অনুপম সন্তর্পণে বাঁ পা ফেলল। লোহার রডটা পেছন থেকে চালিয়েছিল, বোধ হয় কোমর লক্ষ্য করে। ঠিক সেই সময় কে যেন ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। রডটা হাঁটুর পেছনে লেগে পিছলে গেলেও চোটটা দিয়ে গেছে।
পায়ে ভর রেখেই সে ‘আহহ’ বলে চোয়াল শক্ত করে ফেলল। সতেরো বছর বয়সে ময়দানে সেকেন্ড ডিভিশনে সে খেলতে এসেছিল। দুটো পা এগোরো বছর ধরে কম চোট তো পায়নি! জখম হওয়ার অভ্যাস তার আছে। এক পা হেঁটেই সে বুঝতে পারল হাড়ে লেগেছে। এখন দরকার গরম জল ঠাণ্ডা বরফ জল আর বিশ্রাম। হাঁটাচলা একদম না করা। রবিদার বাড়িতে রেফ্রিজারেটার আছে, এত রাতে বরফও পাওয়া যাবে।
মা হলে বলতেন, ”রাখ তোর ঠাণ্ডা—গরম জল, চুন—হলুদ করে দিচ্ছি, লাগা। এই লাগিয়েই তো এত বড়টা হলি।”
তাদের বিদ্যুৎপুরের বাড়িতে অনুপম গত বছর বাবা—মায়ের জন্য টিভি সেট কিনে দিয়ে এসেছে। বাবা ফুটবলের ভক্ত, মা নন। বড়দা দেবোপম স্কুল শিক্ষক। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্কুল ও কোচিং নিয়েই ব্যস্ত। টিভি দেখার সময়ই পায় না। ছেলে—মেয়েদের দেখতে দেয় না লেখাপড়ার ক্ষতি হবে বলে।
আজকের খেলা বাড়ির কেউ কি দেখেছে? বাবা নিশ্চয়, ভাইপোরাও, মা—ও হয়তো মাঝে মাঝে টিভির সামনে এসেছেন। খেলাশেষের ঘটনাগুলো কি দেখানো হয়েছে? নির্মম, বীভৎস পাশবিক দৃশ্য কি টিভিতে দেখাবে? কিন্তু টাই ব্রেকারের শেষ কিকটির নেওয়াটা ওরা নিশ্চয় দেখিয়েছে।
ডেম্পোর পঞ্চম কিকটা নিয়েছিল মিগুয়েল, রাজীব বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে বলটা পেয়ে যায়। ফল তখন ডেম্পোর পক্ষে ৪—৩। সারথির পঞ্চম কিকটা বাকি। একটা বিশাল টাইফুন মাঠের তিনদিকের গ্যালারির ওপর দিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল। অনুপমকে পেনাল্টি মারার জন্য এগিয়ে যেতে দেখেই সেটা স্তব্ধ হয়ে পড়ল। অবধারিত ৪—৪। তারপর সাডন ডেথ। কিন্তু তার আগে ৪—৪ তো হওয়া চাই। আর হবে নাই বা কেন? কিক নিচ্ছে তো অনুপম বিশ্বাস! টাইফুনের যদি প্রাণ থাকে তা হলে তখন সে নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছিল ডেম্পোর গোলের মধ্যে বল দেখার জন্য।
বাঁ পা টেনে টেনে অনুপম অন্ধকারের মধ্যে এগোচ্ছে। ঘড়িটা হাতে নেই, বোধ হয় পকেট থেকে কোথাও পড়ে গেছে। খালি গায়ে, কালো হাফ প্যান্টটা পরে, শর্ট আর ট্রাউজার্সটা পাকিয়ে বগলে নিয়ে তাঁবুর পেছন দিকের জানলা গলে অন্ধকারের মধ্যে মাটিতে নেমেছিল। হামাগুড়ি দিয়ে সে ক্যান্টিনের পেছনে কাঠের বেড়া পর্যন্ত যায়। বৃদ্ধ সহদেব মালি বেড়ার নীচের একটা তক্তা সরিয়ে বলেছিল, ”রাস্তার দিকে একদম যাবে না, অন্ধকার অন্ধকার মাঠ দিয়ে কেল্লার ওই কোনায় চলে গিয়ে চুপচাপ মাটিতে শুয়ে থাকবে। খারাপ লোকেরা এখন মাঠে ঘুরে বেড়ায়। দুলোবাবু গাড়ি নিয়ে আসবে, দেখতে পেলেই ছুটে গিয়ে উঠে পড়বে।… যাও, যাও, আর এ—মুখো হয়ো না। এত নামডাক, এতবড় পেলেয়ার…”
অনুপমের আর কিছু শোনার মতো মনের অবস্থা তখন ছিল না। কিন্তু এখন তার কানে সহদেবের কথাটা স্পষ্ট বেজে উঠল, ”যাও, যাও, আর এ—মুখো হয়ো না।” কয়েক পা গিয়েই সে আবার শুনল, ”যাও, যাও।” অনুপম বুঝতে পারছে না, ভয় না ঘৃণা, কী ছিল ওর স্বরে?
রাস্তাটা ধনুকের মতো বেঁকেছে। বাঁক ঘুরেই অনুপমের মনে হল কিছু দূরেই একটা বাজার আর মোড়। অনেকগুলো দোকানের সাইনবোর্ড সে দেখতে পাচ্ছে, তবে বেশিরভাগই বন্ধ। রাত দশটায় মফস্বলে দোকান খোলা রাখা নির্ভর করে লোক চলাচলের ওপর। একটা মিষ্টির দোকান, তার পাশে বিড়ি—সিগারেটের দোকান আর সেলাই মেশিনে ব্যস্ত এক দরজি শুধু দোকান খোলা রেখেছে দেখল। এই মোড় থেকে একটা রাস্তা স্টেশনে গেছে।
বাজারের আগে রাস্তার ডানদিকে অন্ধকারে যে একটা অশ্বত্থ গাছ রয়েছে, কাছাকাছি না আসা পর্যন্ত অনুপম তা বুঝতে পারেনি। গাছতলায় বাঁধানো গোল চত্বরটা ঠাহর হতেই সে স্বস্তির শ্বাস ফেলল।
এই তো রবিদার বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা।
.
চার বছর আগে রবিদা হঠাৎই এক দুপুরে তার ব্যাঙ্কে হাজির হয়েছিল দুটি যুবককে সঙ্গে নিয়ে।
‘কী ব্যাপার রবিদা!”
”অনু, তোকে জ্বালাতন করতে এলুম। কী করব বল, বিখ্যাত ভাইয়ের দাদা হওয়া যে কী দুর্ভোগের, এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। তুই আমাকে বাঁচা।”
”আমি বিখ্যাত? দুপুরবেলা এত পথ ঠেঙিয়ে ঠাট্টা করতে এলে?”
”যা সত্যি তাই বলেছি। সারা ভারতে এখন সেরা মিডফিল্ডার বলতে তো শুধু একজনই, অনুপম বিশ্বাস।”
কথাটা বলে রবিদা সঙ্গের যুবক দু’জনের দিকে তাকিয়েছিল। তারা বিগলিত হাসি দিয়ে জানিয়ে দেয়, সিদ্ধান্তটা তর্কাতীত।
”অনু, আমার ওখানে অনেকদিন তুই যাসনি। এগারোই, এই রোববারের পরের রোববার আয়।”
”কী ব্যাপার, কিছু আছে টাছে নাকি?”
”আমাদের মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যানের মায়ের নামে শিল্ড চালু হয়েছে, এই বছরই প্রথম, রোববার তাই ফাইনাল। এরা এসে ধরল আপনার ভাইকে প্রধান অতিথি করে দিতে হবে। কার্ডফার্ড সব ছাপিয়েও ফেলেছে।”
”অ্যাঁ, আমাকে জিজ্ঞেস না করেই?”
”কেন, তোর অনুমতি নিতে হবে নাকি আমার ওখানে যাওয়ার জন্য?” রবিদা তার স্বভাবসিদ্ধ হাসিখুশি ঢঙে কথাটা বলেছিল।
”আমার অসুবিধে থাকতে পারে তো ওই দিন। প্রতি রোববারই হয় সভাপতি নয়তো প্রধান অতিথি হওয়া…. অন্তত একমাস আগে আমায় না বললে…।” অনুপম গম্ভীর স্বরে ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে রবিবার মুখ থেকে আমুদে সজীবতাটা মুছে দিয়েছিল।
