এখন সে অনুভব করতে পারল।
আটজন নাকি মঠেই মারা গেছে। কথাটা সে দশ—বারোবার শুনেছে। তাঁবুর গেট আর জানলাগুলো বন্ধ করে কে চেঁচিয়ে বলেছিল, ”চুপচাপ সবাই বসে থাক।… ডেডবডি এনে শুইয়ে রেখেছে সামনের লনে। জানলা ফাঁক করে দেখার চেষ্টা করিসনি।”
অন্ধকার তাঁবুর মধ্যে গিসগিসে ভিড়। আর একজন চাপা গলায় বলেছিল, ”পাপ। পাপের ভারে পূর্ণ হয়ে গেছে সারথির পথ। তাই চাকা বসে গেল।”
কেউ সেই কথার প্রতিবাদ বা সমর্থন করেনি। শুধু সরল তার পাশ থেকে বলেছিল, ”মাথার চুল না কামিয়ে কি জায়গাটা সেলাই করা যায় না?”
”তা কী করে হয়! যে ভাবে রক্ত বেরোচ্ছিল, তাতে কম করে বারো—চোদ্দোটা স্টিচ তো তোর লাগবেই।” প্রকাশ বলল।
”সরল, তোর বিয়েটা কবে?’ আর—একজনের প্রশ্ন।
”আঠারো দিন বাকি।”
”তদ্দিনে চুল গজিয়ে যাবে, আর তা নইলে কামানো জায়গাটায় চুল লাগিয়ে নিবি।”
অনুপম দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ চেপে দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে বসে ছিল। কেউ তার সঙ্গে ইচ্ছে করেই কথা বলছে না, এটা সে বুঝতে পারছিল। সে জানে তার প্রতি কারও কোনও সহানুভূতি নেই। এই ঘটনায় বরং সবাই মনে মনে খুশিই হয়েছে এই ভেবে—অনুপম বিশ্বাস ফিনিশ হয়ে গেল। আর মাঠে ফেরা সম্ভব হবে না।
একটা অস্ফুট গোঙানি অনুপমের মুখ থেকে বেরিয়ে এল। খেজুর গাছে কপালটা ঘষার জন্য জ্বালা করছে। এখন তাকে পেছনে নয় সামনে তাকাতে হবে। জীবন এখন নিজের হাতে, এটা কোনও ভাবেই ভুললে চলবে না।
রাস্তায় উঠে সে হাঁটতে শুরু করল। বাঁ হাঁটু ভাঙতে পারছে না, অসাড় হয়ে গেছে। তাতে অসুবিধে বোধ করছে না। এখনও পর্যন্ত ওদের কারও সঙ্গে দেখা হয়নি।
চার বছর আগে ফাইনাল ম্যাচে তাকে মঞ্চে তোলার আগে, মাঠের চারধারে তাকে জোড় হাতে ঘুরতে হয়েছিল অন্তত হাজার পাঁচেক দর্শকের অভিনন্দন—উচ্ছ্বাস—হাততালিতে আপ্লুত হওয়ার জন্য। মনে হচ্ছিল, দুটো দলের ফাইনাল খেলা তো নয়, অনুপম বিশ্বাসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। গোপাল আর তার সাঙ্গোপাঙ্গদের কাকুতি মিনতিতে সে রাজি হয়ে গিয়েছিল।
রবিদাও বলেছিল, ”অনু যা, সব সারথিরই সাপোর্টার, তোর দারুণ ভক্ত। ওদের নিরাশ করিসনি। তোকে দেখার আশাতেই ওরা এসেছে। না গেলে তোকে অহঙ্কারী ভাববে।”
অতগুলো লোক তাকে চিনে রেখেছে। কিন্তু চার বছরে কি তার মুখটা বদলায়নি? বা চার বছরে কি ওদের স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসেনি?
সেও কি জনতার সেদিনের কোনও মুখ মনে করে রেখেছে? সবই তো এক রকম! গদগদ, কৃতার্থ, দাঁত বের করা, হাত বাড়িয়ে ছোঁয়ার চেষ্টা, অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য কলম আর খাতা এগিয়ে… আহহ, একটা মুখ মনে পড়ছে, একটা মুখ।
রুগণ, লম্বাটে মুখ, ফরসা রং। পাতাকাটা চুল কপালে ঝুলে ছিল। ড্যাবড্যাবে চোখের মণি দুটো ঘন কালো। বছর বারো বয়স হবে। ওরই বয়সি অনেকে অটোগ্রাফ নিচ্ছে দেখে বোধ হয় ইচ্ছে হয়েছিল। একটা হ্যান্ডবিল কুড়িয়ে এনে তার সাদা উলটো পিঠটা এগিয়ে ধরেছিল একটা পেনসিল হাতে নিয়ে। অনুপম তখন বিরক্ত হয়ে উঠেছিল সই দিতে দিতে। হ্যান্ডবিলটা দেখে তার মেজাজ রুক্ষ হয়ে উঠেছিল।
”আমার নাম জানো?”
ছেলেটি থতমত হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। গভীর, সরল, লাজুক চোখ।
”আমি কোন ক্লাবে খেলি জানো?”
ছেলেটির মুখে হাসি ফুটেছিল। ”আপনি অনুপম বিশ্বাস, সারথি সঙ্ঘে খেলেন।”
”কোন পজিশানে?”
ছেলেটির চোখে বিড়ম্বনা ফুটে উঠেছিল। আমতা আমতা করছে, তখন দুষ্টুমি করেই একজন ফিসফিসিয়ে ছেলেটিকে বলেছিল, ”বল, গোলে খেলেন।” সঙ্গে সঙ্গে ও বলে ওঠে, ”আপনি তো গোলকিপার।”
হোহো করে তাকে ঘিরে থাকা ভিড়টা হেসে উঠেছিল আর অনুপমের সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠেছিল। তাকে চেনে না এই বয়সি একটা ছেলে? তা হলে তার কীসের নাম, কীসের খ্যাতি! এতগুলো হাসি যেন তাকেই বিদ্রূপ করে উঠল।
হ্যান্ডবিলটা মুঠোয় দলা করে পাকিয়ে ছেলেটির কপালে সে ছুড়ে মেরে বলেছিল, ”আমি কে, সেটা আগে জেনে এসো, তারপর সই নিয়ো…. অটোগ্রাফ বুকে, এ রকম বাজে কাগজে নয়।”
ড্যাবড্যাবে চোখের সেই অপ্রতিভ চাহনিটা টিভি রিপ্লের মতো অনুপমের স্মৃতিতে ফিরে এল মন্থর গতিতে। ছেলেটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সই নেওয়ার জন্য জায়গা করে দু—তিনজন এগিয়ে এসেছে। চোখের কোণ দিয়ে সে দেখেছিল, পায়ে পায়ে ছেলেটি ভিড়ের বাইরে চলে গেল। গোপালরা তাকে ভিড় থেকে উদ্ধার করে মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় ছেলেটি তার মুখোমুখি পড়ে যায়। তাকে দেখে রুগণ মুখটায় লাজুক হাসি ফুটিয়ে ও অদ্ভুত চাহনিতে তাকিয়ে থাকে।
জীবনে প্রথমবার অপমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার বিস্ময়ই কি ছেলেটির চাহনিতে ছিল? অবাক হয়ে দেখছিল কি অভব্যতা, দাম্ভিকতার প্রতিমূর্তিকে?
চার বছরে এখন ছেলেটি কিশোর। এতদিনে সে কি জেনেছে অনুপম বিশ্বাস কে?
ঝাঁঝি আর কচুরিপানা পুকুর থেকে তুলে পাড়ে রাখা হয়েছে। সেগুলো থেকেই আঁশটে সোঁদা গন্ধটা আসছে। তাঁবুর মধ্যে দরজা—জানলা বন্ধ অবস্থায় এইরকম একটা গন্ধ তার লেগেছিল। অতগুলো মানুষের শ্বাস—প্রশ্বাস আর ঘাম থেকে, তাঁবুর ওপর এসে পড়া ইট কাঠ, লোহার টুকরো থেকে, ভয়ার্ত ফিসফাস আর বাইরে থেকে আসা বীভৎস চিৎকার আর গালিগালাজ থেকে একটা আবহাওয়া তৈরি হয়ে উঠেছিল, যার মধ্যে অনুপম এই পুকুরপাড়ের গন্ধটা পেয়েছিল।
