অপ্রতিভ রবিদা যুবক দুটির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিয়ে কুণ্ঠিত স্বরে বলে, ”আমি তো এদের বলেছি তোকে নিয়ে যাব। হ্যাঁরে দু—চার মিনিটের জন্যও কি সময় করতে পারবি না? তুই না গেলে আমার তো—”
মাথা কাটা যাবে! অনুপম তখন মনে মনে রেগে উঠেছিল। এরা সব ভাবে কী! ধরেই নিয়েছে যেন, অনুপম বিশ্বাস ফুটবল খেলে এত নাম এত সম্মান পেয়েছে এদেরই অনুগ্রহে, তাই যখন খুশি ওকে ডাকলেই যেতে হবে।
আর এই রবিদা। তার নিজের দাদা নয়, দূর সম্পর্কের মামার ছেলে। বিদ্যুৎপুরে তাদের বাড়িতে থেকেই মানুষ। লেখাপড়া স্কুল ফাইনাল পাশ, তবে অসম্ভব পরিশ্রমী আর উদ্যোগী। অল্প বয়স থেকেই খুচখাচ ব্যবসা করত। বছর দশেক আগে তেঁতুলতলায় দোতলা বাড়ি করেছে, এখানেই শ্বশুরবাড়ি। এখন আলুর বড় ব্যবসায়ী, কোল্ড স্টোরেজের অংশীদার, সার আর বীজের দোকান আছে। নিঃসন্তান।
রবিদা ভাল ফুটবল খেলত। অনুপমের শিশু বয়সে তরুণ রবিদাই ছিল তার হিরো। তার ফুটবলকে ভালবাসার প্রথম শিখাটি জ্বালিয়ে দিয়েছিল যে রবিদাই—এটা অনুপম মনে মনে স্বীকার করে।
এক সময় বাড়িতে তার ফুটবল খেলা নিয়ে ঘোরতর আপত্তি উঠেছিল, যখন সে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল করল। তখন রবিদা যদি না….
”ঠিক আছে, যাব।” অনুপম তার গাম্ভীর্য সরিয়ে হালকা চালে বলেছিল। রবিদার মুখ চোখে ঔজ্জ্বল্যের দপ করে নিভে যাওয়াটা তার মনে খচখচ শুরু করে দিয়েছিল। ব্যাপারটা হালকা করার জন্য সে তখন বলেছিল, ”কিন্তু রবিদা, আমি দুপুরে বউদির রান্না খাব। ঠিক এক বিঘত লম্বা কই মাছের ঝাল আর পোস্তর বড়া রাঁধতে বলবে।”
রবিদার মুখে আবার ফিরে এসেছিল আমুদে উচ্ছলতা। যুবক দুটির সামনে সে নানা ভাবে দেখাবার চেষ্টা করল—তোমাদের এই হিরো অনুপম বিশ্বাস আমার খুব অনুগত ভাই। আমায় খুব মান্য করে। অনুপম স্মিত হেসে রবিদার সব কথাই মেনে নেয়।
ওরা চলে যাওয়ার পর তার মনে হয়েছিল, সে যেন অনেক বদলে গেছে। কেমন যেন এক ধরনের দাম্ভিকতা, পায়াভারী ভাব তার মধ্যে আসতে শুরু করেছে যেটা মাঝে মাঝে তাচ্ছিল্য দেখানো ঔদ্ধত্যের মতো তার নিজের কাছেই মনে হয়েছে। অনুপম তখন জানত না একদিন অবস্থার ফেরে পড়ে, ঘটনাচক্রে তাকে এই রবিদার বাড়ি খুঁজে বের করার জন্য রাত্রির অন্ধকারে পথ হাতড়াতে হবে।
অশ্বত্থ গাছের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া সরু রাস্তাটার দিকে অনুপম তাকাল। একটা সুড়ঙ্গের মতো দেখাচ্ছে। চার বছর আগে এখানেই সে মোটর গাড়ি থেকে নেমেছিল। রবিদার সঙ্গে যে দু’জন যুবক তার ব্যাঙ্কে গেছল তাদেরই একজন, গোপাল নাম ছিল, তাকে বেলেঘাটা থেকে মোটরে নিয়ে এসেছিল।
অনুপম মোটর থেকে নেমে বলেছিল, ”এখান থেকে কতটা হাঁটতে হবে?”
গোপাল বিব্রত হয়ে বলেছিল, ”মিনিট—তিনেকের পথ, আপনি একটু দাঁড়ান, আমি মোড় থেকে একটা রিকশা নিয়ে আসি।”
”আরে না, না। তিন—চার মিনিট হাঁটলে আমার পা খুলে পড়বে না। অতটা অথর্ব এখনও হইনি।”
মাত্র চার বছরের মধ্যে কথাগুলো কেমন বুমেরাং হয়ে ফিরে এল। এখন গোপাল যদি অন্ধকার ফুঁড়ে তার সামনে এসে হাজির হয়!
অশ্বত্থ তলার বাঁধানো জায়গাটায় বাঁ পা—কে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য বসে অনুপম দ্বিধান্বিত মনে ভাবল, তা হলে কি সে বেঁচে যাবে? গোপাল যে তার অন্ধ ভক্ত সেটা বুঝে নিতে তার তিরিশ সেকেন্ডও লাগেনি। ওর চোখ মুখই বলে দেয়, অনুপম আর সারথি সঙ্ঘকে সে পুজো করে। সেদিন সারাক্ষণ গোপাল ছায়ার মতো তার সঙ্গে সঙ্গে ফিরেছে। অন্য ভক্তদের কাছে আসতে না দিয়ে আগলে রেখেছিল, যেন অনুপম একা তারই সম্পত্তি।
আগের দিন বিকেলে পুকুরে জাল ফেলিয়ে এক বিঘত লম্বা কই পাওয়া যায়নি, গোপাল কলকাতায় এসে তিন—চারটে বাজার ঘুরে নাকি এক বিঘতের কাছাকাছি মাপের কই মাছ কিনে রাত সাড়ে দশটার ট্রেনে ফিরেছিল। দুপুরে খাওয়ার সময় অনুপম মাছ দেখে বলেছিল, ”ইস, কত বড়! যদি আজ না আসতাম তা হলে তো জীবনের একটা বিরাট আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতাম। রবিদা, তোমার পুকুরে এত বড় কই আছে জানলে তো আমি হপ্তায় দু’বার করে আসতাম।”
রবিদা আঙুল তুলে দরজার কাছে দাঁড়ানো গোপালকে দেখিয়ে বলেছিল, ”ওর জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে। বুঝলি অনু, আমাদের এই অঞ্চলটাই সারথির সাপোর্টার। তোর কী দরকার সেটা শুধু একবার বলবি। তারপর দ্যাখ এই গোপাল আর ওর মতো কয়েকটা সারথি—পাগল ছেলে কী করতে পারে। এখানকার পুজো প্যান্ডেলের শামিয়ানার কাপড়ে, সাইনবোর্ডে, পরদায়, ঘুড়িতে, সব ব্যাপারেই সারথির ফ্ল্যাগের কলাপাতা আর গাঁদাফুল রং তুই পাবি। এখানে কার্ড হোল্ডার মেম্বার কত আছে জানিস? অন্তত এগারোজন শুধু তেঁতুলতলাতেই।”
”তেরোজন!” গোপাল রবিদার ভুলটা শুধরে দিয়েছিল।
”সারথি পয়েন্ট লস করলে বা হারলে এখানে বহু বাড়িতেই অরন্ধনের উপবাস চলে। গত বছর লিগে যুগের যাত্রীর কাছে হারের পর শক্তিপ্রসাদ বলে একটা ছেলে এগারো দিন না খেয়ে ছিল।”
”কিন্তু আমরাই শেষপর্যন্ত লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।” অনুপম বলেছিল।
”এবারেও হব তো?” গোপাল তার ব্যাকুলতা গোপন না রেখেই ব্যগ্র স্বরে জানতে চেয়েছিল।
”নিশ্চয়ই। আমি তো সিজনের শুরুতেই বলেছিলাম, এবারও সারথিকে চ্যাম্পিয়ন করাব।”
