”সুপ্রিয়দা প্লিজ, এখন এই আলোচনা বন্ধ করুন। আমার পায়ে এখন সেঁক দিতে হবে, বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে।”
”কী ভাবে লাগল! কোথায়, দেখি?” সুপ্রিয় ঝুঁকে হাত বাড়াল অনুপমের পায়ের দিকে।
”থাক, থাক, তোমাকে আর পরীক্ষা করতে হবে না, এটা ফলস নয়। সত্যি ইনজুরি।”
নীচে কোলাপসিবল গেটের চাকা সরার শব্দ হল। ”রবিদা” বলে হাঁক দিয়ে কেউ উপরে উঠে আসছে। অনুপম ছিলে—ছেঁড়া ধনুকের মতো উঠে দাঁড়িয়েই পাশের ঘরের পরদা সরিয়ে ঢুকে গেল। আর তখনই দুটো লোক দোতলায় উঠে এল।
”রবিদা ফিরেছে নাকি রে?”
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসা পঞ্চিকে লক্ষ্য করে একজন বলল।
”মেসোমশাই, মাসিমা কেউ ফেরেনি, বউদিও না।”
”তুই একা বাড়িতে।” বলেই লোকটি সুপ্রিয়র দিকে তাকিয়ে বলল, ”আপনি?’
”আমার নাম সুপ্রিয় গুপ্ত, প্রভাতী সংবাদ থেকে আসছি। রবিবাবুর কাছে দু—একটা খবর নেব।”
লোক দুটির ভ্রূ কুঁচকে মুখ থমথমে হয়ে গেল। ওদের একজন, বেঁটে, গাঁট্টাগোট্টা, বছর পঁয়ত্রিশ বয়স, পরনে লুঙ্গি ও খদ্দরের পাঞ্জাবি, গম্ভীর স্বরে বলল, ”আপনিই সেই সুপ্রিয় গুপ্ত, যিনি সারথির মন্দ ছাড়া ভাল দিকটা দেখতেই পান না, সারথির গায়ে কাদা না মাখালে যার ভাত হজম হয় না, সারথির ভেতরের কেচ্ছা তারিয়ে তারিয়ে লেখেন।”
সুপ্রিয় সরল হাসিতে মুখ ভরিয়ে শুধু তাকিয়ে রইল। এই রকম লোকের সম্মুখীন জীবনে সে বহুবার হয়েছে। সে জানে তর্ক করা বৃথা, চুপ করে মেনে নেওয়াই এখন বুদ্ধিমানের কাজ।
”রবিদাকে জিজ্ঞেস করে আবার কী খবর নেবেন? উনি তো খেলেন না, খেলে ওঁর ভাই অনুপম। তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন।”
অন্যজন, আরও কমবয়সি, কর্কশ স্বরে প্রায় ধমক দিয়ে তার মেজাজের অবস্থাটা জানিয়ে রাখল।
”তাকে তো পাচ্ছি না বলেই রবিবাবুর কাছে এলাম। শুনেছি এককালে উনি অনুপমদের গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন, ওকে বাল্যকাল থেকে দেখেছেন, ওর সম্পর্কে জানেনও অনেক কিছু।” সুপ্রিয়র কোমল বিনীত কণ্ঠ আবহাওয়াকে আর তপ্ত হতে দিল না।
”এখন অনুপমকে নিয়ে লেখার এটাই কি সময়? আপনার আক্কেলকে বলিহারি! ক্লাবটাকে ডুবিয়ে আজ পথে বসাল যে—”
”অনুপমের প্রশংসা করব বলে তো এখানে আসিনি। সারথি সত্যিই ডুবেছে। এবার তাকে টেনে তুলতে হলে বোঝা কমাতে হবে। সবচেয়ে বড় বোঝা এখন অনুপম আর তার মতো প্লেয়াররা, ঠিক কি না?”
”আলবাত। আগে ওটাকে তাড়ানো দরকার।”
”আপনারাই তো লিখে লিখে একটা পাঁঠাকে সিংহ বানিয়েছেন। মশাই এখন পেলে ওকে বলি দিয়ে কোর্মা বানিয়ে খেতুম।”
সুপ্রিয় মুখে স্মিত হাসি লাগিয়েই রেখেছিল, শুধু ওদের কথা শুনতে শুনতে সেটাকে ছোট বড় করে নিচ্ছিল। নিজের দিক থেকে আক্রোশটা অনুপমের দিকে ঘুরে গেছে বুঝে সে মাতব্বরি ঢঙে বলল, ”ক্লাবটা তো এক দিনে ডোবেনি, তেমনই তুলে ভাসানোটাও একদিনে সম্ভব নয়। লিগে যতটা করা যায় তা আমি করব কিন্তু মেম্বাররা, হিতৈষীরা যদি এগিয়ে না আসেন তা হলে হাজার লিখেও কিসসু করা যাবে না। আপনারাই পারেন সারথিকে বাঁচাতে। এগিয়ে আসুন, প্রেসার দিন কমিটি মেম্বারদের, নানান জায়গায় মিটিং করুন।”
”তাই করতে হবে এবার।” বেঁটে লোকটা ঘড়ি দেখল। ”রবিদারা এখনও যখন আসেনি, তার মানে সিরিয়াস কিছু হয়েছে। আপনি আর কতক্ষণ বসে থাকবেন?”
”দূর থেকে আসছি, দেখি আরও কিছুক্ষণ।”
লোক দুটি নীচে নামার পর গেট বন্ধ করার শব্দ পর্যন্ত অপেক্ষা করে সুপ্রিয় ডাকল, ”বেরিয়ে আয়।”
অনুপমের মুখ এই কয়েক মিনিটেই বসে গিয়ে চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। প্রবল তৃষ্ণার্তের মতো চাহনি। দরজার পরদা ধরে সে নিজেকে খাড়া রেখেছে।
”এখানে আর তোর থাকা উচিত নয়। নীচের লোকটার যদি যদি খারাপ কিছু হয় তা হলে তুই খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ে যাবি।”
”কিন্তু এখন আমি যাব কোথায়? কীভাবেই বা এখান থেকে বেরোব?”
সুপ্রিয় মাথা নামিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে বলল, ”দুটো থেকে আড়াইটের, না সাড়ে তিনটের সময় আমি গাড়ি নিয়ে আসব। আসা মাত্র উঠে পড়বি।”
”কোথায় যাব?”
”তুই বল কোথায় যাবি, পৌঁছে দেব।”
”কলকাতায় যাব না…. দেশের বাড়িতে যাব।”
”সেই ভাল।”
সুপ্রিয় গুপ্ত কোনও বিদায় না জানিয়ে দ্রুত নেমে গেল। অনুপম সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবল, ওর সঙ্গে যাওয়াটা কি উচিত হবে? লোকটা কোনও বজ্জাতি করবে না তো! নানান ধরনের বিপদের কথা তার মনে আনাগোনা করতে লাগল। তারপর ভাবল, যা থাকে কপালে! দেখাই যাক না কী হয়! এইভাবে নিজেকে নিজে কয়েদ করে কত দিন চলা যায়!
পঞ্চি এসে দাঁড়াল। ”গরম জল আর বরফ দোব?’
সারা বাড়ির কর্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়ে ওর কর্মতৎপরতা বেড়ে গেছে।
”না থাক। আমার জ্বরটা কম লাগছে, খিদেও পাচ্ছে। ভাত খাব। কাল বউদি বলল, তোমার হাতের রান্না নাকি খুব ভাল।”
খুশিতে আনন্দে পঞ্চির মুখ থেকে কথা সরল না। অনুপম গত চব্বিশ ঘণ্টায় এই প্রথম হৃদয়ের গভীরে একটা শান্ত সুখ অনুভব করল মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে।
আড়াইটে থেকেই অনুপম উৎকর্ণ হয়ে দালানে বসে অপেক্ষা করছে। পঞ্চি ঘরের মধ্যে মেঝেয় ঘুমোচ্ছে। ঘড়িতে দেখল তিনটে বেজে পাঁচ। উঠে গিয়ে সন্তর্পণে মুখটা জানলার কাছে নিয়ে তাকাল। একটা কাঁঠাল গাছ দৃষ্টির অনেকটা আড়াল করে থাকলেও রাস্তার কিছু অংশ দেখতে পেল। জনপ্রাণী নেই।
