”তুমি কী উদ্দেশ্যে এমন সময়ে এখানে এসেছ? এই সব কথা বলার জন্য?”
”মনে পড়ে, কাল কী বলেছি তোকে? তোর উত্থান দেখেছি, পতনটাও খুব কাছ থেকে দেখতে চাই। বড় তাড়াতাড়ি তুই পড়ে গেলি। হাবিবকে দেখেছিস? হায়দরাবাদ থেকে তোর মতো বয়সেই কলকাতায় এসে কত বছর ধরে খেলে কত নাম কত টাকা করে গেল। বাঙালি ছেলেরা কোথায় দুর্বল, কোথায় পিছলে যায়, আমি সেটাই জানতে চাই বলে সাবজেক্ট হিসেবে তোকে বেছে নিয়েছি। তোকে নিয়ে লিখব।”
অনুপম পাংশু মুখে উঠে দাঁড়াল। সুপ্রিয় জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে হাত নেড়ে বসতে ইঙ্গিত করল।
”যাচ্ছিস কোথায়? বারান্দায় কি জানলায় এখন যাসনি। এই বাড়ি খুঁজে বের করতে বাস থেকে নেমে অনেক লোককে জিজ্ঞেস করেছি। রবিদা নামটা আর চার বছর আগে তার বাড়িতে এসেছিলি, এইটুকু ইনফরমেশন শুধু সম্বল। তোর নাম করে আমি যা গালাগাল শুনলাম সেটা কাল সারথির টেন্টের সামনেও শুনেছি। এখানকার লোক যদি একবার জানতে পারে—”
অনুপম চেয়ারে বসে পড়ল। নীচের দরজাটা পঞ্চি বন্ধ করেছে কি না, সুপ্রিয়র সামনে তা জিজ্ঞেস করলে ভয় পেয়ে গেছে ভাবতে পারে। সে তাচ্ছিল্যভরে বলল, ”জানলে কী আর হবে, দল বেঁধে এসে মারবে?…. পিটিয়ে মেরে ফেলবে?”
”এখন তো দল বেঁধে পিটিয়ে মারাই হয়। এ—রাজ্যে এটাই তো এখন টপমোস্ট ফেবারিট গেম। কাগজে দেখিস না, ডাকাত সন্দেহে, ছেলেধরা সন্দেহে গেরস্থ ভালমানুষরাও পাঁচজনে মিলে খুন করছে প্রকাশ্যে আর গণপ্রহার বলে খুন করার দায় থেকে হাত ঝেড়ে ফেলছে। দশ—বারোটা লোক যে—কোনও ছুতোয় তোকে দিনদুপুরে বড় রাস্তায় হাজার লোকের সামনে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে, একজনও বাধা দেবে না। আজকের কাগজগুলো পড়েছিস?”
টেবিলে পড়ে থাকা প্রভাতী সংবাদটার দিকে সুপ্রিয় তাকাল। হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে ভাঁজ খুলে প্রথম পাতায় চোখ রেখে বলল, ”প্রত্যেকটা কাগজে লিখেছে তুই আজ এত বাজে না খেললে, টাই ব্রেকারের পেনাল্টিটা মিস না করলে এত কিছু ঘটত না। এগারোটা লোক মারা গেছে—”
”এগারো! আটটা নয়?”
”মাঠেই আট, হাসপাতালে আরও তিন। মরার মতো অবস্থায় চারজন, সিরিয়াস আহত, মানে হাসপাতালে অ্যাডমিটেড সাতাশজন, তার মধ্যে তোর চাকরটাও রয়েছে। লুটপাট, আগুন, রেড রোড আর ধর্মতলায় মোটর গাড়ির কাচভাঙা, এসব তো আছেই। এসব ঘটনায় তোর রিঅ্যাকশান জানতে কাল তোকে গোরু—খোঁজা খুঁজেছি। সহদেব মালি বলল, তোকে গাড়িতে করে নিয়ে গেছে দুলাল শীল।”
”তা হলে দুলোদা তোমায় বলল আমি এখানে!”
”সুপ্রিয়র মুখে কুটিল একটা ফিকে হাসি খেলে গেল। সে হ্যাঁ বা না, কিছুই বলল না।
”দুলোদা বলে দিল?” অনুপম নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না। ক্লাবে তার সবচেয়ে বড় হিতৈষী বলে যাকে সে জানে, অভিভাবকের মতো যার কথা শুনে চলে, যাকে কমিটিতে আনার জন্য সে ক্লাব পলিটিক্সে মাথা গলিয়ে শত্রু বাড়িয়েছে, শেষকালে সেই লোকই কিনা তাকে বিপদে ঠেলে দিল তার হদিস বলে দিয়ে!
সে কি চিৎকার করে উঠবে? সে কি চোখের জল মুক্ত করে দেবে? সে কি কলকাতায় ছুটে গিয়ে দুলালচাঁদের গলা টিপে ধরবে? অনুপম ডান হাতের তালুতে চোখ ঢাকল।
”ওর গাড়িতে তোর পকেট থেকে ঘড়িটা পড়ে গেছল, পাঠিয়ে দিয়েছে। নে ধর।”
অনুপম হাত বাড়াল না। সুপ্রিয় ঘড়িটা টেবিলে রাখল।
”জীবনে অনেক কিছু তোর শেখার বাকি।”
”কিন্তু কেন?”
”আমার যতদূর মনে হয়, যা ঘটে গেল এর পর সারথি তোকে আর রাখবে না। এখন ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো তোকে ফেলে দেবে। কাল তোকে নামিয়ে দিয়ে দুলাল শীল সোজা গেছল বারিন দত্তর বাড়ি। দু’জনে হাতে হাত মিলিয়েছে। ওদেরও তো বাঁচতে হবে। শুধু তোকে আগলে, বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে তো দুলাল নিজের আখের খোয়াতে পারে না। তোকে দিয়ে যতটা পাওয়ার তা পাওয়া হয়ে গেছে, এখন তুই একটা বোঝা।”
”এসব কি তুমি লিখবে?”
”না। এরা হচ্ছে আমার খবর পাওয়ার সূত্র, আমার ওপর এদের আস্থাটা নষ্ট করব কেন? আমাকে বিশ্বাস করে বারিন দত্ত গত বছরই বলেছিল লিগে ক’টা ম্যাচ সারথি কিনেছে, কিন্তু আমি লিখিনি। তুই কি জানিস, কে. এস. টি—র সঙ্গে সেমিফাইনাল ম্যাচটাও কেনা ছিল?”
অনুপম চুপ করে তাকিয়ে রইল। সে জানে। দুলোদা আগের দিনই তাকে জানিয়ে দিয়েছিল। শোনা মাত্র বুকের মধ্যে একটা বরফের চাঁই নেমে এসেছিল। সোজাসুজি খেলে ম্যাচ জেতবার ক্ষমতা আর তার নেই। অথচ সবার চোখে সে বড় ফুটবলার হয়ে রয়েছে। চোখ দুটো জ্বালা করে উঠেছিল। অপমানে, না হীনতাবোধে, সে ঠিক বুঝতে পারেনি।
”অনুপম, সারথি তোকে ছেড়ে দিলে যাবি কোথায়?”
সুপ্রিয়র ডটপেন অপেক্ষা করছে উত্তরের জন্য। অনুপম এমন একটা প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিল না। আরও দুটো সিজন পরে সে এটা নিয়ে হয়তো ভাবত। এখনও তার যা খেলা রয়েছে তাতে কলকাতার মাঠে তার দাম পড়বে না।
”অন্য ক্লাব তোকে নেবে কি না জানি না, নিলেও পঞ্চাশ—ষাট হাজারের বেশি দেবে না।”
”এসব নিয়ে আমি এখন কিছু ভাবতে রাজি নই।”
”হ্যাঁ, এখন তো প্রাণ বাঁচানোটাই সবার আগে। এখানে কত দিন লুকিয়ে থাকবি?”
”জানি না। রবিদা আসুক, নীচের এক ভদ্রলোক কাল রাতে ফেরেননি—”
”জানি, এখানকার একজনের মুখেই শুনলাম। কাল খেলা দেখতে গিয়ে আর ফেরেনি। এখানে ধারণা, গোলমালের মধ্যে পড়ে লোকটা হয় মারা গেছে নয়তো গেছে হাসপাতালে। তোকেই এজন্য দায়ী করছে। আর কী আশ্চর্য, শেষকালে তুইই কিনা এই বাড়িতে!”
