অনুপম সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল। বাঁ দিকে দোতলার সিঁড়ি। রবিদা আর বউদি দোতলায় থাকে। একতলায় এক দম্পতিকে চার বছর আগে সে ভাড়া থাকতে দেখেছিল। হয়তো এখনও তারা রয়েছে। কিন্তু অন্য কেউ…..ওরা কেউ আছে কি না সেটা বুঝে নিতে হবে। এই সময় সদর দরজা খোলা। আলো—জ্বলা যথেষ্ট অস্বাভাবিকই।
অনুপম বাড়ির বাইরে এসে প্লাস্টার না—হওয়া পাশের একতলা বাড়ির দিকে এগোল। রবিদার বাড়ির সঙ্গেই লাগোয়া নিচু পাঁচিল, ঘরের জানলায় পরদা, ভেতরে আলো জ্বলছে। এদেরও বাইরের দালানে গ্রিল দেওয়া। ভেতরে যাওয়ার দরজাটা খোলা। বাড়ির ছাদে অ্যান্টেনা নেই দেখে সে আশ্বস্ত হল।
বয়স্কার গলার শব্দ ভেতর থেকে ভেসে এল, ”বউমা, দালানের দরজাটা বন্ধ করে দাও, সন্তু এলে বরং খুলে দিয়ো… দ্যাখো আজ আর ফেরে কি না।”
সরে এল অনুপম। এই বাড়ির সন্তু নামে কেউ এখন বাইরে। রবিদার ওপাশের বাড়িটা একটু তফাতে, জঙ্গুলে একটা পোড়ো বাগানের মধ্যে। ইট বের করা, জরাজীর্ণ। ভাঙা দোতলা বাড়ি। তেঁতুলতলারই একদা ধনী, প্রাচীন কোনও পরিবার থাকে।
”কে?”
অনুপম চমকে উঠে থরথরিয়ে কাঁপল। দোতলা থেকে কেউ তাকে লক্ষ্য করেই বলল। মুখ তুলে রবিদার বারান্দায় সে আবছা একটা মাথা দেখল। আপনা থেকেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘রবিদা আছে? আমি অনু।”
মাথাটা সরে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর আর—একজন এল ব্যস্ত ভঙ্গিতে। ঝুঁকে তাকে দেখেই ”ওহ নাহ” ধরনের একটা শব্দ করে বলল, ”অনু ঠাকুরপো!… ওপরে চলে এসো, তাড়াতাড়ি।”
শুনেই কেঁপে উঠল অনুপম। কী রকম যেন চাপা ভয় আর উত্তেজনা নিয়ে ‘তাড়াতাড়ি’ শব্দটা তার দিকে ছুড়ে দিল!
আবার সে বাড়ির মধ্যে ঢুকে দোতলার সিঁড়ির দিকে ঘুরতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। একতলায় ভাড়াটেদের দরজা অল্প ফাঁক করে একটি বছর চারেকের শিশু দাঁড়িয়ে, তার পেছনে একটি বউ, বোধ হয় ওর মা।
বউটির সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ছ্যাঁত করে উঠল অনুপমের বুক। একটা অসহায় করুণ আর্তি নিয়ে দুটি চোখ তার কাছে কিছু যেন জানতে চাইছে।
চার বছর আগে এই বাড়িতে কয়েক ঘণ্টার জন্য থাকলেও নীচের ভাড়াটেদের সে দেখেনি। বউটিকে সে এই প্রথম দেখল। শিশুটি এক পা পিছিয়ে শাড়ির আঁচল ধরল। টানা টানা চোখ দুটি ঘুমের ভারে শ্রান্ত। এখনও বাচ্চচাটা ঘুমোয়নি কেন?
”কোনও খবর পেলেন?” ব্যাকুল কিন্তু মৃদু স্বরে জানতে চাইল বউটি। অনুপম বিভ্রান্ত হল। কারও জন্য অপেক্ষা করছে বোধ হয়।
”কীসের খবর?”
”আপনি কি ওদের সঙ্গে কলকাতায় গেছলেন?”
অনুপমের সিক্সথ সেন্স সজাগ হয়ে উঠল। তার মনে হল, কিছু একটা ঘটেছে এখানে, যে জন্য এত রাতেও আলো জ্বলছে, সবাই জেগে। নিশ্চয়ই কোনও বিপদ—আপদ।
”না তো!” অনুপম চোখের কোণে দেখল সিঁড়ির বাঁকে মুখ বাড়িয়ে বউদি হাতছানি দিয়ে তাকে ওপরে আসতে ইশারা করছে।
”না, আমি তেঁতুলতলার লোক নই।”
কথাটা বলেই অনুপম সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত উঠতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বাঁ হাঁটু ভাঙতে না পারায় ঠোক্কর খেয়েছে। অপ্রতিভ হয়ে পেছন ফিরে দেখল দু’ জোড়া চোখ দরজার ফাঁক দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে। অবসন্ন, হতাশ, উদ্বেগে কাতর আর কৌতূহলী বিস্ময় নিয়ে সারল্যে ভরা দু’ রকম চাহনি। অনুপম হাসল, যে হাসির কারণটা সে নিজেও জানে না।
সিঁড়ি থেকেই বউদি হাত ধরে তাকে টেনে ঘরে নিয়ে এল।
”কী ব্যাপার বউদি, রবিদা কোথায়?”
”চুপ, আস্তে। তোমার দাদা পাড়ার দু’ জনকে নিয়ে কলকাতায় গেছেন।”
বউদির ত্রস্ত চোখ খোলা জানলায় গিয়ে পড়ল। জানলার পাল্লা বন্ধ করে দিয়ে এসে ঘরের দরজায় দাঁড়ানো ফ্রকপরা কিশোরীটিকে ধমক দিয়ে বলল, ”অমন হাঁ করে কী দেখছিস, রান্নাঘরটা ধুয়ে পরিষ্কার কর।”
”করেছি।”
”তা হলে দালানে গিয়ে বোস, ঘুমোসনি। সদর দরজা বন্ধ করে দিয়ে আয়, কতক্ষণ আর খোলা রাখা যায়। আলোটা জ্বালাই থাক আর রাস্তার দিকে নজর রাখিস। মেসোমশাইরা কখন ফিরবেন কে জানে!”
অনুপম বিমূঢ়ের মতো বউদির কথা শুনে যাচ্ছিল আর নিশ্চিত হচ্ছিল, বড় ধরনের কোনও বিপর্যয় এই বাড়িতে আজ ঘটে গেছে। কী সেটা?
”নিয়তির কী পরিহাস ঠাকুরপো, তুমি কিনা আজই এলে?”
”কী হয়েছে?”
বউদি যে ভাবে খাটের ওপর বসে পড়ল তাতেই অনুপম বুঝল টেনশনটা আর নিতে পারছে না।
”না এলেই ভাল হত, তোমার আর আমাদের…. সবারই একদিক থেকে ভাল হত। এখন সমস্যাটা আরও বেড়ে গেল।”
”হয়েছে কী, সেটা তো আগে বলবে? আমি খুব বিপদে পড়েই এখানে এসেছি। তোমাদের যদি কোনও অসুবিধে হয় আমি চলে যাব, আজ রাতটা থেকে কাল ভোরেই চলে যাব।”
ঘরের একধারে টেবল আর চেয়ার। অনুপম চেয়ারটার দিকে এগোবার সময় খোঁড়াল। বউদি সেটা লক্ষ করে বলল, ”কী হয়েছে পায়ে?’
”লেগেছে … লোহার রড দিয়ে মেরেছে।”
চাপা আর্তনাদ করল বউদি।
”কখন, কোথায়… মাঠেই?”
”হ্যাঁ।”
অনুপম চেয়ারে বসে আলতো স্বরে আহহ” বলল। অনেকক্ষণ পর হাঁটুটা ভারমুক্ত হল।
”খুব কি গোলমাল হয়েছে?… অনেক লোক নাকি মারা গেছে?” বউদি ঝুঁকে ফিসফিস করে এমন ভাবে বলল, যেন কোনও গুপ্তকথা ফাঁস করে দিচ্ছে।
”আমি দেখিনি, দেখার মতো অবস্থায় আমি ছিলাম না। পরে শুনেছি আটজন নাকি স্পট ডেড। ভয়ে পালাতে গিয়ে ভিড়ের চাপে আর পায়ের নীচে পড়ে … আর বহু লোককে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।”
