”কে, কে, কে রে?”
অনুপম ছুটল। হাঁটুর যন্ত্রণা ভুলে সে প্রায় পঞ্চাশ—ষাট গজ ছুটে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাস্তাটা এখান থেকে দু’ভাগ হয়ে দু’দিকে গেছে। সে বুঝতে পারছে না কোনটা ধরে এগোলে রবিদার বাড়ি পৌঁছনো যাবে।
অন্য দিন, অন্য সময় হলে সে রাস্তার লোককে কি কোনও বাড়ির লোককে ডেকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিত। এখন ওসব ভাবাই যায় না। বাঁ পা তুলে ডান পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে সে শ্রবণশক্তি তীক্ষ্ন করল।
কুকুর ডাকছে না। মানুষের গলাও শোনা যাচ্ছে না। আবার সব আগের মতোই নিস্তব্ধ। অনুপমের বুকের মধ্যে ছমছম করে উঠল। বলটা স্পটে বসিয়ে কিক নেওয়ার জন্য যখন পিছিয়ে যাচ্ছিল, সারা মাঠ তখন এইরকম নিশ্বাস বন্ধ করা শব্দহীনতার মধ্যে ডুবে ছিল।
এখন তার দরকার যা হোক কোনও শব্দ। অনুপমের মনে হল ডানদিকের রাস্তাটাতেই রবিদার বাড়ি। কেন যে মনে হল, তার কোনও ব্যাখ্যা সে দিতে পারবে না। এই রকম অনুভূতির জন্যই সে অনেক বার এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে বল পেয়েছে, যেখানে বল আসার কোনও সম্ভাবনা তখন ছিল না। সবাই বলে, তার সিক্সথ সেন্স নাকি খুব তীক্ষ্ন। দারুণ ভাবে কাজ করে। করে বলেই আজ সে প্রাণ নিয়ে এখনও টিকে রয়েছে।
লোহার রডটা কোমরেই লাগত যদি না ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে সে তিন—চার পাক গড়িয়ে যেত। তারপর লাফিয়ে উঠে সে তাঁবুর দিকে ছোটে। তিরিশ—চল্লিশ গজ মাত্র। দু’দিক থেকে জনতা ছুটে আসছে, কয়েকজন মাত্র পুলিশ লাঠি তুলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। অনুপম তাঁবুর মধ্যে পৌঁছে যেতে পেরেছিল।
কী ভাবে যে তাঁবুটা রক্ষা পেল, সে এখনও বুঝতে পারছে না। অন্য কোনও ফুটবলারকে ওরা মারধোর করার খুব বেশি সুযোগ পায়নি। সরল আর অপূর্বর মাথা থেকে রক্ত ঝরছিল। পুলকেশ চিত হয়ে কাতরাচ্ছিল, বোধ হয় পাঁজরের হাড় ভেঙেছে। রঞ্জনের বাঁ চোখটা বন্ধ হয়ে গেছে, থু—থু করে রক্ত ফেলছিল মুখ থেকে।
তাঁবুর কোলাপসিবল গেটটা বন্ধ করে দেওয়ার মুহূর্তে ছোটখাটো চেহারার একটা লোক ছুটে এসে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে তাঁবুতে ঢুকে পড়েছিল। পরে সে ড্রেসিংরুমের কোণে আধো—অন্ধকারে বসে থাকা অনুপমের কাছে গিয়ে মুখের কাছে মুখ এনে, পানের ছোপ ধরা দাঁতগুলো দেখিয়ে বলেছিল, ”অনু, তোর উত্থান আমি দেখেছি, এখন পতনটাও খুব কাছ থেকে দেখব বলে ঢুকে পড়েছি।”
অনুপম তখন বোবা চোখে শুধু তাকিয়ে থেকেছিল প্রভাতী সংবাদের স্টাফ রিপোর্টার, পাঁচ ফুট দু’ ইঞ্চি, বাহান্ন কেজি, আটত্রিশ বছর বয়সি সুপ্রিয় গুপ্তর দিকে।
”তোর একটা ফাইনাল ইন্টারভিউ নেব… অনু না বলিস না, তোর দেওয়া অপমানগুলো আমি এখন ভুলে যেতে রাজি… জাস্ট ওয়ান ইন্টারভিউ, হার্ট টু হার্ট টক….”
”সামনে থেকে সরে যাও সুপ্রিয়দা। তোমার মুখ দেখতে ইচ্ছে করছে না।” অনুপম চাপা স্বরে চোয়াল চেপে বলেছিল।
”আমাকে সরিয়ে দিতে তুই পারিস, কিন্তু আমি কি তোকে সরিয়ে দিতে পারব আমার মন থেকে? তুই যতক্ষণ থাকবি, যেখানে থাকবি, আমিও সেখানে—”
কে? কে যেন আসছে? অনুপম শক্ত হয়ে গেল। একজন, না কয়েকজন? তার বুকের মধ্যে আবার টাই ব্রেকার কিক নেওয়ার আগের মুহূর্তটা ফিরে এল। যতজনই হোক অন্ধকার পথে কেউ কাউকে দেখলেই বলবে, ”কে?” পরিচয় নিতে চাইবে। তখন সে কী বলবে? রবিদার নাম করে বলবে তার বাড়িতে যাচ্ছি! তাইতে বাড়ির রাস্তা বাতলে দিয়ে চলে যেতে পারে কিংবা আরও কৌতূহলী হয়ে টর্চ জ্বেলে কিংবা সিগারেট ধরাবার ছলে দেশলাই জ্বেলে তার মুখটা দেখে!…. যদি দেখেই ভ্রূ কোঁচকায়? তারপর হনহন করে অন্ধকারে ছুটতে ছুটতে যদি চেঁচায়। ”ওরে অনুপম বিশ্বাস, আমাদের তেঁতুলতলায় অনুপম বিশ্বাস… তোরা শিগগির বেরিয়ে আয়, পালিয়ে যাবে। ধর ওকে, লাশ ফেলে দে।”
রডটা পায়ে লাগার আগে সে শুনতে পেয়েছিল—”শেষ করে দে। টাকা হাতে না পেলে বাবু পায়ে বল ছোঁবে না।” বিদ্রূপে মোচড়ানো স্বরে কুৎসিত নোংরা গালাগালিতে আরও বলেছিল, ”বছর বছর প্যাঁচ কষে টাকাই শুধু বাড়িয়েছিস। ট্রোফি আর আনতে পারিসনি।”
দুলোদার কথাটা মনে পড়ল—”সাবধান, সাবধান। … এখন তোর জীবন তোর হাতে। সারথির সাপোর্টার সর্বত্র রয়েছে।”
অনুপম বাঁ দিকে দুটো খেজুর গাছ দেখতে পেল। ঘেঁষাঘেঁষি করে একটা মোটা থামের মতো হয়ে দাঁড়িয়ে। সে গাছ দুটোর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
দুটো ছায়ামূর্তি আসছে। আকার দেখে সে বুঝল ওদের একজন নেহাতই অল্পবয়সি।
”বলিস কী, ছোটমামা রেডিয়োটা আছড়ে ভেঙে ফেলল?”
”হ্যাঁ বাবা বলল, ঘুষ খেয়েছে। টাকা খেয়ে ইচ্ছে করে পেনালটি মিস করল।…গুলি করে মারা উচিত। ক্লাবের মধ্যে পলিটিক্স করবে, প্লেয়ারদের নিয়ে জোট বেঁধে…”
অনুপমের পাঁচ—ছ’ হাত সামনে দিয়ে ওরা চলে গেল। ছেলেটার বয়স কতই বা, নয় কি দশ। যা শুনেছে তাই বলল। এইসব শুনতে শুনতে বড় হবে, বিশ্বাসও করবে, অনুপম ঘুষ নিয়ে খেলত।
বুকের মধ্যে হঠাৎই একটা বিশাল কালো গহ্বর তৈরি হয়ে গেল বলে তার মনে হল। কিছুদিন আগে কাগজে পড়েছিল, আমেরিকার বিজ্ঞানীরা বলেছেন, মিল্কি ওয়েতে পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা সূর্যের থেকে দশ লক্ষ বড় ব্ল্যাক হোল পেয়েছেন। সেটা নাকি প্রতি পাঁচ থেকে দশ হাজার বছরে একটা করে নক্ষত্র গিলে ফেলছে। পড়ার সে কল্পনা করতে চেয়েছিল বিশাল একটা অন্ধকার গহ্বরকে। কিন্তু পারেনি। সূর্যটা যে কত বড়, পৃথিবী থেকে চোখে দেখে কোনও ধারণা পাওয়া যায় না। কিলোমিটার আর মাইলে গড়া ব্যাসার্ধ বা পরিধির কথা বলেও কিছু আন্দাজ হয় না। সূর্যের দশ লক্ষ গুণ যে কত বড় হতে পারে, সে কিছুই ধারণায় আনতে পারেনি।
