লাথালাথি, ঘুসি, খিমচে দেওয়া, এগুলো হতই। প্রায় সবাই ছিল তার থেকে বয়সে বড়। অনুপম বল ধরলেই পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে বা পায়ের গোছে লাথি মেরে বা সররা কেটে ফেলে দিয়ে তাকে বলচ্যুত করাই ছিল বিপক্ষের অন্যতম সফল কাজ। প্রথম প্রথম সে খেপে উঠত, চিৎকার করত, খেলা ছেড়ে মাঠের ধারে গিয়ে বসে থাকত। কিন্তু এসব সত্ত্বেও সে মার খাওয়া থামাতে পারেনি।
একদিন খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাড়ি ফিরল। রবিদা কারণ জিজ্ঞেস করে, সব শোনার পর শুধু বলেছিল, ”তুই মার খাচ্ছিস যেহেতু তুই ওদের থেকে ভাল খেলিস। যখন মার খাবি না তখন বুঝবি তুই খারাপ খেলছিস, সেটাই তখন দুর্ভাবনার বিষয়। যে যত বড় হয় ততই লোকে তার নিন্দেমন্দ করে, তার দোষ খোঁজে, তার পেছনে লাগে। এটা আমাদের স্বভাব। এবার থেকে তুই চেষ্টা কর নিজেকে বাঁচিয়ে খেলার।”
রবিদার কথাগুলো তার যে কী উপকারে লেগেছিল সেটা অনুপম বহুবার মনে মনে স্বীকার করেছে ভারতের এক নম্বর মিডিও হয়ে। সেই বিদ্যুৎপুরের ছোটবেলার ফুটবল থেকেই সে জানতে পারে, হঠাৎ যদি নিজের দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দেয় কিংবা বল ধরার সময়টাকে নিখুঁত আন্দাজে বুঝে নিয়ে যদি এগোয় তা হলে বিপক্ষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে পারবে। কখন তাকে মারতে আসবে, সেটা বুঝে নেওয়ার ক্ষমতাও সে ওই সময় পেয়ে গিয়েছিল।
লোকে এটাকেই তার সিক্সথ সেন্স বলে। এটাই তাকে আজ বাঁচিয়েছে, এটা কি তাকে কাল বাঁচাবে?
অবশ্যই তাকে চলে যেতে হবে এখান থেকে। রবিদাকে হেনস্থা হতে হবে সে জন্য নয়। নীচের প্রদীপ হালদারের বউ আর বাচ্চচাটির জন্যই তার এখানে থাকা সম্ভব নয়। ঘুরেফিরে মাঠের এই ভয়ঙ্কর কাণ্ডটার জন্য সব দায় তার ঘাড়েই চাপবে। দুলোদার কথাগুলো—”আজ অনেকগুলো প্রাণ তুই নিয়েছিস,” আমৃত্যু তার কানে ফিসফিস করে যাবে। সব মৃত্যু, সব আঘাত, সব ক্ষয়ক্ষতির দায় তাকেই বইতে হবে। কারণ গোল থেকে বারো গজ দূরে বসানো একটা বলে সে যে শটটা নিয়েছিল সেটা বারের ওপর দিয়ে উড়ে চলে যায়।
অনুপমের মুখ থেকে একটা যন্ত্রণাকাতর শব্দ গোঙানির মতো বেরিয়ে এল। সেটা হাঁটুর ব্যথার জন্য হতে পারে। সে অন্ধকার ঘরে এধার—ওধার তাকিয়ে টিভি সেট, খাট, আলমারি, টেবল ছাড়া আর কী কী আছে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। এত অন্ধকার, কিছুই আন্দাজে আসছে না। অথচ পরদার তলা দিয়ে দালানের আলো সে দেখতে পাচ্ছে। কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসছে।
অনুপম এটুকু বুঝতে পারল, তার ইন্দ্রিয়গুলো একেবারে অসাড় হয়ে যায়নি।
বউদি ঘরে এসে আলো জ্বালল। বেরিয়ে গিয়ে আবার ঢুকল ডেকচি হাতে। তাতে গরম জল থেকে ধোঁয়া উঠছে।
”বরফ ভাল জমেনি। দুপুর পর্যন্ত লোডশেডিং ছিল। ধারেকাছে কারও বাড়িতে ফ্রিজও নেই যে, আনিয়ে নেব।”
”ঠাণ্ডা জল থাকে তো তাতেও হবে। দুটো বালতি আর একটা মগ দাও… জলটা বড্ড গরম, এতে একটু ঠাণ্ডা জল ঢেলে দাও।”
অনুপম উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পায়ে জোর পেল না। চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে অপ্রতিভ হেসে বলল, ”রেস্ট পেলেই ঠিক হয়ে যাবে। এসব আমার অভ্যেস আছে।”
বউদি অনুপমের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ”তোমার বোধ হয় খিদে পেয়েছে ঠাকুরপো।”
”না, না, একদম নয়। আজ রাতটা উপোস দেব, শরীর ফিট থাকবে।” যদিও ঘণ্টা দশেক তার পাকস্থলীতে শক্ত কোনও খাদ্য পৌঁছয়নি তবু অনুপম বিন্দুমাত্র খিদে বোধ করছে না।
বউদি বালতি, মগ, তোয়ালে, ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা জল ভরা দুটো বোতল ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস ঘরে এনে দিয়ে বলল, ”মেঝেয় যদি জল পড়ে তো পড়ুক, আমি মুছে দেব। রাতে অল্পবয়সি বউটা বাচ্চচা নিয়ে একা থাকবে, আমি এখন নীচে গিয়ে রাতটা ওর সঙ্গেই থাকব। বেচারা একেবারে….।”
বউদিকে থামিয়ে অনুপম অসহায় এবং কিছুটা ভীত স্বরে বলে উঠল, ”আমি কোথায় থাকব। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই এই ঘরটা, বাইরের কেউ যদি এসে পড়ে?”
বউদিকে বিচলিত দেখাল। সমস্যার এই দিকটা বোধ হয় ভেবে দ্যাখেনি। ইতস্তত করে বলল, ”কাজের মেয়েটা জিজ্ঞেস করেছিল তুমি কে হও। ও আগে তো তোমায় দ্যাখেনি। তুমি আমাকে বউদি বলছ তাই বাপের বাড়ির কেউ হও বলতে ভরসা হল না। আবার ওনার ভাই হও বললে যদি পঞ্চি বাইরে কারও কাছে বলেটলে বসে এই ভেবে তাও বলতে পারলাম না। শেষমেষ বললাম, তোর মেসোমশায়ের আলুর ব্যবসার একজন বড় খদ্দের, ভাইয়ের মতো। আলু নিয়ে কলকাতায় যাচ্ছিল, টেম্পোটা উলটে গিয়ে পায়ে চোট লেগেছে তাই রাতটায় থাকতে এসেছে।”
শেষকালে আলুর খদ্দের! তাকে এখন দেওর বা ভাই বলে পরিচয় দিতে ভয় পেল। মুহূর্তের জন্য অনুপমের মনে হল শিকড়হীন একটা গাছের মতো সে খাড়া রয়েছে। আঁকড়ে ধরার মতো জমি তার নীচে নেই। তার নিজের কেউ নেই, কিসসু নেই।
”পঞ্চি বোকাসোকা মেয়ে, যা বলবে বিশ্বাস করবে। কিন্তু ভেতর দিকে ঘর বলতে, কলঘরের পাশে একটা আছে, হাবিজাবি ভাঙাচোরা জিনিস রাখা হয়। থাকতে পারবে? তবে চট করে কেউ দেখে ফেলতে পারবে না।”
”খুব থাকবে পারব।”
বউদি ইতস্তত করতে লাগল। অনুপম জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে।
”খুব নোংরা হয়ে রয়েছে, আর একটা মাত্র জানলা।”
”চারটে দেয়াল আর মাথায় ছাদ আছে এমন যে—কোনও জায়গায় এখন আমি থাকতে পারব।”
