”ওই হল। প্ল্যাটিনাম জুবিলি ট্রফিটা গোল দিয়ে জিতে নে, দেখবি সব ধারণা উলটে গেছে। আবার তোকে মাথায় তুলে সাপোর্টাররা নাচবে। কবে কী বলেছিস কেউ মনে রাখবে না।”
”সুপ্রিয়দা, ট্রফি নেব, গোলও দেব আর তোমার কলমটাও সেদিন ভেঙে দু’ টুকরো করব।”
তখন ওদের ঘিরে জড়ো হয়ে গিয়েছিল অনুপম—ভক্তরা। তারা সুপ্রিয়কে গালি দিয়ে বিদ্রূপ করতে থাকে। সুপ্রিয় নেমে আসার সময় দু—চারজন পেছন থেকে তাকে চড়চাপড় মেরেছিল। কেউ একজন ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলেও দেয়। অনুপমই টেনে তোলে। তখন সুপ্রিয় মুখে হাসি নিয়ে বলেছিল, ”গোল দিয়ে ট্রফি নিতে না পারলে এরাই কিন্তু তোকে ছিঁড়ে খাবে।”
পরদিনের প্রভাতী সংবাদে শিরোনাম হয়েছিল : ‘অনুপমের দম্ভ : গোল দেব, ট্রোফি নেব।’ খবরের মধ্যে সাংবাদিকের জামা ধরা ও ছেঁড়া মারধোরের কথা ছিল। শেষদিকে লেখা হয়—”গত বছরের বকেয়া বারো হাজার টাকা না পেলে অনুপম আর পায়ে বল ছোঁবে না।” এই কথা প্রভাতী সংবাদে প্রকাশিত হওয়ায় ফুটবল কমিটির সদস্য বারিন দত্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘ক্লাবের আর্থিক সঙ্কট চলছে। এই সময় টাকার জন্য এই ভাবে চাপ দেওয়া ক্লাবের কোনও হিতাকাঙ্ক্ষীর পক্ষে সম্ভব নয়। অনেকেরই টাকা বাকি আছে কিন্তু তারা কেউ পায়ে বল ঠেকাবে না বলেনি। অনুপম বড় খেলোয়াড়। সে জানে তাকে ছাড়া টিম করা যাবে না। ওকে বলেছি প্ল্যাটিনাম ট্রফি সেমিফাইনালে উঠলেই যতটা সম্ভব ওর টাকা মিটিয়ে দেব।’—এ ব্যাপারে অনুপমের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করেও তাকে রাতে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।”
খবরটা সারথির সাপোর্টারদের মধ্যে অনুপম—বিরোধী একটা বিষাক্ত মনোভাব তৈরি করে দেয়। কিন্তু প্ল্যাটিনাম ট্রফি জেতার আশায় তারা বুক বেঁধে থাকে। কিন্তু দুলোদা অনুপমকে বলেছিল, ”বাড়াবাড়ি করলি। গোল দেব, ট্রফি নেব, এতটা বলা তোর উচিত হয়নি। ফুটবলে কেউ আগে থাকতে জিতবেই, বলতে পারে না।”
”আরে রাখো তোমার ওসব কথা। অনুপম বিশ্বাস যদি খেলব মনে করে তা হলে ইন্ডিয়ায় এমন কোনও টিম নেই যে, তাকে আটকাতে পারে।”
দুলোদা অবিশ্বাসভরে তো বটেই, বিরক্তিমাখানো চোখে তাকিয়ে বলেছিল, ”এতটা অহঙ্কার কিন্তু ভাল নয়। এই ট্রফিটা আমাদের চাই—ই, না হলে ক্ষমতা থেকে আমরা ছিটকে যাব। বারিন দত্ত গ্রুপ ড্যাংডাঙিয়ে ভোট তুলে নেবে। মনে রাখিস ইলেকশান আসছে।”
”তুমি নিশ্চিন্ত থাকো দুলোদা, ভোটে তোমরা জিতছ। ট্রফি পেলেই হাওয়া ঘুরে যাবে। কিন্তু একটা কথা, বাকি টাকা না পেলে আমি কিন্তু মাঠে নামব না।”
বারিন দত্ত আর সুবোধ বোস টাকা নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন তার ফ্ল্যাটে এসেছিল। আধঘণ্টা থেকে চলে যাওয়ার সময় সুবোধ বলে, ”কাউকে আর টাকা দিচ্ছি না, শুধু তোকেই দিলাম। পুলকেশ, রঞ্জন, অপূর্ব ওদেরও বাকি আছে, চেয়েওছে। বলেছি, কাউকেই দিচ্ছি না, টুর্নামেন্ট থেকে না পেলে দিতেও পারব না। জোট করে বলেছিল খেলব না, কিন্তু শেষমেশ রাজি হয়েছে। অনু তোকে যে এই বারো হাজার দিলাম এটা যেন ওরা জানতে না পারে। এটা যদি লিক হয়ে যায় তা হলে কিন্তু ওরা প্রচণ্ড ঝামেলায় ফেলে দেবে। তুই শুধু বলবি সেমিফাইনালে উঠলে বারিনদা কিছু টাকা দেবে বলেছে তাই খেলছি। মনে থাকবে?”
অনুপমকে কিছু বলতে হয়নি। প্রথম খেলা ছিল আই. টি. আই—এর সঙ্গে। সরল আর রঞ্জনের দেওয়া গোলে ম্যাচ জেতার রিপোর্টের সঙ্গেই আলাদা একটা খবরে বলা হল, ”বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেল, অনুপম বিশ্বাস আজকের ম্যাচ খেলতে সকাল দশটা পর্যন্তও রাজি ছিল না। কয়েকজন কর্মকর্তা তাকে হাতেপায়ে ধরেও রাজি করাতে পারেননি। অবশেষে তার ফ্ল্যাটে গিয়ে একজন বারো হাজার টাকা পৌঁছে দেওয়ায় সে মাঠে আসে।”
খবরটায় যেন আগুনে ঘি পড়েছিল। সমর্থকদের মধ্যে তো বটেই, টিমের অন্যরাও রাগে ফেটে বলেছিল, ”তা হলে অনুপমই খেলুক। শুধু একজনই টাকা পাবে আর বাকিরা সব ফালতু, তা হলে ফালতুর মতোই এবার আমরা খেলব।”
সেই খেলাটা তারা ফাইনালে উঠে ডেম্পোর সঙ্গে খেলল।
কিন্তু তার আগে দুলোদাই হুঁশিয়ারি করে অনুপমকে বলেছিল, ”তোকে শেষ করে দেওয়ার মারাত্মক চাল বারিন চেলেছে রে। কাউকে জানাতে মানা করে টাকা দেওয়ার খবরটা সুপ্রিয়কে দিয়ে কাগজে বের করল। শুধু মেম্বার—সাপোর্টাররাই নয়, প্লেয়াররাও তোর ওপর খেপে রইল।”
”কিন্তু দুলোদা, আমি তো অন্য কারও নয়, শুধু নিজের পাওনাটা নিয়েছি, কারও বাড়া ভাতে তো ছাই দিইনি।” অনুপম অসহায়ভাবে নিজেকে বাঁচাতে চেয়ে বলেছিল।
”এ—কথা আমাকে বলে কোনও লাভ নেই। সুপ্রিয়কে বললে আরও খারাপ হবে, দেখবি পরের দিন উলটো কথা কাগজে বেরিয়েছে। তার থেকে বরং চুপচাপ থাক আর খেলে যা। গাবিয়ে কথা বলাটাই তোর সর্বনাশ করছে। এখন ট্রফি যদি না আসে তা হলে বারিনরা বলবে, বারো হাজার টাকা তো দিলাম, অনুপম কী করল? টিমের মধ্যে ঝগড়া তৈরি করা ছাড়া ওর অবদানটা কী? বারিনরা ভাল করেই জানে, তোকে টাকা দেওয়ার খবর ফাঁস হলে কয়েকজন মাঠে নেমেও খেলবে না। তাতে সারথি হারবে, আর তার ফলে আমরাও কমিটি থেকে আউট হয়ে যাব, সেটাই ওদের লক্ষ্য। টাকাটা এখন নিয়ে ভুল করলি অনু…. এই বারো হাজার তোকে ডোবাবে।”
