গত তিন বছর সারথি গর্ব করে বলার মতো একটাও মেজর ট্রফি জেতেনি। ক্লাব—সমর্থকরা বুভুক্ষের মতো সারি দিয়ে আজ মাঠে এসেছিল। গোয়ার ডেম্পোর জয় চেয়ে ক’জন সমর্থক গ্যালারিতে ছিল? ছিল তো সব সারথিরই। .. পঁচিশ হাজার? তিরিশ হাজার? আর মাঠের বাইরে কত লক্ষ? … পাঁচ লাখ, দশ লাখ? রেডিয়ো রিলে হয়েছে, মাঠে টিভি—ক্যামেরাও ছিল। লাখ লাখ লোক শুনেছে, দেখেছে অনুপম বিশ্বাসের মুখ।
সে এই মুহূর্তে একটা ঘৃণ্য মানুষ। তাই বা কেন,…. একটা আততায়ী। একটা খুনির থেকে এখন তাকে কেউ অন্য কিছু ভাববে না।
এই দুলোদাও বোধ হয় ভাবছে না। নয়তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লোকটা এভাবে বদলে গেল কেন?
”অনুপম, আর আমি তোকে বয়ে বেড়াত পারব না, নাম।”
”কিন্তু দুলোদা, এখানে…”
”কিন্তু ফিন্তু নয়, কোথায় তেঁতুলতলা, কোথায় তোর রবিদা, এবার তুই খুঁজে বের কর।”
”চারদিক বড্ড অন্ধকার, কী করে বের করব? মনে হচ্ছে ছাড়িয়ে এসেছি।’
সামনে থেকে একটা যাত্রীবাহী বাস এসে ওদের পাশ দিয়েই বেরিয়ে গেল। রাস্তাটা গ্রামের মধ্য দিয়ে জেলার মহকুমা সদরে, অনেকগুলো গ্রামের মধ্য দিয়ে জেলার মহকুমা সদরে পৌঁছেছে। মিনিট দশেক হাঁটলে রেল স্টেশন। সেখান থেকে বাস ছাড়ে। এখানকার মানুষ ট্রেনে কলকাতা যাতায়াত করে। রাস্তার ধারে একতলা—দোতলা পাকা বাড়ির সঙ্গে টিনের বা খড়ের চাল দেওয়া কাঁচা মাটির কিছু বাড়িও আছে। মাঝে মাঝে পৌরসভার ইলেকট্রিক বাতির কাঠের থাম, কিন্তু বেশির ভাগেরই বালব নেই বা জ্বলছে না।
”নেমে খুঁজে দ্যাখ। আগে তো এখানে এসেছিস।’
”বছর চারেক আগে। মনে আছে একটা বড় অশ্বত্থ গাছের পাশ দিয়ে রাস্তাটা নেমে গেছে। সাইকেল রিকশা যায়। গাছের গোড়াটা বাঁধানো, একটা শিবের পাথর আর একটা ত্রিশূল আছে। পুজো হয়।”
”কই, তেমন তো কিছু চোখে পড়ল না, বোধ হয় আরও এগিয়ে হবে। নাম এখন, হেঁটে গিয়ে দ্যাখ।”
দুলোদা ড্যাশ বোর্ডের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল, ”ইসস, প্রায় দশটা বেজে গেল।”
অনুপম ইতস্তত করে বলল, ”হাঁটুতে রড মেরেছে, ব্যথা বড্ড। গাড়িটা আর একটু…”
”আরে হাঁটুফাটু একটু রাখ। ওদিকে আমার বাড়িতে আবার হুজ্জুতি ফুজ্জতি হল কি না কে জানে। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে আমাকে।”
”দুলোদা আর একটু যদি সামনে…”
”আবার সামনে কী? অনেক সামনেই তো তোকে এনে দিয়েছি। তার কোনও প্রতিদান তুই দিয়েছিস?”
দুলোদা হঠাৎ গলা চড়িয়ে উত্তেজিত থাপ্পড়টা স্টিয়ারিঙের ওপর কষাল। তার চোখে হতাশা, ক্ষোভ, ঘৃণা মিশে অদ্ভুত এক চাহনি তৈরি করেছে। ঠোঁটের কোণ মুচড়ে সে বলল, ”আজ অনেকগুলো প্রাণ তুই নিয়েছিস। নিরপরাধ মানুষ, তারা শুধু এসেছিল সারথির জিত দেখতে। তারা তোকে এতকাল মাথায় তুলে রেখেছিল, মনে মনে তোকে পুজো করত। যখনই ভাল খেলেছিস, ম্যাচ জিতিয়েছিস, ওরা তোকে কাঁধে তুলে দিত, যুগ যুগ জিয়ো বলত তোর নাম করে। আর তাদেরই তুই…।”
অনুপম একদৃষ্টে তার বাঁ হাতের আঙুলে চুনি বসানো আংটিটার দিকে তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বলল, ‘ক’জন মারা গেছে, জানো?”
”টেন্টের সামনের লনে আটটা বডি এনে রেখেছিল। তা ছাড়া মরো মরো অবস্থায় কতজনকে যে হাসপাতালে নিয়ে গেছে তা বলতে পারব না।”
দরজা খুলে অনুপম বাঁ পা জমিতে রেখে বেরোবার জন্য শরীরের ভর পায়ের ওপর দিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করেই কাতরে উঠল।
দুলোদা চোখটা কোঁচকাল মাত্র, কিন্তু সহানুভূতি জানাতে একটা শব্দও মুখ থেকে বের করল না।
দু’বারের চেষ্টায় অনুপম সোজা হয়ে দাঁড়াল।
”একটা কথা বলে রাখি তোকে। এখন তোর জীবন তোর হাতে। ইউ আর ইন রিয়েল ডেঞ্জার। তিরিশ বছর মাঠ করছি, কিন্তু মানুষকে এমন ভাবে খেপে যেতে কখনও দেখিনি। তোকে পেলে পিটিয়ে আজ শেষ করে দিত। সারা জীবন মনে রাখবি, এই দুলোদাকে, আজ তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আর এটাও মনে রাখবি, সারথির সাপোর্টার সর্বত্র রয়েছে, তাই সাবধান … খুব সাবধান, খুব সাবধান।”
দৈববাণীর মতো শেষের কথাগুলো বলতে বলতে দুলোদা স্টার্ট দিল এবং কোনও বিদায় সম্ভাষণ না জানিয়েই মারুতিকে একটু এগিয়ে নিয়ে রাস্তার চওড়া জায়গায় ঘুরিয়ে নিল।
চোখ—ঝলসানো দুটো হেডলাইট জ্বলা মারুতির মধ্যে একটা আবছা মাথা সাঁ করে অনুপমের চোখের সামনে দিয়ে কলকাতার দিকে চলে গেল। দুলালচাঁদ একবার মুখ ফিরিয়ে তাকালও না তার দিকে। রাস্তার দু’ধারের গাছগুলো আলোয় ভেসে উঠেই অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। মারুতির পেছনে লাল আলো দুটো অন্ধকারকে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে আলোর পেছন পেছন।
অনুপমের বুকের মধ্যে অজানা একটা ভয় গুড় গুড় করে উঠল। এইবার কি ওই দুটো রক্তচক্ষুর নজরে থাকা অন্ধকারের মধ্যে তাকে ঢুকতে হবে? তার কি আলোর দিন শেষ!
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। সকালে মিনিট পনেরোর বৃষ্টিতে শীত বিদায় নিতে নিতেও আজকের মতো থমকে গেছে। রাস্তায় লোক চলাচল করছে না। গাছের ফাঁক দিয়ে বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। অনুপমের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠল।
এখন তাকে তেঁতুলতলা খুঁজে বের করতেই হবে। সারারাত অন্ধকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে চলবে না, রবিদার বাড়ি তাকে পৌঁছতেই হবে, সেই অশ্বত্থ গাছ আর শিবের চত্বরটার হদিস আগে চাই।
