারভিউটা প্রভাতী সংবাদে বেরোয়, সেটা নিয়েও কমিটিতে কথা হয়। তাতে অনুপম বলেছিল, ‘সারথি এখন ভরে গেছে অযোগ্যদের ভিড়ে। কেউই কন্ডিশনে ছিল না, দুজন ভাইটাল প্লেয়ার ইনজুরির কথা চেপে গিয়ে খেলতে গিয়েছিল। টিমকে তারাই ডুবিয়েছে, আর আমার বিরুদ্ধে এখন তারাই বলে বেড়াচ্ছে সিনসিয়ার ছিলাম না।’
ক্লাবে তো বটেই, বাইরেও সমর্থকদের মধ্যে এই ইন্টারভিউটা নিয়ে তোলপাড় হয়। টিমের মধ্যেও প্রবল অসন্তাোষ দেখা দেয়। অনুপম কোণঠাসা হয়ে গিয়েছিল। দুলোদার গাড়িতে সেদিন একটা বউভাতের নিমন্ত্রণে যাচ্ছিল। দুলোদা তখনই তাকে বলেছিল, ”তোর জন্য টিম স্পিরিট সাফার করছে। কেন তুই সুপ্রিয়কে ইন্টারভিউ দিতে গেলি। মুখ বন্ধ করে থাকতে পারিস না? ক্লাব সম্পর্কে তুই সিনসিয়ার ঠিকই, কিন্তু নিজের প্রতি তুই ইনসিনসিয়ার। তোর খেলা দেখে বোঝা যায় এখন আর তুই খাটিস না, প্র্যাকটিসে মন নেই।”
অনুপম প্রতিবাদ করে বলেছিল, ”এইসব রদ্দি লোকের সঙ্গে খেলে খেলে আমি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছি।”
”আগে তুই একাই খেলা দিয়ে এদের ঘাটতি পুষিয়ে দিতিস, টিমকে টেনে নিয়ে যেতিস। কিন্তু এখন আর তা পারছিস না। ভাল প্লেয়ার কলকাতায় আর কোথায়, উঠে আসছে কই? এইসব রদ্দি লোক দিয়েই কাজ চালাতে হবে। তুই এদের মধ্যে মিসফিট, এখন তোকেই মাঠে ফালতু বলে মনে হয়। তোর খেলা এরা বোঝে না, তোকে একটা বল দিতে পারে না, তোর কাছ থেকে নিতেও পারে না।”
”অল্পবয়সি কিছু ভাল ছেলেকে এবার আনুন, আমি তৈরি করে নেব। আমি কোচ করব। এই হেমন্ত সেনকে দিয়ে আর চলে না।”
”অ্যাঁ, তুই কোচ করবি!” দুলোদা এমন মুখভাব করল যেন সারথির জার্সি পরে রোসি বা জিকোকে মাঠে নামতে দেখছে। ”হ্যাঁ, কোচ এবার বদলাবার কথা উঠেছে। যে টিমে ট্যালেন্ট নেই সেই টিমকে অন্যভাবে কোচ করে খেলাতে হয়। ছেষট্টির ইংল্যান্ডের ববি মুর, ববি চার্লটন আর ব্যাঙ্কস ছাড়া ছিলটা কী, অথচ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ান হল! স্কিল, ইমাজিনেশন, ফ্লেয়ার এ সবের ঘাটতি এনডিওরেন্স আর স্ট্যামিনা দিয়ে পোষাতে হয়। অবিরাম বলের পেছনে তাড়া করে গেলেও সেটা ফল দেয়।”
”তাকে কি তুমি ফুটবল খেলা বলবে?”
”আমার দরকার ম্যাচ জেতা, ট্রফি আনা। যদি হামা দিয়ে খেলে ম্যাচ জেতা যায়, তা হলে আমি হামাই দেব। আর্টিস্টিক, অ্যাটাকিং ফুটবল খেলব, যখন অমন করে খেলার মতো ট্যালেন্ট পাব। ছক কেটে অঙ্কের মতো করে এবার সারথি খেলবে। নতুন কোচ ভাবা হচ্ছে সুজিত ঘোষকে। প্রস্তাবটা আমারই।”
অনুপম চিৎকার করে বলে উঠেছিল, ”সুজিত ঘোষকে তুমি আনছ…তুমি? গাড়ি থামাও।”
অবাক হয়ে দুলালচাঁদ ব্রেক কষে। গাড়ি থেকে নেমে অনুপম বলেছিল, ”সুজিত ঘোষকে যে লোক সারথিতে আনতে চায় তার গাড়িতে আমি চড়ব না।”
আগের বছর কলম্বোয় এশিয়ান চ্যাম্পিয়ানশিপের জোনাল প্রতিযোগিতায় ভারতের কোচ সুজিত ঘোষ দুটো খেলায় থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অনুপমকে নামায়নি।
দুলালচাঁদের গাড়িতে তাকে প্রাণ বাঁচাতে তেঁতুলতলায় আসতে হল। কিন্তু এখান থেকে যেতেও হবে কি ওর গাড়িতে?
.
মোটরের ইঞ্জিনের আওয়াজ যেন শুনতে পাচ্ছে। অনুপম চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
হ্যাঁ, গাড়িরই। সে বারান্দায় গিয়ে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করল। একটা কালো পুরনো অ্যাম্বাসাডারের বনেটের একধার, হেডলাইট আর সামনের দরজাটা দেখেই সে পিছিয়ে এল। দুলোদার গাড়ি এটা নয়। সুপ্রিয় তা হলে অন্য কারও গাড়ি এনেছে।
পঞ্চিকে ঘুম থেকে তুলে বলে যাবে কি না, অনুপম ভাবল। দরকার নেই। যেমন আচমকা এসেছি তেমনভাবেই চলে যাচ্ছি। কেউ কিছু মনে করবে না। সিঁড়ি দিয়ে নেমে সে প্রদীপ হালদারের বন্ধ দরজাটার সামনে থমকাল। তালা ঝুলছে। ঘুরে সদরের দিকে এগোতে গিয়ে সে আর পা বাড়াতে পারল না।
গাড়ি থেকে নেমে রবিদা আর বউদি এগিয়ে আসছে। যুবক আর একজন, এই বোধ হয় সন্তু, পাশের বাড়ির দিকে চলে যাচ্ছে। কোলপসিবল লোহার ফাঁক দিয়ে ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে সে শুভ না অশুভ, সেই খবরটা জানার চেষ্টা করল। ঝুঁকে পড়া, বিধ্বস্ত, ক্লান্ত শরীর, উদ্বেগে ঝলসানো রাতজাগা চোখ, রুক্ষ চুল, পায়ে যেন লোহার জুতো পরা।
ধীর পায়ে এগিয়ে অনুপমই গেট খুলে দিল। ওরা দু’জন স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে। রবিদা নিশ্চয়ই শুনেছে সে কাল রাত এখানে এসেছে—তাই কোনও বিস্ময় ফুটল না। অনুপমের চোখে বিহ্বলতা দেখে রবিদা শান্ত স্বরে বলল, ”শ্মশান থেকে আসছি, ওপরে আয়।”
