”লোহার ফোল্ডিং খাটটা তা হলে বের করতে বলি পঞ্চিকে।”
বউদি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পনেরো পর পঞ্চি ঢুকল। খালি গায়ে তোয়ালে পরা অনুপমকে দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
”মাসিমা কোথায়?”
”বিছানা করে মশারি টাঙাচ্ছে।”
ঠাণ্ডা—গরম জলে সেঁক দিয়ে অনুপমের মনে হচ্ছে হাঁটুটা যেন একটু সহজ লাগছে। চেয়ারে বসে পা দুটো সামনে তুলে আবার নামাল। কয়েকবার করল। প্যান্টটা দু’পায়ে গলিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে টেনে পরে নিল।
”টেম্পোটা উলটোল কী করে?” পঞ্চির কৌতূহলী প্রশ্ন।
”খুব জোরে যাচ্ছিল। সামনে হঠাৎ একটা ছাগলছানা ছুটে আসতেই সেটাকে বাঁচাতে গাড়ি ঘুরিয়ে নিল আর ব্যস সঙ্গে সঙ্গে বে—টাল হয়ে কাত হয়ে পড়ল।”
”আলুগুলো কী হল?”
”বস্তার মধ্যে ছিল তাই আর ছড়িয়ে যায়নি।”
”আর যারা ছিল তাদের কী হল?”
”কিছু হয়নি। শুধু আমারই হাঁটুটায় লেগেছে। ওরা সব টেম্পোটাকে তুলে সোজা করে বসাল। বস্তাগুলো তুলল। কিন্তু গাড়ির একটা পাইপ ভেঙে গেছে, না সারালে চলবে না। ওরা মিস্ত্রি খুঁজতে গেছে, কখন ফিরবে কে জানে। আমি দেখলাম কাছেই দাদার বাড়ি তাই চলে এলাম।”
”মেসোমশাইও নীচের দাদাকে খুঁজতে বেইরেচে, এখনও ফেরেনি।…. কখন ফিরবে কে জানে!”
”নীচের দাদা কোথায় গেছে?” অনুপম প্রশ্নটা করেই ভাবল জিজ্ঞেস না করলেই ভাল হত। তাকে জড়িয়ে যে দুঃখের ঘটনা ঘটেছে বা হয়তো ঘটেনি, সেটা নিয়ে আর নাড়াচাড়ার দরকার কী! কিন্তু মনের গভীরে কী এটা অস্বস্তি খচখচ করে বিঁধে চলেছে, যে জন্য সে কৌতূহলও সংবরণ করতে পারছে না।
”আজ কলকাতায় ফুটবল খেলা ছিল, খুব বড় খেলা! মেসোমশাইয়ের ভাই, সে খুব ভাল, নামকরা প্লেয়ার, সে খেলবে। আপনি জানেন না? এখান থেকে কত লোক খেলা দেখতে গেছে। আমাদের এখানে টিভি দেখতেও কত লোক এসেছিল। নীচের দাদা তো খেলা দেখতে কলকাতায় গেছে, এখনও ফেরেনি।”
”কেন? খেলা তো অনেকক্ষণ শেষ হয়ে গেছে।”
”সেইজন্যই তো এত ভাবনায় সবাই পড়েছে।” পঞ্চি হঠাৎ গলা নামিয়ে দিয়ে যোগ করল, ”খেলার মাঠে আজ খুব মারপিট হয়েছে, অনেক লোক মরেছে। আপনি জানেন না?”
”না তো! তুমি জানলে কী করে?”
”এখানে সবাই বলছিল। মেসোমশাইয়ের ভাইয়ের জন্যেই—”
ঘরে ঢুকল বউদি।
”পঞ্চি তুই শুতে যা। ঠাকুরপো এসো, ঘরটা দেখিয়ে দিই।”
বউদি যে ঘরটিতে অনুপমকে নিয়ে গেল সেটি লম্বায় দশ ফুট, চওড়ায় আট ফুট। লোহার পাইপের নাইলন ফিতের খাটে তোশক পাতা। একটা নীল রঙের মশারি তিনদিকের দেয়ালে দড়ি দিয়ে বাঁধা। তার আর একদিকের দড়িটা দরজা বন্ধ করে ছিটকিনিতে বাঁধতে হবে। ঘরে এক হাত চওড়া দু’ পাল্লার একটা বন্ধ জানলা। ঘরে জ্বলছে একটা টিউব বাতি।
বাঁশের ধামা, চটের বস্তা, থাক দেওয়া খালি টিনের কৌটো, ক্যানেস্তারা থেকে পুরনো খবরের কাগজ, ছবির ফ্রেম, ভাঙা হ্যারিকেন, পুরনো ছেঁড়া জুতো এবং অন্যান্য জিনিসের একধারে খাটটা পাতা। ঘরে পা ফেলার জায়গা নেই বললেই হয়।
ঘরে ঢোকা মাত্র অদ্ভুত একটা বোঁটকা গন্ধ অনুপমকে থমকিয়ে দেয়। সে কোনও ভাবান্তর প্রকাশ করেনি। এখন পছন্দ—অপছন্দ প্রকাশের সময় নয়। ভাগ্য যা দিচ্ছে সেটাই মুখ বুজে মেনে নেওয়া উচিত। সে ধনী বা সম্পন্ন পরিবারের সন্তান নয়। বিদ্যুৎপুরের বাড়িতে জন্ম থেকে যেভাবে থেকেছে সেটা এই গন্ধের মতো এতটা উৎকট না হলেও, মলিনতায়, অপরিচ্ছন্নতায় কাছাকাছিই।
”কী করব বলো, ভাল ঘর দুটো বাইরের দিকে। বিচ্ছিরি লাগছে তোমাকে এখানে—”
অনুপম থামিয়ে দিয়েছিল, বউদিকে।
”পাশেরটাই তো কল—বাথরুম, এটাই বিরাট লাভ। হাঁটতে বেশি হবে না।” অনুপম এই বলে বউদির সঙ্কোচ কাটাতে চেষ্টা করেছিল।
বউদি চলে যাওয়ার সময় দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যায়। তখন তার মনে পড়ল, কটা বাজে জিজ্ঞেস করা হল না। আলোর সুইচটা বোধ হয় ঘরের বাইরেই। জলতেষ্টা পেলে কলঘরে গিয়ে কল থেকেই খেতে হবে।
মশা আছে। ইতিমধ্যেই সে হাতে কামড় খেয়েছে। মশারি খাটিয়ে শুতে হবেই, কিন্তু কী দমবন্ধ করা গরম এই ঠাণ্ডার দিনেও! বোধ হয় বস্তাগুলোর জন্যই।
হাতড়ে হাতড়ে সে খাটটার অপর ধারে গিয়ে জানলায় হাত রাখল। ছিটকিনি তুলে ঠেলা দিল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার জন্য পাল্লা দুটো আটকে গেছে। জোরে ধাক্কা দিয়ে ঠেলতেই শব্দ করে আছড়ে খুলে গেল।
ঠাণ্ডা বাতাস সারা মুখে যেন আদর বোলাল। অনুপম আজ এই প্রথম সহানুভূতির ছোঁয়া পেল প্রকৃতির কাছ থেকে। বন্ধ চোখ কিছুক্ষণ পর খুলে বাইরে তাকিয়ে সে গাঢ় অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না। না পাওয়ার জন্য তার কোনও খেদ হচ্ছে না। তাকে কেউ যেন না দেখে এটাই সে এখন চায়।
মশারির চতুর্থ দড়িটা লাগিয়ে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল পা দুটো লম্বা টানটান করে। সারাদিনে এই প্রথম তার বিশ্রাম নেওয়া। চোখ বুজল সে।
ঘুমের মধ্যে সে বারবার পাশ ফিরল। তার খুবই গাঢ় ঘুম হয় কিন্তু আজ হল না। কী এক অস্বাচ্ছন্দ্যে সে ছটফট করে গেল। পাতলা ঘুমের মধ্যেই একসময় তার মনে হল মোটর গাড়ির এঞ্জিনের শব্দ, দরজা খোলা ও বন্ধের শব্দ যেন সে শুনতে পেল। আবার ফুঁপিয়ে চাপা কান্নার আওয়াজও পেল।
ঘুম ভেঙে চোখ মেলতেই চৌকো একটা উজ্জ্বলতা তাকে আঘাত করল। জানলাটা ঠিক তার পায়ের ওপরেই। প্রখর রোদে আকাশটা ঝকঝকে। অনুপম আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইল অনেকক্ষণ। একটা শালিখ জানলার পাল্লায় বসে কর্কশ ডাকে তাকে বিরক্ত করতেই সে সচেতন হল।
