”এসব ছোটখাটো কম্পিটিশনে দেয় না।”
”তোকে বলেছে! কোনি যদি ফ্রক পরে নামতো দেখতিস, অন্তত বিশ—পঁচিশ পেয়ে যেত। প্যান্ট শার্ট পরলে তো ওকে ছেলে দেখায়।”
”ঘোড়ার ডিম দিত, এখানকার লোকেরাই কঞ্জুস।”
”না রে, ঠিকই বলেছে ভাদুটা, আমাকে প্যান্ট পরলে ছেলেদের মতই তো দেখায়। এই দ্যাখ তো চণ্ডু, প্রাইজ—ফ্রাইজ কি দেবে, পুরো একদিন বাড়ির বাইরে, মা মেরে ফেলবে যদি কিছু হাতে করে না নিয়ে যাই।”
লাউডস্পীকারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাগুলি শেষ হয়েছে। সভাপতি বিষ্টু ধর বক্তৃতা দিতে শুরু করেছে।
ক্ষিতীশ হাত পাঁচেক দূরে দাঁড়িয়ে কোনিদের কথাবার্তা শুনছিল। এবার সে এগিয়ে এসে বলল, ”তুমি সাঁতার শিখবে?”
মুখটা তুলল সে। কাঁচা—পাকা কদমছাঁট চুলে ভরা মাথা আর পুরু লেনসের পিছনে জ্বলজ্বলে দুটি চোখের দিকে একটু বিরক্তভরেই তাকাল। তারপর আবার সে নিজের পা টিপতে লাগল।
”শিখবে সাঁতার?”
”সাঁতার আমি জানি।”
”না, জান না।”
ঝটকা দিয়ে চুল ঝাঁকিয়ে কোনি আবার মুখ তুলল।
”আপনি জানেন?”
”হ্যাঁ জানি। আমি দেখেছি তোমায় গঙ্গায়। ও সাঁতার চলবে না। সাঁতার শেখার জিনিস।”
”যা জানি তাতেই গঙ্গা এপার ওপার করতে পারি, শেখার আবার আছে কি?”
”অনেক কিছু শেখার আছে।”
”আমার দরকার নেই, শিখে, যা জানি তাই যথেষ্ট।”
ক্ষিতীশের উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করে কোনি দাঁড়াল। চেঁচিয়ে ডাকল, ‘অ্যাই গোপলা শুনে যা।”
টেবলে স্তূপীকৃত নানাবিধ প্রাইজগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা খালি পা, ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে বছর বারোর একটি ছেলে এগিয়ে এল।
”হ্যা রে, মা কিছু বলেছে?”
”যাও না বাড়িতে, পিটিয়ে তোমার চামড়া তুলে নেবে।”
”দাদা?”
”দাদা আজ কাজে যায়নি, জ্বর হয়েছে। মা’র সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে তোমাকে নিয়ে। দাদা বলেছে, বেশ করেছে কোনি।”
ক্ষিতীশ ভাবল, আর একবার কোনির সঙ্গে কথা বলবে। কিন্তু ততক্ষণে কোনিকে ডেকে নিয়ে গেছে নেতাজী বালক সঙ্ঘের কর্মকর্তারা। প্রতিযোগীদের হাতে একটি করে খাবারের ঠোঙা দেওয়া হচ্ছে।
”এই যে শরীর, একে চাকর বানাতে হবে।”
ক্ষিতীশ ফিরে তাকাল বক্তৃতাকারীর দিকে। মাইক্রোফোনের পিছনে একটি ধুতি পাঞ্জাবি পরা চর্বির ঢিপি। ক্ষিতীশ ভীড় কেটে চাতালের দিকে এগোল।
”কি করে তা সম্ভব? আপনার লক্ষ লক্ষ টাকা আছে কিন্তু পারেন কি আপনি আর্চ করতে, পীকক হতে? যদি কেউ আপনাকে চাঁটি মেরে পালায়, পারবেন কি তাকে দৌড়ে গিয়ে ধরতে? না, পারবেন না, আমি জানি আপনি পারবেন না।”
সভাপতির পিছন থেকে কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ”একবার পরীক্ষা করে দেখব নাকি?”
বিষ্টু ধর পিছন দিকে তাকাল। ক্ষিতীশকে দেখে ভ্রূ কোঁচকাল। মাইকে হাত চাপা দিয়ে চাপা গলায় বলল, ”সব জায়গায় ইয়ারকি করবেন না।” তারপর হাত সরিয়ে বলতে শুরু করল, ”কেন পারবেন না, জানেন কি কারণটা? কারণ, আপনার শরীর ফিট নয়। আর ফিটনেস আসে নিয়মিত ব্যায়াম থেকে।”
বিষ্টু ধর পিছন ফিরে তাকাল। ক্ষিতীশ মাথা হেলিয়ে তারিফ জানাল।
”ব্যায়াম সেইজন্যই সকলের করা দরকার। হাঁটাও একটা ব্যায়াম। তাই নেতাজী বালক সঙ্ঘের তরুণ কর্মীদের, যারা দিনরাত পরিশ্রম করে আজকের এই প্রতিযোগিতাকে সফল করে তুলেছে, তাদের বললাম তোমরা হাঁটার ব্যবস্থা করো, আমি আছি, তোমাদের সাথী। এটা সমাজসেবার কাজ, আমি থাকব তোমাদের পাশে পাশে।”
”উহুঁ, আগে আগে। নেতৃত্ব দিতে হলে সামনে থাকতে হয়।”
বিষ্টু ধর পিছনে তাকিয়ে ভ্রূ কোঁচকাল। তারপর মাথা হেলাল, ”পাশে পাশেই বা বলি কেন, আমি থাকব আগে আগে। সমাজের কল্যাণের জন্য মানুষকে সুস্থ সবল করার জন্য যখনই সংগঠন গড়ে উঠবে, সবার আগে আমাকে ছুটে আসতেই হবে।”
”ছোটার কথা চেপে যান।” পিছন থেকে ফিসফিস শোনা গেল, ”যদি কেউ বলে একটু ছুটে দেখান!”
বিষ্টু ধর ঢোঁক গিলে বলল, ”কিন্তু ছুটেই বা আসব কেন! মানুষ ছোটে কখন? যখন সে ভয় পায়, দিশাহারা হয়। কিন্তু জনগণ সহায় থাকলে আমি ভয় পাব কেন? জনগণই পথ বলে দেবে, সুতরাং দিশাহারা হবো কেন? না, আপনাদের আশীর্বাদ থাকলে আমি ভয় পাব না। সঠিক পথেই আপনাদের সেবা, দেশের ও দশের সেবা করে যেতে পারব। তাই আজ প্রতিযোগীদের এই কথা বলেই বক্তব্য শেষ করব, শরীরকে ফিট না করলে পরিশ্রম করতে পারবে না। পরিশ্রম না করলে দেশ গড়ে তুলতে পারবে না। তাই আজ যে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে তোমরা হাঁটা শুরু করলে…”
বিষ্টু ধর পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাতড়াতে লাগল। ”এই যে হাঁটা, এ হাঁটা জীবনের পথে…”
বিষ্টু ধর অসহায়ভাবে পিছনে তাকাল।
”ভুলে গেছেন?”
ঘাড় নেড়ে অসহায়ভাবে বিষ্টু ধর ফিসফিস করে বলল, ”রবি ঠাকুরের একটা পদ্য লিখে এনেছিলুম, পাচ্ছি না।”
”বলুন এই যে যাত্রা শুরু হল ছোট্ট এই পার্কে—”
মাইক্রোফোনে গমগম করে উঠল সভাপতির আবেগভরা কণ্ঠ, ”এই যে যাত্রা শুরু হল, ছোট্ট পার্কে—
”ধীরে ধীরে তা বৃহত্তর জীবনের দিকে, সুখ—সমৃদ্ধিভরা জীবনের দিকে তোমাদের নিয়ে যাক। এই পার্ক পরিক্রমা রূপান্তরিত হোক বিশ্ব পরিক্রমায়, জয় হিন্দ।”
বিষ্টু ধর হুবহু বলে গেল ক্ষিতীশের প্রম্পট শুনে। শুধু জয় হিন্দের পর গলা কাঁপিয়ে যোগ করল, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”
পুরস্কার দেওয়া হল; প্লাস্টিকের কিট ব্যাগ আর তোয়ালে পেল যারা ২০ ঘণ্টা সম্পূর্ণ করেছে। ১৬ ঘণ্টার পরে যারা অবসর নিয়েছে তাদের শুধুই ব্যাগ আর ১২ ঘণ্টার পরে যারা তাদের শুধুই তোয়ালে। কোনি পুরস্কার নিয়ে ব্যাগটা উল্টেপাল্টে দেখল। সভাপতিকে নমস্কার জানানোর দরকারও মনে করল না। খাবারের ঠোঙাটা ব্যাগের মধ্যে ভরে সে ভাইয়ের হাতে দিয়ে বলল, ”চ বাড়ি যাই, এটা মাকে দিতে হবে।”
