”কোন হাসপাতালে?”
”বোধ হয় পিজি—তে। আমার তখন ওসব খবর জানার মতো অবস্থা ছিল না বউদি, আমি নিজেই তখন প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত ছিলাম। দেখছ না, নিজের ঘরে কি আর কোথায় না গিয়ে তোমাদের এখানে এসেছি রাতের অন্ধকারে … একটা চোরও আমার থেকে এখন অনেক নিরাপদ, কেননা কেউ তাকে চেনে না বা দু—চারজন চেনে। সে সাহসভরে রাস্তায় হাঁটতে পারবে কিন্তু আমি পারব না। আমি বিখ্যাত। আমার ছবি বহুবার কাগজে, ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে, টিভিতে কতবার দেখানো হয়েছে। সারা দেশ আমার মুখটা চেনে। আমাকে এখন মানুষের চোখের আড়ালে চলে যেতে হবে, লুকিয়ে থাকতে হবে…. তাই তো এখানে চলে এলাম।”
একটানা কথাগুলো বলে অনুপম উত্তেজিত হয়ে উঠল। ঝুঁকে, ব্যগ্র চাহনিতে বহু ধরনের প্রশ্ন রেখে সে বউদির দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে চেষ্টা করছে, এখানে আজ তাকে আশ্রয় দেওয়া হবে কি না।
”এমন হল কেন?” আগের মতো ফিসফিস স্বরে বউদি বলল, ”তোমার এত নাম, যশ, সম্মান, হাজার হাজার লোকের এত শ্রদ্ধা, ভালবাসা, টাকাও যথেষ্ট করেছ, তবু কেন আজ এই দশায় পড়লে?…. তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো পালাতে হচ্ছে কেন?”
জবাব না দিয়ে অনুপম শুধু চোখের পাতা টেনে নামাল। কী বলবে সে মাঠ থেকে বহু দূরে জীবনযাপন করে এমন এক গৃহস্থ বউকে! কেন, কেন, কেন… সব কেনর কি উত্তর হয়? একটা ফুটবলার কি সারাজীবন একই পর্যায়ে ফর্ম রেখে খেলে যেতে পারে? এটা কি রান্না করা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা?
”জানো, আজ কী ব্যাপার হয়েছে?”
অনুপম সন্ত্রস্ত হয়ে গেল বউদির কণ্ঠস্বরে। তার মন বলছে, কিছু একটা ঘটেছে যার সঙ্গে সে সরাসরি না হলেও জড়িত। ভাল নয়, আজ কিছুই তার পক্ষে ভাল নয়। সর্বনেশে কিছু একটা বউদি তাকে বলবে।
”কী হয়েছে।” অনুপমের গলা বসে গেল। ঘড়ঘড়ে একটা শব্দ বেরিয়ে আসছে শুধু। সে বলতে চাইছিল—আমার জন্যই কি?
”নীচের ভাড়াটে, প্রদীপবাবু… প্রদীপ হালদার, দেখেছ কি ওকে?”
”না। অনেক লোক সেদিন আলাপ করতে এসেছিল, মনে হয় না তোমাদের ভাড়াটে বলে রবিদা কারও সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়েছিল।”
”তখন সবে এসেছে বউ আর সঙ্গে চার মাসের ছেলে। অফিসের পরীক্ষায় পাশ করে আমাদের এখানকার ব্যাঙ্কেই প্রথম পোস্টিং। চাষিদের লোনটোন দেওয়ার ভার ওর ওপরেই। খেলাধুলোয় কোনও আগ্রহই নেই। তোমার দাদা ওর কাছে তোমার কথা বলতেন। একদিন বলল, ‘দেবেন তো একটা টিকিট, একদিন আপনার ভাইয়ের খেলা দেখে আসব।’ তাই তোমার দাদা টিকিটটা ওকে—”
”আজ খেলা দেখতে গেছল।” বউদিকে শেষ করতে না দিয়ে অনুপম নিজেই কথাটা সম্পূর্ণ করে তিক্ত মুখে তাকিয়ে রইল।
‘হ্যাঁ।”
”এখনও বাড়ি ফেরেনি।”
”না।”
দু’জনেই চুপ করে রইল। একটা ভয়ঙ্কর আশঙ্কায় ছেয়ে গেল দু’জনের ভাবনা। যে আটজন মারা গেছে তাদের মধ্যে হয়তো প্রদীপ হালদার রয়েছে।
”কখনও বড় ম্যাচ দেখতে মাঠে যায়নি?”
”ছোট কি বড় কোনও ম্যাচই নয়, জীবনে এই প্রথম কলকাতার মাঠে খেলা দেখতে গেল। কী বিচ্ছিরি একটা ব্যাপারে জড়িয়ে পড়লুম বলো তো। টিকিট দিয়ে তোমার দাদাই তো পাঠিয়েছিলেন। কে জানত যে, এই রকম একটা কাণ্ড খেলার মাঠে ঘটবে।”
বউদি অসহায় চোখে অনুপমের দিকে তাকাল। চোখ সরিয়ে সে দরজার দিকে রাখল। তারপর মুখ ফিরিয়ে ট্রলির ওপর রাখা টিভি সেটটায় দৃষ্টি নিবন্ধ করল।
”টিভিতে খেলা দেখেছিলে?”
”তোমার দাদা আর পাড়ার কয়েকজন দেখছিলেন।”
”মাঠে গোলমাল দেখিয়েছে।”
”আমি তো খেলা দেখিনি, ওসব কিছু বুঝিটুঝি না, দেখিয়েছে কি না বলতে পারব না। নীচে মণির সঙ্গে, প্রদীপের বউ, ওর সঙ্গে কথা বলছিলাম তখন। ওপরে খুব হইচই চেঁচামিচি হচ্ছিল, তারপর কেন যেন চুপ হয়ে গেল। তোমার দাদা গুম মেরে বারান্দায় বসে রইলেন।”
”তা হলে মাঠে যে গোলমাল হয়েছে সেটা জানলে কী করে?”
”সাতটা নাগাদ গোপাল আর ক’জন খেলা দেখে ফিরে এসে মাঠের ঘটনা বলতেই তো আমরা জানলুম। শুনে তো আমার রক্ত জল হয়ে গেল। পঞ্চাশ—ষাটজন নাকি পায়ের চাপে থেঁতলে মারা গেছে। তারপর কী খারাপ খারাপ কথাই না ওরা তোমার সম্পর্কে বলল যে…”
”রবিদা শুনে কী বলল?”
অনুপম জানতে চায়, তার পক্ষ নিয়ে অন্তত একজনও বিরোধিতার সামনে তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। রবিদা ছাড়া আর কেউ যে এখন তার সহায় হবে না, এমন একটা আশা নিয়ে সে প্রশ্ন করল।
”উনি আর কী বলবেন, মুখ বুজে সব শুনে গেলেন! ওরা চলে যাওয়ার পর বললেন, অনুর জন্যই আজ মাঠে এতগুলো নিরীহ লোক মারা গেল। এখানকার লোকে বলবে, আমার ভায়ের জন্য একটা মেয়ে আর তার বাচ্চচা পথে বসল। আজীবন এই কথা শুনতে হবে।”
”এই কথা বলল রবিদা!”
”হ্যাঁ। বললেন, এখন আমি ঘরে বসে থাকলে ব্যাপারটা খুব খারাপ দেখাবে, অমানবিক হবে। আমিও বললাম, খোঁজ নিতে যাওয়া তোমার কর্তব্য, দোষের ভাগী তো তুমিও।”
অনুপম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কপালে ঘামের বিন্দু ফুটছে। মাথার মধ্যে হাজার হাজার গলায় তালগোল পাকানো চিৎকার ওঠানামা করছে। মনে মনে সে আউড়ে গেল, ভুল করেছি, মারাত্মক ভুল করেছি এখানে এসে।
”ঠাকুরপো আজ তোমার এখানে আসা কেন জানি ভাল ঠেকছে না। প্রদীপের খবর না পাওয়া পর্যন্ত মনের মধ্যে কী যে এখন হচ্ছে। ওরা ভাল খবর আনুক, ভগবানের কাছে এই প্রার্থনাই করে যাচ্ছি।”
