ফোন বেজে উঠল।
অনন্ত উঠল ফোন ধরার জন্য। তার কল নয়, নিশ্চয় আনোখার। কোথায় সে এখন কে জানে, ডেকে আনতে হবে।
”হ্যালো।”
”অনন্ত সেনের জন্য কলকাতা থেকে ট্রাঙ্ককল আছে।”
”আমি অনন্ত সেন, লাইনটা দিন।”
অনন্তর পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিদ্যুৎ খেলে গেল। কলকাতা থেকে কে? সে একদমই আন্দাজ করতে পারছে না।
”হ্যালো অন্তু?”
”মা!”
”আমি সি এ বি অফিসে এখন। এরাই লাইন ধরিয়ে দিলেন।” তনিমা থেমে রইলেন।
”মা। আমি শেষ হয়ে গেছি।”
”অন্তু, তোর নাকি চোট হয়েছে?”
”হ্যাঁ, বাথরুমে স্লিপ করে পড়ে…।”
”অন্তু এই ফোনটা ধরতে তোকে কতটা হেঁটে আসতে হয়েছে?”
”পাঁচ—ছ’টা স্টেপ।”
”তা হলে তোর পা—দুটো ঠিক আছে।”
”এ—কথা বলছ কেন মা?”
”তোর বাবাকে তুই ভুলে গেলি অন্তু? উনি যা বলতেন কিছুই মনে রাখিসনি?”
”হ্যাঁ, মনে আছে।”
”মিথ্যে কথা।”
অনন্তর বুক কেঁপে উঠল। তার মাকে এমন বাঘিনীর মতো গর্জন করে উঠতে সে কখনও শোনেনি।
”অন্তু যেসব কথা তোর সম্পর্কে আজ কাগজে বেরিয়েছে, সব ধুয়ে—মুছে যাবে যদি তুই বাবার কথাগুলোকে মনে করার চেষ্টা করিস।…আমাদের বাড়িতে ঢুকলেই ওঁর ছবিটার মুখোমুখি হতে হয়, তাই না? তুই যখনই ঢুকবি একজোড়া চোখ তোকে প্রশ্ন করবে, ‘অন্তু তোমার জন্য আমার গর্ব হচ্ছে না কেন?’ তখন তুই কী বলবি? কী করবি? এরপর থেকে তোকে খিড়কি দরজা দিয়ে চোরের মতো বাড়িতে ঢুকতে হবে যাতে বাবার মুখোমুখি না হতে হয়।”
”না না, আমি তা পারব না মা।”
”অন্তু নিজেকে কি তোর খারাপ লাগছে?”
”আমি ঘেন্না করছি নিজেকে।”
”তা হলে এই জীবনের অর্থ কী? মূল্য কী? পৃথিবীর কিছুই তো আর তোর কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারবে না? এই অভিশাপ কাটিয়ে ওঠ অন্তু।”
”কী ভাবে মা?”
”মনে আছে রে, একদিন উনি বলেছিলেন, সেই স্কুলের টুর্নামেন্ট খেলার সময়?” ধীর কোমল নম্র হয়ে এল তনিমার স্বর, স্মৃতিভারে। ”আগের খেলায় একই মাঠে একই পিচে তুই উইকেট পাসনি, কিন্তু পরের খেলায় ছ’টা উইকেট পেলি। কেন? তোর বাবা বললেন, অপ্রত্যাশিত অনেক কিছুই এবার তুই পাবি। তোর বলে ক্যাচ পড়বে, সহজ পিচ, মাঠের খারাপ অবস্থা আর ইনজুরি যেজন্য স্বাভাবিকভাবে বল করতে পারবি না।’ তাই বলেছিলেন, ‘সব বাধাবিঘ্ন ছাপিয়ে যেতে হবে। যাতে ভাঙা পা নিয়েও বল করে উইকেট পেতে পারো, এমনভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।’ অন্তু, তুই কি সেইভাবে গড়ে উঠিসনি? তোর পা—তো ভাঙেনি, হাত তো ভাঙেনি, একটা চোট কি আত্মমর্যাদার থেকেও বেশি কষ্টের?”
”মা!” ফিসফিস করে অন্তু বলল। ”আমাকে এই ম্যাচে আর খেলতে দেবে না।”
”তোমাকে খেলতে হবে, বল করতে হবে। সেজন্য যদি মরে যেতে হয়, যাবে। আমি তোমার মৃতদেহ ফুল—চন্দনে সাজিয়ে তোমার বাবার ছবির সামনে রেখে বলব, একদিন বলেছিলে অন্তু, তোমাকে খুব বড় বলে মনে করি। এই দ্যাখো, কত বড় হয়ে ও ফিরে এসেছে, তোমার কথাই সত্যি হয়েছে…অন্তু…অন্তু আমি বলব তোর বাবাকে…আমাদের ছেলে, দ্যাখো…” কান্নায় ভেঙে পড়তে পড়তে স্বরটা রুদ্ধ হয়ে গেল। রিসিভার যেন পড়ে গেল হাত থেকে।
অন্তু অসহায়ের মতো চারপাশে তাকাল। ব্যথা, যন্ত্রণা, চোট, ইনজুরি হয়েছে না কি? কই? ছুটে গিয়ে সে দেওয়ালে আছড়ে দিল পিঠ, কোমর, কই কোথায় ইনজুরি? ঘরের মাঝে এসে আবার সে ছুটে গিয়ে দেওয়ালে আছাড় খেল। কই ইনজুরি? ”না বাবা, আমার তো লাগছে না। এই দ্যাখো…এই দ্যাখো…এই দ্যাখো।”
উন্মাদের মতো অনন্ত ঘরের দেওয়ালে বার বার নিজেকে আছড়ে ফেলতে লাগল। লাফিয়ে লাফিয়ে মেঝেয় বসে পড়ল ধপাস ধপাস শব্দ করে।
”কিছু হয়নি বাবা। এই দ্যাখো আমি সেরে গেছি।”
চিৎকার করতে লাগল সে। জানলায় গিয়ে রাস্তার আলো, পথচারী আর চলমান গাড়ির উদ্দেশে চিৎকার করে সে বলতে লাগল, ”আমার নিজেকে ভাল লাগছে…সবাই শোনো, আমার নিজেকে ভাল লাগছে…আমি খেলব, বল করব…আমি অনন্ত…”
এরপরই টলতে টলতে খাটের কাছে এসে জ্ঞান হারিয়ে সে বিছানায় পড়ে গেল।
।। সতেরো ।।
মাঠে যাবার জন্য খেলোয়াড়রা একে একে কোচে উঠেই প্রথমে থমকে অবাক চোখে পিছনে বসে—থাকা একজনকে দেখে তারপর সিটে বসল। অনন্ত জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। কাম্বাট্টারও চোখ পড়ল। গম্ভীর হয়ে গেল তার মুখ।
ড্রেসিং—রুমে অনন্ত একা বসে। সারা টিম মাঠে। ফিল্ডিং প্র্যাকটিস করছে, নেটে বল করছে।
একজন বেয়ারা ঢুকল কার্ডবোর্ডের একটা বাক্স হাতে নিয়ে।
”একজন পাঠিয়ে দিল আপনাকে দেবার জন্য।”
”আমাকে!”
অনন্ত বাক্সটা হাতে নিয়ে ভাবল, খুলে দেখবে কি? না থাক। হয়তো ছেঁড়া জুতো বা মরা ইঁদুর পাঠিয়ে কেউ তাকে অপমান করতে চায়। বাক্সটা সে টেবিলে রেখে দিল।
মাঠ থেকে একে একে ওরা ফিরছে। অনন্তকে সবাই এড়িয়ে নিজেদের মধ্যেই কথা বলছে। প্রত্যেকের মুখে গভীরতা, আর সঙ্কল্পের ছাপ।
”আরে এটা কী! কার বাক্স,” নবর বলল বাক্সটা হাতে নিয়ে। বাক্সের ঢাকনাটা খুলে সে অবাক স্বরে বলল, ”আরে দ্যাখো, দ্যাখো, একটা নকল হাত।”
অনন্ত প্রায় লাফিয়েই চেয়ার থেকে উঠল। ”আমার। আমাকে পাঠিয়েছে।”
নবরের হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে দেখল একটা চিরকুট ভিতরে রয়েছে। তাতে লেখা: ”এটা আর আমার দরকার নেই। আমার টেস্ট খেলা হয়ে গেছে।—জীবন।”
