অনন্ত ফিসফিস করে বলল, ”আনোখা ফটাফট বাকিগুলোকে নামিয়ে দাও। না হলে আমি মুখ দেখাতে পারব না।”
অস্ট্রেলিয়া চা—এর সময় ১৫৫—৫। পঞ্চম উইকেটটিও আনোখার। কিন্তু সিন্টার আর লটন ৬৯ রান জুড়ে দিয়েছে। কাম্বাট্টার হাতে সিন্টারের ইনিংস শেষ হয়। ৪৭ রান করেছে। লটন ৬৪ আর ফেলপস ১২।
চা—এর পর নাটকের মতো ব্যাপার হল। লটনকে প্রথম বলেই এল বি ডব্লু করল মির্জা। এক রান পরে ব্রাইটকে নিজের বলেই ধরল পটেল। ফেলপস রান আউট ১৭ রান করে। অ্যামরোজ বোল্ড হল মির্জার বলে শূন্য রানে। লেসলি শেষ ব্যাটসম্যান, তাকে নবর লুফল মির্জার বলে পাঁচ রানে। লেভিন ১৭ রান করে নট আউট থেকে গেল। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস ভারতের প্রথম ইনিংস থেকে ২২ রানে পিছিয়ে, ১৮৩ রানে শেষ। আনোখা ১৬—২—৬৪—৫; মির্জা ১৬—৪—৪৫—৩; পটেল ৬—১—১৩—১।
ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং অর্ডার বদলে উসমানির জায়গায় কাম্বাট্টা নিজে ওপেন করতে গেল সারিনের সঙ্গে। প্রেস এনক্লোজারে তখন গুঞ্জন উঠল। লটন, ব্রাইট আর অ্যামরোজকে ইনিংসের শুরুতে নতুন বলে খেলতে যাওয়াটা যে কাম্বাট্টার পক্ষে কতটা নির্বুদ্ধিতার কাজ হল, সেটা দেখার জন্য সাংবাদিকরা তৈরি। একজন সবাইকে শুনিয়ে বলল, ”বাইরে অ্যাম্বুলেন্স রেডি আছে তো? বুড়ো বয়সে লটন—ব্রাইটকে খেলার শখ!”
লটনের প্রথম বলটাই বাউন্সার। লেংথ থেকে সামান্য শর্ট, উঠেছেও খাড়াভাবে। কাম্বাট্টা বোধহয় আশা করেনি প্রথম বলেই এমন একটা বাউন্সার পাবে। তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে পিছোতে গিয়ে পিছলে পড়ল।
”কী বলেছিলাম, দেখলে তো!” একটা সগর্ব কণ্ঠ প্রেস এনক্লোজারে ধ্বনিত হল।
”রিফ্লেক্স আর নেই, তবু যে কেন ওপেন করতে নামা!” আর একজন বিরক্তি জানাল।
”দ্যাখো, কাম্বাট্টা এবার লটনকে পিটিয়ে ফায়ারিং লাইন থেকে সরাবার চেষ্টা করবে।” আর এক সতর্ক মন্তব্য হল।
”তার আগেই নিজেকে সরে যেতে হবে—হাসপাতালে।”
কিন্তু কাম্বাট্টা কোনও বোলারকেই পেটাল না, হাসপাতালেও গেল না। দিনের শেষে অপরাজিত রইল ৩৮ রানে, তাতে একটিও বাউন্ডারি নেই। অস্ট্রেলিয়ার তিন ফাস্ট বোলার মোট ২৬ ওভার বল করেও তার ডিফেন্সে ছিদ্র খুঁজে পেল না। ধীর এবং অচঞ্চল থেকে কাম্বাট্টা ভারতের ইনিংস ৬৪ রানে নিয়ে গেল তবে অন্যপ্রান্তে সে হারাল তার তিনজন সঙ্গীকে।
প্রথম উইকেটে যখন ৫০ রান উঠল, সারিনের তখন ১৫। লটনের বল তখন হঠাৎ জমি ঘেঁষে এসে তাকে এল বি ডব্লু করে। আরও পাঁচ রান ওঠার পর ওভারের দ্বিতীয় বলে নবরকে বোল্ড এবং চতুর্থ বলে বেঙ্কটরঙ্গনকে এল বি ডব্লু করে অ্যামরোজ। নবর তিন রান করেছে, অন্যজন শূন্য। এবারও বল নিচু হয়ে এসে রঙ্গনের প্যাডে লাগে। উসমানি পাঁচ নম্বরে যখন খেলতে নামছে, তখন আর একটা মাত্র ওভার খেলার সময় রয়েছে। কাম্বাট্টা ঝুঁকে পিচ দেখতে দেখতে উসমানিকে কিছু বলল। উসমানিও পিচের দিকে তাকাল।
”এই সময় একজন নাইট ওয়াচম্যানের আসা উচিত ছিল। তা নয়, ফেডিং লাইটে এল কি না স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান! কী ক্যাপ্টেন্সি যে হচ্ছে!” সাংবাদিকের কথায় অনেকেই সায় দিল।
উসমানি প্রথম বলটাই মিড—অনে ঠেলে দিয়ে এক রান নিল। পরের ওভারে লটনের বাউন্সার হুক করে সে তিন রান পেল। বাউন্সার, কাম্বাট্টাও হুক করল। দু’রান। পরের বলে কাট করে আবার দু’রান। দিনের শেষ বল থেকে সে এক রান পেল ফ্লিক করে।
ভারত ৮৬ রানে এগিয়ে, হাতে আছে সাতটি উইকেট অবশ্য অনন্ত যদি ব্যাট করে। দু’দিনে আউট হয়েছে ২৩ জন। দিল্লিতে প্রথম দিনেই আউট হয়েছিল ১৮ জন। প্রথম দু’দিনে সংখ্যাটা ছিল ২৫। সেই টেস্টে অস্ট্রেলিয়া চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করে জিতেছিল পাঁচ উইকেটে। এখানেও তাদের চতুর্থ ইনিংসে খেলতে হবে।
সন্ধ্যার সময় অনন্ত টোকা দিল কাম্বাট্টার ঘরের দরজায়।
”ইয়েস, কাম ইন।”
ঘরে কাম্বাট্টার সঙ্গে রয়েছে বোর্ড—প্রেসিডেন্ট পাণিগ্রাহি, সেক্রেটারি হরিহরণ, ভাইস ক্যাপ্টেন উসমানি এবং ম্যানেজার খান্না। সবাই তাকাল।
”কাল আমি ব্যাট করব।”
”তোমার ব্যাট নয়, আমার দরকার ছিল তোমার বল, যা তুমি দিতে পারলে না। ধন্যবাদ তোমার অফারের জন্য, তোমাকে ব্যাট করতে হবে না।” কাম্বাট্টা শান্ত স্বরে, থেমে থেমে বলল।
”তুমি গোছগাছ করে নিতে পারো, খেলাটা শেষ হলেই তোমাকে কলকাতার প্লেনে তুলে দেওয়া হবে।” হরিহরণের গলায় সামান্য উত্তেজনা এসে পড়ল।
”আমি যদি দুটো রানও করতে পারি, তা হলেও তো টিমের লাভ হবে।” অনন্ত কাতরস্বরে কথাটা বলে সকলের দিকে অনুনয়—ভরা দৃষ্টিতে তাকাল।
”আজ খেলার পর কম করে দশজন প্রেস রিপোর্টার আমাকে প্রশ্ন করেছে, টিমে একজন প্যাসেঞ্জার কেন রাখা হয়েছে? তাদের আর বলিনি যে, আমি চিটেড হয়েছি। জবাব দিয়েছি, টিমের নাম সাবমিট করার পর তুমি ড্রেসিং রুমে পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছ। আমাকে মিথ্যা কথা বলতে হল। হ্যাঁ, এখন দুটো রান পেলেও টিম লাভবান হবে ঠিকই, কিন্তু আমরা দশজনেই খেলব। আর এই দশজন একটু চেষ্টা করে তোমার বদান্যতার দান ওই দুটো রান তুলে দিতে পারবে বলেই মনে হয়।” কাম্বাট্টা শব্দগুলোকে চিবিয়ে চিবিয়ে মুখ থেকে বার করল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও কথা বলতে হচ্ছে বলে যেন বিরক্ত।
