চার বছর আগের কথা। সত্যিই লিগ চ্যাম্পিয়ান হয়েছিল সারথি। তারপর আর হয়নি। কিন্তু প্রতি সিজনের শুরুতেই অনুপম বলে গেছে, চ্যাম্পিয়ান করাব। প্রতি সিজনে সে টাকার দাবি বাড়িয়েছে এবং আদায়ও করেছে, কিন্তু বড় ট্রফি এনে দিতে পারেনি। সমর্থকরা প্রথমে বিস্মিত হয়েছে, তারপর বিরক্ত। এখন হাসাহাসি করে।
গোপালও কি এখন তাকে দেখে হাসবে? আজ আটটা বডি টেন্টের লনে রেখেছিল। এটা নিয়ে হাসাহাসি হবে? রডটা চালিয়েছিল তার কোমর ভেঙে দেওয়ার জন্য, ভাগ্যক্রমে লাগেনি। ভেঙে গেলে কি হাসাহাসি হত? পঙ্গু অনুপম বিশ্বাসকে কেউ কি মনে রেখে দেবে?
রাস্তা দিয়ে একটা সাইকেল এগিয়ে আসছে। অনুপম শক্ত হয়ে গেল। তাকে দেখতে পেয়ে যদি লোকটা কাছে আসে? এখানকার লোক নয় অথচ অন্ধকারে নির্জনে বসে রয়েছে। চোর, ডাকাত, ছিনতাইবাজ ভেবে চেঁচামেচি করে যদি লোক জড়ো করে।
”কে রে, পাগলা নাকি?”
লোকটা সাইকেল না থামিয়েই কথাটা বলে গেল। পেছনের কেরিয়ারে একটা বস্তা। অনুপম সাড়াশব্দ দিল না।
আর বসে থাকা ঠিক নয়। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটলেই মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে, কিন্তু পথে যদি ওদের কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যায়? অন্ধকারে নিশ্চয় তাকে চিনতে পারবে না। কিন্তু সঙ্গে যদি টর্চ থাকে? মফস্বলে, গ্রামে রাতে টর্চ ছাড়া মানুষ বেরোয় না। বিদ্যুৎপুরে সন্ধেবেলা কেউ বেরোলেই বাবা মনে করিয়ে যেন, ”সঙ্গে টর্চ নিয়েছিস তো, পথে যা সাপখোপ।”
সাপ! অনুপম সরু রাস্তাটায় নামতে নামতে থমকে গেল। কিন্তু এই অন্ধকারে সে দেখবে কী করে। শব্দ করলে ওরা ভয়ে সরে যায়, কিন্তু ওরা তো শুনতে পায় না। পা দিয়ে জমিতে ধপধপ করে চললে মাটিতে যে কম্পন হয় সেটা ওরা অনুভব করে সরে যায়। বাবাই একদিন বুঝিয়ে বলেছিলেন। তবে এখনও শীত যায়নি, ওরা এখনও গর্তের মধ্যেই রয়েছে।
কিন্তু অন্য ওরা?
তারা যদি ধপধপ শুনে এগিয়ে আসে। মুখে টর্চের আলো ফেলে। যদি চিনতে পারে!
দুলোদা বলে গেল, ”সাবধান, খুব সাবধান।”
রবিদা বলেছিল, ”তারপর দ্যাখ, এই গোপাল আর ওর মতো কয়েকটা সারথি—পাগল ছেলে কী করতে পারে।”
কী পারে? পিটিয়ে মানুষ মারতে কি পারবে? কী খাতির—যত্নই না গোপালরা করেছিল। ভৃত্যের মতো ক্রীতদাসের মতো পেছন পেছন ঘুরছিল তার কী দরকার জানার জন্য। ওরা চোখের চাউনি দিয়ে সারাক্ষণ তাকে পুজো পাঠিয়ে গেছে। চার বছরেই কি ওরা বদলে যাবে? ওদের ভক্তি, ভালবাসা কি এতই ঠুনকো? কিন্তু দুলোদা তো কয়েক ঘণ্টাতেই বদলে গেল। বড় ভাল লাগত এদের স্তুতি, এদের মুগ্ধতা, এগুলোকে সে সত্যি বলে, স্থায়ী বলেই ধরে নিয়েছিল।
পা ঘষটে অনুপম এগোতে লাগল রাস্তার দিকে চোখ রেখে। দু’পাশে বাড়ি। জানলাগুলোও বন্ধ। কোনও বাড়ি পাঁচিল ঘেরা, কোনওটায় বাইরের দালানে লোহার গ্রিল। তিনতলা পুরনো বাড়িও আছে কয়েকটা। টালির চালের বাড়িটার পরই একটা ডোবা।
কাছে এবং দূরের থেকে একই রবীন্দ্রসঙ্গীত ভেসে আসছে। রেডিয়োয় গাইছে কোনও মেয়ে। এই গান বাদে সারা বিশ্বচরাচর অনুপমের কাছে শব্দহীন মনে হচ্ছে। কলকাতার বিকট আওয়াজের মধ্যে বাস করার জন্য তার স্নায়ু যে চড়া সুরে বাঁধা হয়ে পড়েছে তাতে মফস্বলের রাতের এই নৈঃশব্দ্য তাকে খুব জোরে আঘাত করল। তার শরীরে ক্লান্তি নেমে এল এবং সঙ্গে সঙ্গে সে অভ্যাসবশেই ভীত হয়ে উঠল। ম্যাচ শেষ হতে অনেক সময় বাকি, এখনই টায়ার্ড হয়ে গেলে চলবে না। তাকে পালাতে হবে, সারথির লোকেদের, ভক্তদের, অনুগতদের হাত থেকে বাঁচতে হলে এখন কোথাও লুকিয়ে থাকতে হবে।
তেঁতুলতলায় আসাটাই ভুল হয়েছে। কেন যে সেই দিশাহারা, তুলকালাম, নারকীয় পরিস্থিতির মধ্যে তার রবিদাকেই মনে পড়ল! ঠাণ্ডা, নরম, স্নেহশীল। ওর কাছে সাহায্য চাইলে প্রত্যাখ্যান করবে না, এই ধারণাটা তার মধ্যে কী ভাবে তখন যে এল, অনুপম তা ভেবে পেল না।
সে তো বিদ্যুৎপুরেও বাবা—মা দাদার কাছে চলে যেতে পারত। কিন্তু ষাট—পঁয়ষট্টি মাইল দূরে কে তাকে এক রাতে গাড়ি করে পৌঁছে দিত? দুলোদা দশ—বারো মাইল পর্যন্ত যে এসেছে, আজকের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এটাই অদ্ভুত ব্যাপার। হয়তো কৃতজ্ঞতা বোধের ছিটেফোঁটা এখনও ওর মধ্যে রয়েছে। সারথির একজিকিউটিভ কমিটিতে ওকে ঢোকাবার জন্য শেষ পর্যন্ত অনুপমকে ভোট জোগাড়ে নামতে হয়েছিল।
বাঁ দিকে টানা একটা নিচু পাঁচিল। বাড়িটার বাইরের দালানে একটা টিভি সেট। অনেকগুলো মানুষ। বাড়ির লোক ছাড়াও বাইরের লোকও বোধ হয় রয়েছে। হিন্দি কোনও সিরিয়াল হয়তো। দালানের আলো নেভানো কিন্তু ভেতরের ঘরের আলো জ্বলছে। চেয়ারে দু—তিনজন, বাকিরা মেঝেয় বসে। অনুপম মাথা নামিয়ে কুঁজো হয়ে এগোল।
পাঁচিলের মাঝে একটা ফাঁকা জায়গা। লোহার গেট। ওর সামনে দিয়ে তাকে যেতে হবে। অনুপম থমকে গিয়ে ভাবল, দালান থেকে কেউ কি দেখে ফেলতে পারে?
মাথাটা তুলে দূরত্ব আর অন্ধকার সম্পর্কে একটা আন্দাজ করে নিয়ে সে স্বাভাবিক হেঁটে ছ—সাত হাত চওড়া গেটের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হোঁচট খেল।
”আহহ।” হাঁটুতে ধাক্কাটা পেয়ে অনুপমের মুখ থেকে একটু জোরেই কাতরানিটা বেরিয়ে এল। পাঁচিলের ওধার থেকে ডেকে উঠল একটা কুকুর।
