বিছানায় উঠে বসে মশারি তুলে পা দুটো মেঝেয় নামাল। কিন্তু দু’ কদম গিয়েই সে বন্ধ দরজার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। নিথর হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দরজা খুলল। বাঁ হাটু কংক্রিটের মতো জমাট আর ভারী লাগছে। সারা বাড়িতে কোনও সাড়াশব্দ নেই। বউদি, পঞ্চি, এরা সব গেল কোথায়? ছমছমে একটা চিন্তা নিয়ে সে কলঘরে ঢুকল।
মশারিটা পাকিয়ে বিছানার একধারে রাখা। চাদরটা পরিপাটি করে বিছানো। ইতিমধ্যে পঞ্চি এইসব কাজ সেরে রেখে গেছে। অনুপম পা টেনে টেনে দালানে এল।
কেউ নেই, তবে রান্নাঘরের দিক থেকে বাসনের শব্দ ভেসে এল। নিচু গলায় সে ডাকল, ”বউদি।”
”যাই।” পঞ্চির গলা।
ব্যস্ত হয়ে এল পঞ্চি, হাতে একটা ন্যাতা। ”মাসিমা বলে গেছে উঠলেই আপনাকে খেতে দিতে। আগে চা খাবেন?”
”হ্যাঁ, কিন্তু বউদি কোথায়, আর সব?”
”সবাই তো ভোরবেলায় চলে গেছে। মেসোমশাই মাঝরাতে কলকাতা থেকে এল। তারপর মাসিমাকে আলাদা ঘরে নিয়ে গিয়ে কী সব বলল। মাসিমা নীচে গেল। তারপর নীচের বউদিকে নিয়ে তিন জন কলকাতা চলে গেল। যাওয়ার আগে বাচ্চচুকে পাশের বাড়িতে রেখে আমাকে বলে গেল, দাদা হাসপাতালে, অবস্থা ভাল নয় তাই মণিকে নিয়ে যাচ্ছি। ঠাকুরপো রইল, কাল থেকে না খেয়ে রয়েছে, ভাল করে দেখিস, উঠলেই খেতে দিস। আমি বললুম, সে তোমায় ভাবতে হবে না। রান্নাবান্না, জলখাবার করা সব আমি পারি। আপনাকে মামলেট করে দোব, টোস দিয়ে খাবেন?”
পঞ্চির কথা শুনতে শুনতে অনুপমের মনে হল নতুন কিছুই সে শুনছে না। রাতে ঘুমের মধ্যেই সে এসব জেনে গেছে।
দালানে খাবারের টেবিল আর চারটে চেয়ার। অনুপম একটা চেয়ারে বসল। টেবিলে আজকের খবরের কাগজ ভাঁজ করা অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে। কেউ হাত দেয়নি। বারান্দায় যাওয়ার দরজা দিয়ে দূরে নারকেল গাছের মাথা আর আকাশ দেখা যাচ্ছে। সেদিকে শূন্য দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইল।
একবার কাগজটার দিকে তাকাল। দেখেই বুঝতে পারল, ”প্রভাতী সংবাদ”। কালকের ঘটনার কথা কী ভাবে লিখেছে জানার জন্য তার এখন আর কোনও কৌতূহল হচ্ছে না। সুপ্রিয় গুপ্ত এই রকম একটা সুযোগই খুঁজছিল, পেয়ে গেছে। সত্যি—মিথ্যে যা খুশি লিখে দেবে তার বিরুদ্ধে। কে প্রতিবাদ করবে? লোকে তো এখন তাকে শয়তান রূপেই দেখতে চায়।
কিন্তু সে সত্যিই কি শয়তান? প্রদীপ হালদারের যদি কিছু হয়ে যায়, তা হলে ওর বউ—ছেলে কি পথে বসবে? এর মধ্যে তার শয়তানিটা কোথায়! প্লেন ক্র্যাশ করে, ট্রেন অ্যাকসিডেন্ট হয়ে তো এর থেকেও বেশি লোক মরে, সেটা কি পাইলটের বা ড্রাইভারের ইচ্ছাতে হয়?
ঘুমের মধ্যে যেন কান্নার শব্দ পেয়েছিল। নিশ্চয় মণি নামের ওই বউটির। হাসপাতালে কেউ ভর্তি হয়েছে শুনলেই তো মেয়েরা আগে কাঁদতে শুরু করে। প্রদীপ হালদারের সিরিয়াস কিছু নাও হতে পারে। যদি বড় ধরনের অপারেশন করতে হয় বা ভাল নার্সিংহোমে রাখার দরকার হয় তা হলে খরচ দেওয়ার সামর্থ্য কি ওদের আছে? পাশ করে কিছুদিন হল অফিসার হয়েছে, কত আর পায়, তিন—চার হাজার!
চিকিৎসার জন্য যদি টাকার দরকার হয় তা হলে আমিই দিয়ে দেব। অনুপম একটা গুমোট আলো—বাতাসহীন ঘরের জানলা খুলে দিয়ে যেন হাঁফ ছাড়ল। আমিই টাকা দেব। বেলেঘাটায় তার আলমারির লকারে বারো হাজার টাকা পরশুই সে রেখেছে।
ফুটবলারদের পাওনাগণ্ডা মেটাবার ভার বারিন দত্তের। তাকে সে দু’ বার জানিয়ে দিয়েছিল গত বছরের বারো হাজার টাকা হাতে না পেলে সে আর পায়ে বল ছোঁয়াবে না। কথাটা অন্য ভাবে ঘুরিয়ে রং ফলিয়ে প্রভাতী সংবাদে বেরোয়। ক্লাবের ভেতরের সব খবর বারিন যে গোপনে সুপ্রিয়কে জোগায় এটা অনেকেই জানে, আর সেই খবরগুলো সবই বারিন গোষ্ঠীর স্বার্থের পক্ষে আর বিরোধী গোষ্ঠীর, যার অন্যতম নেতা দুলাল শীল, তাদের স্বার্থের বিপক্ষে যাতে যায়, সেই ভাবেই সুপ্রিয় লেখে।
সকালে প্র্যাকটিসের পর মাঠ থেকে তাঁবুতে যাওয়ার সময় সে সুপ্রিয়কে গ্যালারিতে বসে থাকতে দেখে উঠে আসে।
একগাল হেসে সুপ্রিয় তাকে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই অনুপম ওর জামা ধরে টেনে তোলে।
”অনু, অ্যাই কী করছিস!” সুপ্রিয় অবাক হয়ে বলেছিল। গ্যালারি এবং মাঠের ধারে তিরিশ—চল্লিশজন সারথি—ভক্ত ছেলে তখন মজা দেখার সম্ভাবনা নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
অনুপম বুকের কাছে জামাটা ধরে শীর্ণকায় সুপ্রিয়কে এমন ঝাঁকাতে থাকে যে, ফড়ফড় করে ফেঁসে যায় পুরনো জামা।
”অ্যাই দ্যাখো, থাম থাম, এটা যে নিউজ হয়ে যাবে রে।”
”নিকুচি করেছে তোমার নিউজের। বারিন দত্ত কত টাকা দেয় তোমায় আমার বিরুদ্ধে লেখার জন্য? বলো, বলো।” অনুপম ধাক্কা দিয়ে সুপ্রিয়কে বসিয়ে দেয়।
”এক পয়সাও নয়। যা সত্যি, যা খবর, তাই লিখি। তুই বুকে হাত দিয়ে বল, ও কথা তুই বলিসনি? টাকা না পেলে পায়ে বল ছুঁবি না বলিসনি?”
”হ্যাঁ বলেছি, কিন্তু তুমি যেভাবে লিখেছ সেভাবে নয়। সারথির এখন ক্রাইসিসের সময়ে তুমি এমন ভাবে আমাকে প্রেজেন্ট করলে। যেন ক্লাবের ওপর আমার দরদ নেই, ভালবাসা নেই, শুধু টাকার সঙ্গেই সম্পর্ক, একটা অর্থপিশাচ? হাজার হাজার মেম্বার, সাপোর্টার কী ধারণা করছে আমার সম্পর্কে, সেটা কি জানো?”
