স্বয়ং শিব এসে তার সামনে দাঁড়ালে অনুপম এত অবাক হত না। কী ভাবে জানল সুপ্রিয়! একমাত্র দুলোদা ছাড়া আর কেউ জানে না সে কোথায় এসে উঠেছে। তেঁতুলতলার একটা রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে গেছে, রবিদার বাড়িটাও দুলোদা জানে না। তা হলে আর কার কাছ থেকে জানল? কখনও কারও কাছে সে তো রবিদা বা তেঁতুলতলার নাম পর্যন্ত উচ্চচারণ করেনি।
”কী ভাবছিস। কেমন করে খোঁজটা পেলুম?” সুপ্রিয় খালি জলের গ্লাস পঞ্চির হাতে দিয়ে বলল, ”আর এক গ্লাস।”
অনুপম মাথাটা নাড়ল।
”ওসব জেনে তোর আর এখন কী লাভ হবে। এখানে পালিয়ে এসে ভালই করেছিস, কাল তোর ফ্ল্যাটে বিরাট ভাঙচুর হয়েছে। জিনিসপত্তর ভেঙে ছড়িয়ে লণ্ডভণ্ড করে, তোর চাকরটাকে পিটিয়ে আধমরা করে দিয়েছে। এখন সে হাসপাতালে। তোকে যদি পেত ওরা—।”
”ওরা কে?”
এবার সুপ্রিয়র অবাক হওয়ার পালা। সে পিটপিট করে অনুপমকে কয়েক সেকেন্ড নিরীক্ষণ করে বলল, ”সেই তারাই, যাদের সম্পর্কে বলেছিলাম—গোল দিয়ে ট্রফি নিতে না পারলে তোকে ছিঁড়ে খাবে।”
”তুমি এখানে কী করতে এসেছ?” কথাটা সুপ্রিয়কে বলে অনুপম কৌতূহল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চির দিকে তাকাল।
”আপনার গরম জল আর বরফ—”
”থাক, লাগবে না এখন, তুমি যাও।”
সুপ্রিয় গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর হয়ে উঠল। অনুপম তার মুখের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি কাটাতে চুলের মধ্যে আঙুল ঢোকাল।
”তোর আজকের এই অবস্থায় পৌঁছোনোটা একদিনে হয়নি। ধাপেধাপে হয়েছে। তুই ভাল খেলে নাম করেছিস, তোকে নিয়ে এ—ক্লাব ও—ক্লাব টানাটানি করেছে, তোর দরও লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে, চল্লিশ হাজার থেকে আজ দু’ লাখে…. কিন্তু তুই দারুণ ভাবে বদলে গেলি।”
”তোমরাই আমাকে বদলে দিয়েছ।”
”কী ভাবে?”
”আমার সম্পর্কে এমন ভাবে লিখতে শুরু করলে যেন ভারতে আমার মতো ফুটবলার আগে কখনও জন্মায়নি। ‘ভারতের জিকো’ ‘কলকাতার প্লাতিনি’ এসব তোমাদেরই দেওয়া টাইটেল। আমি স্বীকার করছি—” অনুপম থেমে গেল সুপ্রিয়কে পকেট থেকে নোটবই বের করতে দেখে।
”বলে যা।”
”স্বীকার করছি এসব বিশেষণ আমার ভাল লেগেছিল। চারদিকে তখন ভক্ত, যেখানে যাই সবাই আমার দিকে তাকায়, কথা বলতে চায়, বিশেষ ভাবে খাতির দেখায়। এসব আমার ভাল লাগত। সুপ্রিয়দা, এইসঙ্গে আমার বয়সটার কথাও মনে রাখবেন, তা ছাড়া লেখাপড়াও তো বিশেষ করিনি, স্কুল ফাইনালটা কলকাতায় এসে পাশ করেছি, কিন্তু কী ভাবে করেছি সেটা না বলাই ভাল। পড়তে আমার একদমই ভাল লাগে না, খবরের কাগজ, ম্যাগাজিনের হেডিং আর ছবি দেখে রেখে দিই… হ্যাঁ, সিনেমার খবর পড়ি।”
অনুপম কথাগুলো টানা বলে গেল যেন মহলা দেওয়াই ছিল। বলতে তার ভাল লাগল। সুপ্রিয়র ডটপেন নোটবইয়ে দ্রুত সরছে। মুখ ঘুরিয়ে অনুপম বারান্দা দিয়ে বাইরে তাকাল। অটো রিকশা চলে যাওয়ার আর দূর থেকে বাসের হর্নের শব্দ ছাড়া শ্রবণকে আঘাত করার মতো আর কিছু এখানে নেই।
”আমাকে প্রভাবিত করেছিল আপনাদের স্তাবকতা। আপনারা প্রভাবিত করেছিলেন ফুটবলপাগল মানুষদের। তাদের কাছে আমাকে রাজপুত্র বানিয়ে ঠেলে দিয়েছিলেন, রূপকথার রাজপুত্র। মানুষ তো রূপকথা ভালবাসে, তাই তারা আমাকে লুফে নিয়েছিল। তারা আপনাদের কাগজ কেনে আমার সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে, আমার কথা শুনতে, আমাকে তারা বীর হিসেবে দেখতে চায় আর আপনারা তাই দেখাবার জন্য লিখতেন।…
”কেন? আপনাদের কাগজের বিক্রি বাড়াবার জন্য। আমি নিজের ফাঁদে নিজেই পড়ে গেলাম,…. নিজেকে ফাঁপিয়ে বড় করে দেখার ফাঁদ। আমার সম্পর্কে প্রশংসা করে, গুণ গেয়ে যা নই তার থেকেও বড় করে দেখিয়ে প্রচুর মিথ্যে কথা যখন লিখেছেন তখন আমি তার প্রতিবাদ করিনি, চুপচাপ সেসব মেনে নিয়েছি কেননা মিথ্যে কথাগুলো, ভানগুলো আমাকে তৃপ্তি দিয়েছে।”
”কিন্তু অনেকে তোর বিরুদ্ধে লিখেছে, কড়া কথা বলেছে।”
”হ্যাঁ। লিখেছে, বলেছে আর তাতে আমি বিরক্ত হয়েছি, রেগেও গেছি। আমার মেজাজ, ব্যবহার সব সময় স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে না—,” অনুপমের চোখে ভেসে উঠল, অবাক দুটি সরল চোখের ওপরে লেগে একটা পাকানো হ্যান্ডবিলের ছিটকে যাওয়ার ছবিটা।
”কেন থাকে না তা আমি জানি না, সত্যি বলছি সুপ্রিয়দা, তা আমি জানি না। সতেরো বছর বয়সে গ্রাম থেকে কলকাতায় এসেছিলাম খেলতে। অমানুষিক পরিশ্রম করে, উপেক্ষা, অবজ্ঞা, অপমান ঠেলে ওপরে উঠেছি।”
”তখন অনেকেই তোকে সাহায্য করেছিল কিন্তু পরে তুই তাদের ভুলে গেছিস।”
অনুপম চুপ করে রইল।
”তোর দেশের বাড়িতে একবার গেছলাম। দেখেছি তোরা কত গরিব ছিলিস, তোর বাবা—মা কত কষ্ট করতেন, আজও করেন। তুই ওঁদের নিয়ে এসে কলকাতায় নিজের কাছে রাখতে পারতিস, কিন্তু তা করিসনি। শেষ বয়সে তা হলে ওঁরা একটু সুখের মুখ দেখতেন।”
”আমি আনতে চেয়েছিলাম সুপ্রিয়দা, কিন্তু বাড়ি ছেড়ে ওঁরা আসতে রাজি হননি।”
”মিথ্যে কথা বলিসনি, অনুপম, তুই আনতে চাসনি। মাসে মাসে টাকা পাঠিয়েছিস ঠিকই, কিন্তু নিজের অতীতকে তুই এড়িয়ে যেতে চেয়েছিস। আধুনিক, দ্রুতগতির জীবন তোর ভাল লেগে গেছল। সেখানে গ্রামের মানুষরা মিসফিট, বেমানান। তাদের মানসিক ধারা থেকে তুই নিজেকে ছিঁড়ে বের করে নিয়ে যেতে গিয়েই তুই, আমার মনে হয়, বিপত্তি ঘটিয়েছিস। তোর কী মনে হয়?”
