.
না, ডোবাবে না।
অনুপম টেবিলে রাখা রেকাবে পোড়া পাউরুটি আর পেঁয়াজ—লঙ্কা—ডিমের একটা ঘণ্টার দিকে তাকিয়ে আপন মনে মাথা নাড়ল। বারো হাজার টাকা এবার সে যথার্থ একটা ভাল কাজে লাগাবে। একটা প্রাণ….একটা পরিবার যদি তাতে রক্ষা পায়।
”আপনি খাচ্ছেন না যে?” পঞ্চি ভয়ে ভয়ে রেকাবের দিকে তাকিয়ে কুণ্ঠিত স্বরে বলল।
”হ্যাঁ, খাচ্ছি।” একটা টোস্ট তুলে অনুপম কামড় দিল। ”খুব ভাল হয়েছে।”
উজ্জ্বল হয়ে উঠল পঞ্চির মুখ। ”মেসোমশাই বলে, শক্ত ঝামার মতো টোসের সঙ্গে মামলেট খেতে খুব ভাল লাগে।”
অনুপম সায় দিয়ে কী একটা বলতে যাচ্ছিল তখন নীচের থেকে কেউ পঞ্চির নাম ধরে ডাকল। চেয়ার থেকে স্প্রিংয়ের মতো উঠে দাঁড়িয়েই অনুপম টলে পড়ে যাচ্ছিল। বাঁ পা তার ভার নিতে পারছে না।
”কে?” পঞ্চি ছুটে বারান্দায় গিয়ে ঝুঁকে নীচে তাকাল। কাকে যেন অপেক্ষা করতে বলেই ফিরে এসে সিঁড়ির দিকে এগোল।
”শোনো।” অনুপমের ভীত তীক্ষ্ন স্বরে পঞ্চি থমকে অবাক হয়ে তাকাল। ”কে এসেছে?”
”পাশের বাড়ির ছেলে তিলু। বাচ্চচুর গরম জামা, দুধের কৌটো, খাওয়ার ওষুধ নিতে এসেছে।”
”ও কি ওপরে আসবে?”
”না। সব তো নীচের ঘরে রয়েছে।”
”তিলুকে দিয়ে সদর দরজা বন্ধ করে দেবে।”
পঞ্চি নেমে যাওয়ার পর অনুপমের খাওয়ার ইচ্ছাটা মরে গেল। রাতের ভয় দিনের আলোয় যেন আরও বেশি করে তাকে পেয়ে বসেছে। খবরের কাগজটা একই ভাবে পড়ে আছে। হাত বাড়িয়েও সে টেনে নিল।
ভাঁজ—করা প্রথম পাতায় একটা চার কলাম ছবির খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। পাঁজাকোলা করে একটা লোককে একজন নিয়ে যাচ্ছে। মাথাটা আর বাঁ হাতটা ঝুলছে। চোখ বন্ধ। পেছনে আবছা ভিড়। তবু বোঝা যাচ্ছে একটা ছেলে ইট ছুড়ছে। হেলমেট পরা পুলিশ একটা লাঠি উঁচিয়ে ছুটে যাচ্ছে। আকাশের দিকে পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া।
ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল অনুপম। এসব তারই সৃষ্টি। যে লোকটাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে কি মৃত? ইট, লাঠি, আগুন বের করে আনল একটা খেলা! দোষটা কি খেলারই, না কি যারা খেলে আর খেলায়, তারাই আসল অপরাধী?
”আপনি খাবেন না?” পঞ্চি উঠে এসেছে।
”না। জ্বর জ্বর লাগছে। পায়ের ব্যথাটা যেন আরও বেড়েছে। তুমি আমাকে এক ডেকচি জল গরম করে দাও আর ফ্রিজ থেকে বরফ দাও।…. আর শোনো।” অনুপম ইতস্তত করে বলল, ”কেউ এলে যেন বোলো না আমি এখানে আছি। সদর গেট সব সময় বন্ধ করে রাখবে।”
”মাসিমাও তাই বলে গেছে। জানেন আমাদের এখানে ছেলেধরা বেরিয়েছে! হ্যাঁ সত্যি! আমাদের গাঁদালপাড়ায়, যেখানে আমাদের বাড়ি, পরশু সেখানে অবনীকাকার ছেলে পল্টুকে, ছ’ বছর বয়স, একটা লোক ডেকে, ফুল নেবে বলে একটা লাল ফুল দিল। পল্টু ফুলটা শুঁকেই অজ্ঞান হয়ে যায়, তখন ওখান দিয়ে পল্টুর জেঠি যাচ্ছিলেন, তিনি ওকে শুয়ে থাকতে দেখে চেঁচিয়ে ওঠেন। তখন লোকটা একটা সাইকেলে চড়ে পোঁ পোঁ করে আমাদের এইদিক দিয়ে পালায়। আচ্ছা, ওরা নাকি বাচ্চচাদের ধরে নিয়ে গিয়ে রক্ত চুষে খায়, সত্যি?”
”সত্যি।”
”তা হলে তো বাচ্চচুকে সাবধানে চোখে চোখে রাখতে হবে!” পঞ্চি দায়িত্বের ভারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।
”সেই জন্যই তো বলছি সদর মোটেই খোলা রাখবে না। নীচে কেউ নেই, চোর টোর ঢুকেও চুরি করতে পারে। তা ছাড়া আমি এখন তো খোঁড়া, ছেলেধরা এলে কিছুই করতে পারব না।”
এত কথা বলার পর অনুপমের মনে হল পঞ্চির মনে কৌতূহল জাগাবার মতো কোনও কথা কি সে বলে ফেলেছে? বোলো না আমি এখানে আছি’টা একটা সন্দেহ জাগাবার মতোই কথা। এর অর্থ, লুকিয়ে রয়েছে। তবে রক্ষে, মেয়েটা মোটেই চালাক—চতুর নয়। ওকে একটু খুশি রাখা দরকার।
অনুপম পোড়া টোস্টের ওপর চামচ দিয়ে ডিম তুলতে তুলতে বলল, ”খেয়েই ফেলি, এত সুন্দর লাগল না। তুমি গরম জল আর বরফ এনে দাও।”
নীচে থেকে আবার তিলুর গলা পাওয়া গেল। পঞ্চি নেমে গেল। অনুপম চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজল। সার দিয়ে মুখগুলো ভেসে আসছে—রবিদা, বউদি—মণি, বাচ্চচু—সেই ছেলেটা, চার বছর আগে অটোগ্রাফ নিতে আসা ছেলেটা, রোগাটে লম্বা মুখ, পাতাকাটা চুল কপালে ঝুলে, ঘন চোখের মণি দুটো বড় বড় চোখ জুড়ে—অবাক, সরল আর আহত চাউনি। দলাপাকানো হ্যান্ডবিলটা ঠিক কপালে—অনুপম সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বজ্রাহত হল। তারপর চোখ দুটি বিস্ফারিত হয়ে দু’ হাত ঠকঠকিয়ে কেঁপে উঠল।
”দেখুন না, এই লোকটা আমার কথা শুনল না, ওপরে উঠে এল। আমি পইপই বললুম বাড়িতে এখন কেউ নেই।”
পঞ্চির অনুযোগ, কৈফিয়ত কিছুই ঢুকল না অনুপমের কানে। সে তার সামনে সাক্ষাৎ নিয়তিকে যেন দেখতে পাচ্ছে। কিছু একটা বলার চেষ্টা করল কিন্তু গলা দিয়ে স্পষ্ট কোনও কথা বেরোল না।
”খুব অবাক হয়ে গেছিস তাই না?” পানের ছোপধরা দাঁতগুলো বেরিয়ে এল। সুপ্রিয় গুপ্ত হাসছে।
”তুমি এখানে! জানলে কী করে?”
রেকাবির দিকে তাকিয়ে সুপ্রিয় প্রশ্নটা অগ্রাহ্য করে বলল, ”খাচ্ছিলি?”
”না, খিদে নেই। জ্বর জ্বর লাগছে।”
”তা হলে আমি খেয়ে নিচ্ছি। খুকি এক গ্লাস জল দাও তো।”
সুপ্রিয় চেয়ারে বসে ঠাণ্ডা টোস্ট আর ওমলেট মুখের মধ্যে গুঁজে চিবোতে চিবোতে আবার চোখ বুঝল।
”খুব ভোরে বেরিয়েছি, কিচ্ছু খাওয়া হয়নি, দাঁত পর্যন্ত মাজা হয়নি।”
