”অনন্ত, তুমি কি আজ কোনও টেলিফোন কল পেয়েছ?” পাণিগ্রাহি জানতে চাইলেন। রাগে, দুঃখে, অপমানে ঝাঁ—ঝাঁ করছে অনন্তর মাথা। সে মাথা নাড়ল।
”আমি রিসেপশন কাউন্টারে জানিয়ে দিয়েছি তোমার ঘরে কোনও কল যেন না যায়। প্রেস এখন ঝাঁপিয়ে পড়বে তোমার খবর নিতে। তুমি বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলবে না, দেখা করবে না, ঘর থেকেই বেরোবে না। আমরা চাই না একটা কেলেঙ্কারির মধ্যে জড়াতে। এটা কি মনে থাকবে?” হরিহরণ ধমকে উঠলেন।
”এবার তুমি যেতে পারো।” পাণিগ্রাহি দরজার দিকে আঙুল দেখালেন। ”তুমি টেস্ট—কেরিয়ার শুরু না করেই শেষ করে দিলে। তোমার জন্য করুণা হচ্ছে।”
অনন্ত ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
।। ষোলো ।।
কোনও এক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে কিন্তু স্থানীয় খবরের কাগজের লোকেরা জানতে পেরে গেল।
ডেকান হেরাল্ড হেডিং করল : ”সেন ধোঁকা দিয়ে টেস্ট দলে।”
দ্য হিন্দু হেডিংয়ে বলল : ”ভার্দে কি এর থেকেও খারাপ?”
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের হেডিং : ”ভারত দলকে সেনের বাউন্সার।”
কাগজগুলো সরিয়ে রেখে গুম হয়ে অনন্ত বসে রইল। আনোখা মাঠে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। মাঝে মাঝে সে আড়চোখে অনন্তকে দেখছে।
”দেশি, জীবনকে কি কাল দেখতে পেয়েছিলে?”
”লক্ষ করিনি।”
”তুমি ম্যানেজারকে কি বলবে আমাকে আজ রাতের ফ্লাইটেই কলকাতায় পাঠিয়ে দিতে?”
”সে কী! তুমি সেকেন্ড ইনিংসে বল করবে না?”
”ব্যাটই করতে দিল না তো…।”
”তুমি চলাফেরা তো দিব্যিই করতে পারছ। আজ আমরা সারাদিন ব্যাট করছিই। কাল রেস্ট—ডে। দু’দিনে তুমি কি ফিট হতে পারবে না? আধা—ফিট হলেও চলবে।”
অনন্ত হাসল। একটা, দুটো, তিনটে ডেলিভারির পরই শিরদাঁড়ার নীচে গজাল পোঁতার মতো একটা যন্ত্রণা ঠুকে ঠুকে কেউ যেন বসাতে থাকে।
”ওরা যেসব কথা আমাকে শোনাল, তার প্রত্যেকটাই তো তোমাকে বলেছি। আমাকে বল করতে দিলেও আমি বোধহয় আর পারব না। শুধু তো শরীর দিয়েই নয়, মন দিয়েও খেলতে হয়।….বেস্ট অব লাক, দেশি।” অনন্ত বিছানায় শুয়ে পাশ ফিরল। এখন সে শুধু ঘুমোবে। রিলেও শুনবে না।
.
আনোখা বলেছিল ‘আমরা সারাদিন ব্যাট করছিই!’ কিন্তু চায়ের ঠিক পাঁচ মিনিট আগে ভারতের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হল ২০২ রানে। তার মধ্যে আছে কাম্বাট্টার অপরাজিত ৯৪ রান আর উসমানির ৩৪। দুর্গা দাসের ১২ রান ছাড়া বাকিদের মধ্যে কেউ দ্বিঅঙ্কে পৌঁছতে পারিনি। অ্যামরোজ ৫২ রানে চার উইকেট নিয়েছে ২২ ওভার বল করে। লেসলি নয় রানে দুটি উইকেট। ব্রাইট ২১ রানে দুটি। লটন ২৫ ওভার বল করে একটি উইকেট পেয়েছে ৫২ রান দিয়ে এবং রানের বেশিটাই দিয়েছে কাম্বাট্টাকে। আর ছ’টা রান তুলে সেঞ্চুরি করার সুযোগ যে—কোনও সময়ই কাম্বাট্টা তৈরি করে নিতে পারত। করেনি, শেষের দিকের ব্যাটসম্যানদের আগলে রাখতে গিয়ে সে বহুবার নিজের রান বাড়ানোর সুযোগ অবহেলায় ছেড়ে দিয়েছে। মাঠ ছেড়ে আসার সময় হাজার কুড়ি দর্শকের সঙ্গে প্রেস এনক্লোজারও উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছিল তার উদ্দেশ্যে।
অস্ট্রেলিয়াকে ২২৫ রান তুলে জিততে হবে এবং তাদের হাতে রয়েছে এত সময় যে, সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না।
তৃতীয় দিনের শেষে অস্ট্রেলিয়া বিনা—উইকেটে তুলল ৭১ রান। আরউইন ৫৩ আর রজার্স ১৪ রানে ব্যাট করছে। চারটি লেগবাই। উইকেটে কোনও প্রাণ নেই, তবে আকাশে মেঘ ভেসে আসছে। পরশু খেলার চতুর্থ দিন। জেতার জন্য দরকার ১৫৪ রান। চা—এর আগেই নিশ্চয় অস্ট্রেলিয়া তা পেয়ে সিরিজে ৪—০ এগিয়ে যাবে।
.
সারাদিন ঘরের মধ্যে, অনন্তর আর ভাল লাগছে না। ঘরের বাইরে যাওয়া তার বারণ। মাঠ থেকে আনোখা ফিরে এসে গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে রইল। অনন্ত বোঝে, এই সময়, হারের মুখে দাঁড়ানো লোককে খেলা নিয়ে জিজ্ঞেস করা উচিত নয়। এতে তাকে কষ্টই দেওয়া হবে।
কিন্তু সে তার নিজের কষ্ট—লাঘবের জন্য এখন কী করবে? যে পাষাণ তার বুকে ভার হয়ে চেপে রয়েছে, সেটা নামাবে কী করে? এটাই কি আজীবন তাকে বুকে বয়ে বেড়াতে হবে?
আনোখা স্নান করে, পোশাক বদলে বেরিয়ে গেল। একটা কথাও অনন্তর সঙ্গে বলেনি। ডাক্তার বলেছে হাড়ের চোট ওষুধ খেয়ে নয়, নড়াচড়া বন্ধ রাখলে আপনা থেকেই কমবে। তার মানে শুধু শুয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকা। বসলে চাপ পড়বে, ব্যথা লাগে। অনন্ত মনে মনে খেপে উঠতে লাগল। সবকিছুর উপরই তার রাগ হচ্ছে, সব থেকে বেশি হচ্ছে নিজের ওপর। ‘টেস্ট—কেরিয়ার শুরু না করেই শেষ করে দিলে।’ পাণিগ্রাহির কথাটা ঘুরেফিরে তার কানে বাজছে। এত বছরের খাটাখাটুনি, এত আশা, কামনা, আকাঙ্ক্ষা একটা ভুলে সব ধুলোয় মিশে গেল।
ফাঁকা ঘরে বিছানায় শুয়ে থাকা অনন্তর চোখ বেয়ে জল নামল। এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত সে কীভাবে করবে? পাণিগ্রাহী, হরিহরণরা যে—রকম রেগে গেছে, তাতে মনে হয় না সে আর কোনওদিন টেস্ট খেলার জন্য ডাক পাবে। অন্তত যতদিন ওরা ক্ষমতায় থাকবে। ইতিমধ্যে দু’চারজন ফাস্ট বোলারও হয়তো উঠে আসবে। তার সমর্থনে কোনও কাগজে কেউ একটা লাইনও আর লিখবে না। সে এবার শেষ হয়ে গেল।
বিরতি—দিনটাও দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছল। আনোখা অন্য—কোনও ঘরে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। সারা টিমটাই তটস্থ কাম্বাট্টার কড়া নির্দেশে। বাইরে গিয়ে ঘোরাঘুরি বা কোথাও নিমন্ত্রণ রাখতে যাওয়া একদম বন্ধ। তবে কেউ দেখা করতে এলে বারণ নেই দেখা করায়। মোটকথা দেহ ও মনের শক্তি ক্ষয় করা চলবে না। ম্যাচটা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
