নীচে সিঁড়িতে কার গলার শব্দ শোনা গেল। অনুপম চকিতে বউদির দিকে তাকিয়ে দেখল মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে।
”কে? রবিদার গলা তো নয়!”
”বুঝতে পারছি না। দেখছি।” বউদি ব্যস্ত পায়ে ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় দরজার পরদাটা টেনে দিল। অনুপম প্রায় লাফিয়ে সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে ঘরের আলোটা নিভিয়েই ভাবল স্টিলের আলমারিটার আড়ালে দাঁড়াবে কি না।
একটু পরেই বউদি ফিরে এল। ঘর অন্ধকার। ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে অনুপমকে উদ্দেশ করে বলল, ”আলো নেভানোই থাক। তুমি এখন ঘরের বাইরে এসো না। কাছেই থাকে একটা ছেলে, খোঁজ নিতে এসেছিল। বলল, বাজারে স্টেশনারি দোকানের মালিকের ছোট ভাই খেলা দেখতে গেছল, সেও ফেরেনি। তোমাদের দু’জন প্লেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আর গড়ের মাঠের অনেক জায়গায় নাকি নিরীহ লোকদের ধরে ধরে মারা হয়েছে, চৌরঙ্গিতে অনেক দোকান ভাঙচুর করে লুটপাট হয়েছে, ট্রামে—বাসে ঢিল মেরেছে। আমাদের সাবধানে থাকতে বলল।”
”তোমাদের এখানে আর কী হবে?”
‘হবে না, এ—কথা বোলো না।” বউদির স্বরে আতঙ্কের ছোঁয়াটা স্পষ্ট বোঝা গেল। ”তোমার দাদা পঞ্চমুখে এখানকার লোকের কাছে তোমার খেলা সম্পর্কে যে প্রশংসা করেন….”
যে—কথা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল তা বুঝে নেওয়ার মতো বুদ্ধি অনুপম এখনও হারায়নি। তার এখানে আসাটা বউদি পছন্দ করেনি। গৃহকর্ত্রীর অপছন্দ সত্ত্বেও আজ রাতটা অন্তত তাকে এখানে থাকতে হবে।
”আমি কালকেই চলে যাব। এখানে রয়েছি, এটা জানাজানি না হওয়াই উচিত। কেউ আমাকে এখানে আসতে দ্যাখেনি সুতরাং তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
অন্ধকারে সে বুঝতে পারল না, তার কথা শুনে বউদির মুখে কতটা স্বস্তি ফুটে উঠল।
”না, ভয় আমি পাচ্ছি না। ভয় এখন তোমাকে নিয়ে। এখানে দু’দিন ধরে ছেলেধরার কথা শোনা যাচ্ছে। গ্যাঁদালপাড়ায় কার ছেলেকে নাকি ফুল শুঁকিয়ে অজ্ঞান করে পুকুরপাড়ে ফেলে রেখে গেছে। আর একটা বাচ্চচাকে ভুলিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দোকানে বিস্কুট কিনছিল। দোকানির সন্দেহ হওয়ায় দু—চারটে প্রশ্ন করতেই লোকটা সাইকেল চেপে পালায়। অচেনা অপরিচিত লোক দেখলেই এখানে ঘিরে ধরছে।”
”আর যাই হোক ছেলেধরা বলে আমাকে অন্তত এখানকার লোক পিটোবে না। তবে তোমরা যাতে হ্যারাশমেন্টের টার্গেট না হও, সেটাই এখন দেখা দরকার। রবিদা কখন বেরিয়েছে?”
”গোপালরা এসে বলার পরই উনি আমাকে বললেন, দ্যাখো তো প্রদীপ ফিরেছে কি না। নীচে গিয়ে দেখলুম ফেরেনি। মণি বলল, তাড়াতাড়িই ফিরবে বলে গেছে। ওঁকে নিয়ে দোকানে গিয়ে ফ্রিজ পছন্দ করে আসার কথা বলে সেজেগুজে অপেক্ষা করছেন। তারপর ন’টা যখন বাজল তোমার দাদা বললেন, ভাল মনে হচ্ছে না, বেরিয়ে একটু খোঁজখবর করি। পাশের বাড়ির সন্তুকে গিয়ে বললেন, তারপর আরও দু’তিনজনের সঙ্গে কথা বলে, এখানে প্রাইভেটে ভাড়া খাটায় একজন, তার গাড়িতে সন্তুকে নিয়ে উনি কলকাতা রওনা হয়ে গেলেন। বললেন, আগে লালবাজারে খোঁজ নেবেন, তারপর হাসপাতালে।”
অনুসন্ধিৎসু হয়ে অনুপম কোনও প্রশ্ন করল না। করার কিছু নেইও। প্রদীপ হালদার আটজনের একজন হতে পারে, নাও পারে। আহতদের মধ্যে থাকতে পারে, নাও পারে। যা হওয়ার হয়ে গেছে, এই নিয়ে ভেবে তার নিজের সঙ্কটের কোনও সুরাহা হবে না।
”বউদি, তোমার ফ্রিজ চলছে?”
”হ্যাঁ, কেন?”
”বরফ চাই আর গরম জল, পাওয়া যাবে? রডটা হাঁটুতে লেগে মুশকিলে ফেলেছে, ভাল করে চলতে পারছি না। তোমাদের বাজারের কাছাকাছি শিবতলায় একজন মোটরে নামিয়ে দিয়ে গেল, সেখান থেকে হেঁটে আসছি। এখন আর হাঁটু ভাঙতে পারছি না। পেলে একটু ঠাণ্ডা—গরম লাগাতাম।”
”এখুনি বরফ আর গরম জল দিচ্ছি।” বউদি ঘর থেকে বেরিয়ে ”পঞ্চি, এই পঞ্চি”, বলতে বলতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
অন্ধকার ঘরে দুই তালুতে মুখ ঢেকে, সামান্য কুঁজো হয়ে অনুপম বসে রইল। এই মুহূর্তে তার অতীত ও ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কিছু নেই। বর্তমানটা তালগোল পাকিয়ে একটা ফুটবলের রূপ নিয়েছে, যেটা খেলতে তার কোনও আগ্রহ নেই।
অতীতের দিকে কত দূর পর্যন্ত অনুপম এখন যাবে? রবিদার সময় পর্যন্ত? যখন রবিদা তাদের বাড়িতে থাকত। বিদ্যুৎপুর স্পোর্টিং ক্লাবের মাঠে গোল পোস্টের পেছনে দাঁড়িয়ে খেলা দেখত একটা কারণেই। খেলার উদ্দেশ্য গোল দেওয়া, তাই বল মারা হত গোলের দিকে। বেশির ভাগ বল গোলেই বাইরে দিয়ে চলে যেত। অনুপম দৌড়ে কুড়িয়ে এনে হাই কিক করে সেটা মাঠের ভেতর পাঠিয়ে দিত। শুধু এই কিকটা করার উত্তেজনা বা সুখ পাওয়ার লোভ তাকে ‘বল কুড়োনে অনু’ নামে স্কুলে চিহ্নিত করে।
বড়দের মাঠের লাগোয়া ছোট জমিটায় খেলত ছোটরা। অনুপমের ফুটবল খেলার শুরু সেখান থেকেই। কী করে ফুটবল খেলতে হয় সেটা একজনও তাকে শেখায়নি। স্বাভাবিক ভাবেই খেলাটা তার কাছে এসেছে। বড়দের খেলা দেখে দেখে, বিশেষ করে রবিদার, সে অনুকরণের চেষ্টা করত। বড়রা মাঝেমধ্যে কলকাতায় গিয়ে খেলা দেখে এসে সেই ভাবে খেলতে চাইত। তবে তাদের মধ্যে ফুটবল খেলে প্রতিষ্ঠা অর্জনের কোনও চিন্তা ছিল না।
খেলার আগে যখন দুটো দল তৈরির জন্য ছেলেরা জড়ো হত, তখন মুশকিল হত অনুপমকে নিয়ে। দু’দলই তাকে চাইত। তাই নিয়ে ঝগড়া, হাতাহাতিও হয়েছে। অনেকদিন তাকে দুই দলের হয়েই আধাআধি করে খেলে খুশি করতে হয়েছে দু’পক্ষকে।
