”ড্রেসিং রুমে একটা অদ্ভুত দৃশ্যের কথা না বললে ব্যাপারটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ম্যাচটা শেষ হবার পর যে উল্লাস প্রত্যাশিত ছিল, সেটা ফেটে পড়তে কিছুটা সময় নেয়। সারা স্টেডিয়াম এই অবিশ্বাস্য বোলিংয়ের ধাক্কায় বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। ভারত দলের প্রত্যেকের চোখে আমি জল দেখেছি। বহু দর্শকের চোখেও। কিন্তু অনন্ত ছিল ধীর, অচঞ্চল ও নম্র। সে পিচ থেকে একটু মাটি তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলে মাটিটুকু পকেটে রেখে দেয়। এই একটা সময়েই তার মুখে যেন কান্নার আভাস দেখেছিলাম। মাঠ ছাড়ার সময় ও আমাকে বলল, ”সার, আপনাকে ধন্যবাদ, আমাকে আজ সুযোগ দেবার জন্য।” আমি অবশ্য খুব গম্ভীর থাকার চেষ্টা করে বলি, ”আর কখনও মিথ্যে কথা বলবে না।” আর মনে মনে বলি, অনন্ত নিঃসন্দেহে তুমি চরিত্রবান। তা না হলে এভাবে জ্বলে উঠতে পারতে না। আমার ক্রিকেট—জীবনের অস্তবেলায় যে সম্মান তুমি উপহার দিলে, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকব আমরণ। এই ম্যাচ যে জিতব, আমি মাঠে নামার সময়ও তা ভাবিনি।
”তারপর ড্রেসিংরুমে সেই দৃশ্য। আনোখা একসময় টানতে টানতে এক যুবককে নিয়ে এল, যার ডান হাতটা কবজির কাছ থেকে কাটা। সে চুপচাপ বসেছিল কোথায় যেন। অনন্তরই বন্ধু। আনোখা চেঁচিয়ে বলল, ”এই হচ্ছে যত নষ্টের গোড়া। অনন্তকে আজ ওই খেপিয়ে দিয়েছে। এরপর অনন্ত আর তার বন্ধু বাংলায় কথা বলতে লাগল। যেহেতু আমি বাংলা ভাষাটা জানি না, তাই আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় ওরা কী বলছিল।”
.
”অন্তু আমার হাতটা এবার ফেরত দে, লাগিয়ে দে।”
.
”দোব না। তা হলেই তুই ওটা দিয়ে আমায় তো মারবি।…মারবি না বল?”
”মারব না।”
অনন্ত নিজের ডান হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ”এই নে তোর হাত।”
ফেরারি
ফেরারি – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
”আজ যা কিছু হল, সব তোরই জন্য।”
ধীর, ফিসফিস স্বরে মোটরচালক কথাগুলো বলল। তার পাশে বসা যুবকটি সামনে তাকিয়ে চুপ করে রইল। এই ভাবে সে গত আধ ঘণ্টারও বেশি বসে আছে।
”কী ভুল যে তুই করলি।”
সামনে থেকে হু হু করে ভারী ট্রাক আসছে হেডলাইট জ্বালিয়ে। তার ধাঁধানো আলো থেকে চোখ বাঁচাবার জন্য মোটরটা বাঁ দিকে সরিয়ে মন্থর করে চালক বলল, ”কোথায় নামাব?”
যুবকটি এতক্ষণ যেন গভীর কোনও ভাবনার মধ্যে ডুবে ছিল। চটকা ভেঙে জানলা দিয়ে বিভ্রান্তের মতো তাকাল। দু’পাশে বড় বড় গাছ। সরু শাখাপথ তৈরি করেছে ছোট ছোট মোড়। দোকান। বেড়া বা পাঁচিল দেওয়া একতলা পাকা বাড়ি, পুকুর, সবজি বাগান, ধানখেত। অন্ধকার পিচের রাস্তায় মাঝে মাঝে টিমটিমে বাতি। বাড়ির আলো দূরে দূরে।
”ঠিক বুঝতে পারছি না” যুবক আমতা আমতা করে বলল, ”সামনের দোকানটায় একটু জিজ্ঞেস করে—”
”একদম নয়।” চাপা তীক্ষ্ন স্বরে মোটরচালক ধমকে উঠল। ”তোর মুখ যেন কেউ না দেখতে পায়। কলকাতা থেকে মাত্র বারো—চোদ্দো মাইল, এখানকার সব লোকই নিশ্চয় ইতিমধ্যে ঘটনা জেনে গেছে। এসব অঞ্চল সারথির সাপোর্টারে ভরা। নিশ্চয় আজ অনেকেই মাঠে গেছল, এখন তোকে পেলে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে, আমাকেও শেষ করে গাড়ি জ্বালিয়ে তার মধ্যে ফেলে দেবে।… মানুষ এখন ভীষণ হিংস্র হয়ে উঠেছে, জানোয়ারও লজ্জা পাবে। সামান্য সামান্য কারণে দলবেঁধে পিটিয়ে মেরে ফেলছে।”
হঠাৎ ব্রেক কষে মোটর থামিয়ে চালক গম্ভীর স্বরে বলল, ”এইখানেই নেমে যা।”
যুবক ফ্যালফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে যেন কথাটার অর্থ বুঝে উঠতে পারেনি! এই লাল স্পোর্টস শার্ট পরা, প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সি, ফরসা, সুদর্শন, কলকাতার অন্যতম বনেদি বাড়ির সন্তান দুলালচাঁদ শীল তাকেই কি ‘নেমে যা’ বলল?
অনুপম নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
অথচ এই দুলালচাঁদ—যাকে সারতি সঙ্ঘের মালি থেকে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত দুলোবাবু, দুলোদা বা দুলো বলে—আজ দুপুরেও প্রায় এক ঘণ্টা এই আকাশি রঙের মারুতি গাড়িটা নিয়ে অপেক্ষা করেছে তাকে নিয়ে সারথির টেন্টে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
গত পাঁচ বছর দুলোদা তাকে নিয়মিত গাড়িতে করে মাঠে আনেন, আবার বেলেঘাটায় তার ফ্ল্যাটে নামিয়ে দিয়ে সল্ট লেকে নিজের বাড়িতে চলে যান।
যখনই কোনও দরকারে গাড়ি চেয়েছে, দুলোদা পেট্রল ট্যাঙ্ক ভর্তি করে মারুতি বা অ্যাম্বাসাডার ড্রাইভারকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। নিজের গাড়ির মতোই সারাদিন সে ব্যবহার করেছে।
আর সেই দুলোদা এখন এই অপরিচিত, অন্ধকার রাস্তায় তাকে হুকুম করল—নেমে যা!
অনুপম ঢোঁক গিলল। একটা অভিমান বুকের থেকে ঠোঁটে এবং চোখে ধোঁয়ার মতো উঠে আসছে। ঠোঁট কামড়ে, চোখ বন্ধ করে সে নিজেকে সামলাল।
অনেক কথাই এখন সে শুনিয়ে দিতে পারে দুলোদাকে। কিন্তু না, এখন সে কোণঠাসা। এখন সে পলাতক, ফেরারি।
তাকে পালিয়ে গিয়ে কোথাও লুকিয়ে থাকতে হবে। ম্যাচটা শেষ হওয়ার দশ সেকেন্ডও আগে, টাই ব্রেকারের শেষ কিকটার আগে পর্যন্ত যারা তার অন্ধ ভক্ত ছিল, তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাকে গা—ঢাকা দিতে হবে।
চোর বা জালিয়াত সে নয়, কিন্তু আজ প্ল্যাটিনাম জুবিলি কাপ সারথির হাতে উঠেও হাত থেকে পড়ে গেল শুধুমাত্র, হ্যাঁ একমাত্র সে—ই এজন্য দায়ী।
