কে একজন তখন বলেছিল, ”শুধু অনুপমকে এর জন্য দায়ী করছ কেন? সবাই তো ক্লাবটাকে ডুবিয়েছে।”
”সবাই বলতে কাকে বোঝাচ্ছিস?”
”তুমি, আমি, প্লেয়াররা, অফিসিয়ালরা। যে যার নিজের স্বার্থ আগলাতে গিয়ে এমন সব আশকারা প্লেয়ারদের দিয়েছে, এক গ্রুপ অন্য গ্রুপকে ডোবাবার জন্য…”
”থাক, থাক, এখন এই নিয়ে ঝগড়া করার সময় এটা নয়। … যা কখনও হয়নি তাই হল আজ, মানুষ খেপে উঠে মানুষ মারল।”
”ইচ্ছে করে মারেনি। ভিড়ের চাপে, পায়ের চাপে….ওরা পালাতে যাচ্ছিল।”
”ধোঁয়া দেখেছিলাম, আগুন লাগিয়েছে কোথাও।”
”পুলিশের উচিত হয়নি গ্যালারিতে উঠে লাঠি চার্জ করা।”
”না করলে অবস্থা কী হত জানিস? সারথির একটা প্লেয়ারও প্রাণ নিয়ে মাঠ থেকে বেরোতে পারত না।”
”কিন্তু এখন আমরা বেরোব কী করে? পুলিশ কী করছে?”
অনুপমের তখন ভোঁতা হয়ে পড়ছিল মানসিক প্রখরতা। পেশিগুলো যেন জরাগ্রস্ত। ঝিমুনি এসেছিল। চোখ আর খুলে রাখতে পারছিল না। তবু সে বাস্তব পরিস্থিতিকে মন থেকে ছিটকে যেতে দেয়নি। সে বুঝে নিয়েছিল। তাকে সবাই বলির পাঁঠা করবে। জল্লাদের সামনে তাকেই ঠেলে দিয়ে সবাই বাঁচতে চাইবে।
পুকুরের পাশ দিয়ে রাস্তাটা এবার ধনুকের মতো ঘুরে গেছে। এইটুকু পথ আসতে কতটা সময় লাগল? অভ্যাস মতো বাঁ হাত তুলল ঘড়ি দেখার জন্য। কোথায় পড়ে গেল কে জানে!
বাতাস বইছে না, তাই কনকনে ঠাণ্ডা ভাবটা নেই। হাঁটুর ওপরে হাত বুলিয়ে দেখল ফুটে উঠেছে কি না। ব্যথা হবে, কাল সকাল থেকেই বুঝতে পারবে আঘাতটা কত জোরে হয়েছে। আজ রাতেই ঠাণ্ডা—গরম করতে পারলে ভাল হয়। অনুপম ধীরে ধীরে, যতটা সম্ভব হাঁটু না ভেঙে হাঁটতে লাগল।
কীসের যেন শব্দ হল।
রাস্তার কিনারে খাড়াই ঢাল নেমে গেছে পুকুরে, এই সময় পুকুরে জল প্রায় থাকে না। ঢালে আগাছা ঝোপ আর একটা পাতা ছাড়া মাঝারি আকারের গাছ। এই ঢালে গুঁড়ি মেরে কেউ থাকতে পারে।
দরদরিয়ে ঘেমে উঠল অনুপম। কেউ কি রয়েছে! একজন, দু’জন বা তিনজন! জানল কী করে আমি এখান দিয়ে রবিদার বাড়ি যাব। ফলো করেছিল? শিবের চত্বরে যখন বসে ছিলাম, তখন কেউ দেখে থাকবে, হয়তো সেই সাইকেলওয়ালাই। তারপর অন্য কোনও পথ ধরে এইখানে এসে অপেক্ষা করছে।
পিটিয়ে খুন করার পক্ষে জায়গাটা চমৎকার। একদিকে ফাঁকা জায়গা, বড় বড় গাছ ঘেরা কয়েকটা পাকা বাড়ি, অন্যদিকে পুকুর। নির্জন, অন্ধকার। চিৎকার করলে কোনও বাড়ি থেকে কেউ ছুটে আসবে না। কুকুরগুলো দু—চারবার ঘেউ ঘেউ করবে মাত্র।
আবার সরসর শব্দ হল। ঝোপ যেন নড়ে উঠল। চোখের ভুলও হতে পারে। অনুপম কাঠ হয়ে গেছে। কোনও মানুষ, নাকি জানোয়ার? ইঁদুর, বেড়াল, সাপ, গিরগিটি, শেয়াল কিংবা ছোটখাটো চিতাবাঘ! বুক আর পিঠ বয়ে ঘাম নামছে। মনে হচ্ছে পিঁপড়ে চলে ফিরে বেড়াচ্ছে।
ছুটব কি? অনুপম কুঁজো হয়ে বাঁ পা বাড়াল রেসে স্টার্ট নেওয়ার ভঙ্গিতে। কিন্তু কতটা ছুটে পালাতে পারব? রাস্তাটা বেঁকে পুকুর ঘুরে আর একটু গেলেই রবিদার বাড়ি দেখা যাবে। তার আগেই কেউ তাকে ধরে ফেলবে। এখন তার থেকেও জোরে দৌড়তে পারবে যে—কেউই, একটা বাচ্চচা ছেলেও।
অনুপমের চেতনা জুড়ে হঠাৎই একজোড়া ড্যাবড্যাবে চোখ ভেসে উঠল। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সেই দুটো চোখের দিকে। নিষ্পাপ, সরল, গভীর দৃষ্টি মেলে যেন বুঝতে চেষ্টা করছে, তার অপরাধটা কী? সেও তো আর সকলের মতো সই নিতেই গিয়েছিল। সই নেওয়াটা তো শ্রদ্ধা, অনুরাগেরই প্রকাশ!
চার বছর ধরে কি মনে করে রেখে দিয়েছে! চার বছর মানুষ কত বদলায়। অনুপম কান আর চোখ তীক্ষ্ন করে ঝোপের দিকে তাকাল। মনে হচ্ছে না ওখানে কোনও মানুষ আছে। থাকলে এতক্ষণে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। চার বছর সে নিজেও কত বদলে গেছে, ছেলেটাও নিশ্চয়ই কঠিন, নিষ্ঠুর, হিংস্র পরিবেশের থেকে রেহাই পায়নি।
অনুপম এগোতে লাগল। একটা টালির বাড়ি। একটা জানলা আধভেজানো। হ্যারিকেনের আলো দেখা যাচ্ছে। ঠং করে বাসন রাখার শব্দ এল। সে আশ্বস্ত বোধ করল। মিছিমিছিই ভয় পাচ্ছিল এতক্ষণ। এতদূর পর্যন্ত ধাওয়া করে কে আসবে তাকে মারতে? কী জন্যই বা তাকে মারবে? আটজন মারা গেছে, এটা খুবই দুঃখের। কিন্তু সেজন্য তাকে কেন দায়ী করা হবে, সে কি নিজের হাতে তাদের মেরেছে? তাকে মারধোর করে কী লাভ, হারা ম্যাচটা কি তাতে জেতা যাবে? তাকে মেরে ফেললে সারথির ট্রফি জেতার রাস্তা পরিষ্কার হবে?
”যত্তসব আজেবাজে ভয়।” অনুপম নিজের মনে বিড়বিড় করে মুখ তুলে রবিদার বাড়ির দিকে তাকাল।
ব্যাপার কী, সদর দরজার দু’ধারে বসার জন্য সিমেন্টের রক। তার ওপরের বালবটা এত রাতে জ্বলছে যে! দোতলায় দক্ষিণের দুটো ঘরের খোলা জানলা দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে, বারান্দাটা অন্ধকার। একতলার ঘরের জানলা বন্ধ, ভেতরে আলো জ্বলছে। গ্রিল ঘেরা বাইরের দালানটাও অন্ধকার। সদরের কাঠের দরজা আর কোলাপসিবল গেট পুরো বন্ধ নয়। ভেতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ আসছে না। এত রাত্রে অন্ধকারে গ্রামের মধ্যে আলো—জ্বলা অথচ নিঝুম বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অনুপম হতভম্ব হয়ে গেল। তার মনে হল, কিছু একা ঘটেছে আর সঙ্গে সঙ্গে সে দু’ পা পিছিয়ে গেল।
রবিদার বাড়ি কি ওরা অ্যাটাক করেছিল। হতে পারে। অনুপম বিশ্বাসের আত্মীয় বলে হয়তো আক্রোশে রবিদাকেই মারধোর করেছে। অবশ্য রবিদা এখানকার নানান ব্যাপারে টাকা খরচ করে। খুবই জনপ্রিয়, নির্বিরোধ, আমুদে। কিন্তু মানুষকে তো এখন বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। দুলোদা তাকে তো প্রায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে গেল।
