টিম মাঠে নামার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। অনন্ত মাথা নামিয়ে একদৃষ্টে হাতটার দিকে তাকিয়ে। যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ চটকা ভেঙে গেল যেন। অনন্ত ছুটে বেরোল।
সবার শেষে দ্বাদশ ব্যক্তি বিনয় মারাঠে নামছে সিঁড়ি দিয়ে। অনন্ত তার কাঁধে হাত রাখল।
”আমি মাঠে যাচ্ছি, তোমায় নামতে হবে না।”
”সে কী! কই, ক্যাপ্টেন তো আমাকেই…”
”ক্যাপ্টেন ভুল করে বলেছে, আমাকে আজ বল করতে হবে।”
হতভম্ব মারাঠে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রইল। অনন্ত ছুটে মাঠে নামল।
কাম্বাট্টা উইকেটে পৌঁছেছে। আরউইন আর রজার্স মাঠে পা দিয়েছে। হাজার দশেক দর্শক। কয়েকজন মাত্র তালি দিল।
বিস্ময়ে ভরে উঠল কাম্বাট্টার চোখ। বলল, ”তুমি? কে তোমায় মাঠে নামতে অনুমতি দিয়েছে?”
”আমায় বল দিন…মাত্র দুটো ওভার। আর চাইব না, মাঠ ছেড়ে চলে যাব।”
কাম্বাট্টা পরে তার আত্মজীবনীতে লেখে : ”এই একটা মুহূর্ত যা আমার স্মৃতিতে চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাকবে। আমি তাকিয়ে দেখলাম ছেলেটির মুখ। তার আধখানায় রয়েছে দেবতা, বাকি আধখানায় দানব। আমার বুকের মধ্যে একটি কম্পন জাগল। কী করব? ওকে মাঠ থেকে বার করে দেব, না বলটা ওর হাতে তুলে দেব? আমাকে তখনই, এক সেকেন্ডের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমার জীবনের বোধহয় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—আমি ওর হাতে বলটা তুলে দিয়ে বললাম, নিজেকে ফিরিয়ে আনো।
”ওর প্রথম বল কী গতিতে এল আমি তা দেখতে পেলাম না। শুনেছি ১৯৭২ সালে উৎক্ষিপ্ত পাইওনিয়ার ১০ মহাকাশযান আজও চলেছে মহাকাশ পাড়ি দিয়ে ঘণ্টায় ৪৮ হাজার কিলোমিটার বেগে। অনন্তর বলের গতি বোধহয় ওইরকমই ছিল। আরউইন ব্যাট ফেলে দিয়ে বাঁ হাত চেপে ধরে কুঁজো হয়ে গেল। তার গ্লাভস থেকে বলটা গেল উইকেটকিপারের হাতে। পরের লোক এল উডফোর্ড। তাকে দেওয়া প্রথম বলটা ইনসুইং করে (মনে করবেন ২৮ ওভারের পুরনো বল) ব্যাটসম্যানের বুটের কাছে পিচ পড়ল। উডফোর্ড শুধু দাঁড়িয়েই রইল, ব্যাটটা নামাবার কথা ভুলে। একটা বেল ৩০ গজ দূর থেকে কুড়িয়ে আনতে হয়। হ্যাটট্রিকের সামনে এল বোলান। আমরা দশজন ওকে ঘিরে। পরিষ্কার দেখলাম, বোলানের চোখে অনিশ্চিত অস্বস্তি। সে দোনামোনা করে ফরোয়ার্ড ডিফেনসিভ খেলতে গেল। ব্যাট ও প্যাডের ফাঁক দিয়ে বলটা গলে এল ব্রেক ব্যাক করে। আমরা সবাই ছুটে গেলাম অনন্তর দিকে। হ্যাটট্রিক, টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ভারতীয় বোলার বলেই নয়, আমরা পরাজয়ের দিগন্তে জয়ের সোনালি আলো দেখতে পেয়েছি।
”কিন্তু আশ্চর্য শান্ততা ওর মুখে। বলল, ম্যাচের পর এখন নয়। ৭১—০ থেকে তিন বলেই ৭১—৩। কিন্তু বিস্ময়ের শেষ ছিল অনেকদূরে। অনন্তর পঞ্চম বল মিন্টারের ব্যাট ছুঁয়ে এল স্লিপে আমারই হাতে। ৭১—৪, অনন্তর বোলিং ফিগার, ওভার শেষে হল ১—১—০—৪। একশো বছরের বিশ্ব টেস্ট—ক্রিকেটে বোধ হয় খুব বেশি বোলিং নমুনা পাওয়া যাবে না, যা এরপাশে রাখা যায়। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে, চোট থাকার জন্য কোনওরকম যন্ত্রণা দেখতে পাইনি।
”পরের ওভারে মির্জার কাছ থেকে এক রান নিল রজার্স, দু’রান নিল লটন। অনন্ত তার দ্বিতীয় ওভারের চতুর্থ বলে দিল স্লোয়ার বাউন্সার, তার আগে একটা ফাস্টার দিয়েছিল। রজার্স হুক করল। অনুপ্রাণিত ফিল্ডিং যে কী জিনিস বেঙ্কটরঙ্গন তা দেখাল। প্রায় চল্লিশ গজ ছুটে পেছন থেকে উড়ে—আসা বল সে ধরল সামনে ঝাঁপ দিয়ে। অর্ধেক অস্ট্রেলিয়া খতম ৭৪ রানে। অনন্তর দশটা বলে।
”আজও আমি যখন ওই বারোটা মিনিটের কথা ভাবি, মনে হয় যেন অলৌকিক সময়ের মধ্যে ঢুকে ছিলাম। মনে হচ্ছিল বাংলার এই তরুণটির উপর কোনও দৈবশক্তি ভর করেছে। ওকে গত তিনদিন কঠিন কর্কশ কথা বলার জন্য আমি আজও অনুতাপ করি। আসলে আমরা তো রক্তমাংসের মানুষ। কিন্তু ওই সময় অনন্ত তা ছিল না।
”সে তার পঞ্চম ওভারে আবার হ্যাটট্রিকের সামনে। চতুর্থ ও পঞ্চম বলে ফেলপস আর ব্রাইটকে সে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে দুটো লিফটিং ডেলিভারিতে। স্লিপে আমি আর সারিন ক্যাচ দুটো পেয়েছি। লেভিন এল যেন বধ্যভূমিতে। তার হাত থেকে ব্যাট পড়ে গেছল আসার সময়। ষষ্ঠ বলটা লেভিনের পিছনের প্যাডে লাগল। সবাই চিৎকার করে আবেদন জানালাম আউটের জন্য। আম্পায়ার মাথা নাড়লেন। আমরা স্তম্ভিত হলাম। আজও আমি বিশ্বাস করি, লেভিন পরিষ্কার এল বি ডবলু ছিল। অনন্ত এক ইনিংসে দু’বার হ্যাটট্রিক করেছে, এটা রেকর্ড—বইয়ে লেখা থাকবে না, কিন্তু আমার মনের খাতায় তা জ্বলজ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে।
”সাতটা উইকেট পাঁচ ওভারে। অস্ট্রেলিয়ার রান ৮৫। অনন্ত খরচ করছে ছয় রান। এই সময় সাধারণত যা হয়, কেউ একজন রুখে দাঁড়ায়। তাই হল, লটন বেপরোয়া হয়ে উঠল। মির্জার এক ওভারে ১৪, অনন্তর এক ওভারে আট রান নিল। লেভিন আউট হল মির্জার বলে একটাও রান না করে। বোধহয় অনন্তর বল থেকে পালাবার জন্যই সে ডলি ক্যাচ বোলারের হাতে তুলে দেয়।
”এবার শুধু সময়ের অপেক্ষা। চার ওভার পরই সেই সময়টা এল। অনন্ত তার নবম শিকারটি তুলে নিল লেসলিকে এল বি ডবলু করে। আম্পায়ার সেই ভদ্রলোকটিই, যিনি ডাবল—হ্যাটট্রিক থেকে তাকে বঞ্চিত করেছেন। লটন অপরাজিত রইল ৩৯ রানে। অস্ট্রেলিয়া ঠিক এক ঘণ্টা ব্যাট করেছে চতুর্থ দিনে। এই সময়ে ঠিক ৬০ রান যোগ করেছে। ১৩১ রানে ইনিংস শেষ করে ওরা হারল ৯৩ রানে। অনন্তর বোলিং : ১২—৭—২১—৯।
