”কী বিরাট ঝুঁকি নিয়ে, নামী প্লেয়ারদের ছাঁটাই করে তোমাদের মতো তরুণদের ভরসায়, তোমাদের উপর আস্থা রেখে দলটা গড়া হয়েছে। সারা দেশে এজন্য সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। কিন্তু তুমি যা করলে….সেন, তুমি শিশু নও। টেস্ট খেলার লোভটা তুমি সামলাতে পারলে না?”
গ্রিক ট্র্যাজিক নাটকের নায়কের মতো যেন কাম্বাট্টার হাহাকার সারাঘরে ধ্বনিত হল। চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে সে পায়চারি করছে। খান্নার চোখ তাকে অনুসরণ করে যাচ্ছে।
”লোভ….আকাঙ্ক্ষা….মানুষকে কোথায় যে নিয়ে যায়!” কাম্বাট্টার স্বগতোক্তি সবাই শুনতে পাচ্ছে। ”কত বছর অপেক্ষা করেছি এই দিনের জন্য। যেসব কালি আমার মুখে মাখানো হয়েছে তা মুছে ফেলে দেখিয়ে দেব আমি পেসারদের খেলতে পারি। লটন! ব্রাইট! অ্যামরোজ!….ফুঃ! এই টেস্ট আমি জিততাম, এই উইকেট ক্রমশ খারাপ হবে। অস্ট্রেলিয়াকে দেড়শো’র মধ্যে নামাতে পারতুম যদি…এই মূর্খটা আমাকে না ঠকাত।”
অনন্ত আর সহ্য করতে পারল না। সে তাড়া—খাওয়া একটা জখম পশুর মতো ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নিজের ঘরে এসে দেখল আনোখা ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে। তাকে দেখামাত্র সে অন্যদিকের লোকটিকে বলল, ”এসে গেছে, তুমি কথা বলো।” আনোখা রিসিভারটা অনন্তর দিকে এগিয়ে ধরে বলল, ”জীবন”।
হিংস্র একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল অনন্তর মুখ থেকে। রিসিভারটা ছিনিয়ে নিল সে।
”জীবন?”
”হ্যাঁ। কী বলল কাম্বাট্টা?”
”জীবন, তুই আমার চরম ক্ষতি করেছিস। চরম সর্বনাশ করেছিস। আমার আর কোথাও মুখ দেখানোর উপায় রইল না। আমি মিথ্যাবাদী, আমি ঠকবাজ, আমি লোভী….আমি অনেক লোকের ক্ষতি করেছি…আমি দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি…প্রত্যেকটা কথাই সত্যি। আমি মাথা নামিয়ে সব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি…এর জন্য কে দায়ী জানিস…তুই, তুই।”
অনন্ত এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে হাঁফাচ্ছে। ঠোঁটের কষে ফেনা জমেছে। আনোখা অবাক চোখে তাকিয়ে। ওধারে জীবন নীরব।
”এখন আমার মনে হচ্ছে, কেন সেদিন আমি স্কুটার চালাতে গেলাম, কেন অ্যাকসিডেন্টটা করলাম, কেন তোর হাতটা নষ্ট হবার জন্য নিজেকে দায়ী করলাম, কেন তুই বললি অন্তু আমার আর টেস্ট খেলা হবে না, কেন কেন কেন….তুই আমাকে চোটের কথাটা লুকিয়ে যেতে বললি কেন, তা হলে এখন এই অপমান সইতে হত না। জীবন, এখন আমার ঘেন্না হচ্ছে নিজের উপর। আমি মায়ের সামনে দাঁড়াব কোন মুখে, বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কী জবাব দেব?… তোমার শিক্ষা আমি পা দিয়ে চটকেছি, তোমার উঁচু মাথা আমি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি…জীবন, আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে, সুইসাইড…।”
অনন্ত রিসিভারটা ক্রেডলে রাখামাত্র আনোখা এগিয়ে এসে ওর হাত ধরল।
”কী বললে? সুইসাইড? না সেন, এসব চিন্তা কোরো না। লাইফের দাম অনেক, এত সহজে তা নষ্ট কোরো না। তোমার এই চোটের জন্য তো আমিই দায়ী। আমি যদি কেয়ারফুল হতাম…জীবন কাল যা বলেছে ঠিকই।”
অনন্তর পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে উচ্ছলস্বরে আনোখা বলল, ”আরে ইয়ার, ম্যাচের তো সবে প্রথম দিন খতম হল, এখনও চারদিন চলবে। দ্যাখো, কাল কী রকম বল করি। ফটাফট অস্ট্রেলিয়াকে থামিয়ে দেব। মন খারাপ কোরো না।”
অনন্ত উবুড় হয়ে বিছানায় শুয়ে রইল। টেপ রেকর্ডারে রক গান বাজছে। কিছুই তার কানে ঢুকছে না। রাতে সে আনোখার বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও খেতে গেল না।
পরদিন সকালে ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে জানালেন, বল করা চলবে না, তা হলে চোটটা জটিল অবস্থায় পৌঁছবে। নড়াচড়া না করাই এখন দরকার।
”তোমায় মাঠে যেতে হবে না। ঘরেই থাকো।”
খান্না কথাটা বলে বিরক্ত মুখে চলে গেল। কাম্বাট্টা একবারও দেখতে আসেনি অনন্তকে। তবে দলের সবাই এসে তাকে দেখে গেছে। প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে অনন্তর মনে হল, সবাই যেন অভিযোগ নিয়ে এসেছে—তুমি আমাদের বসিয়ে দিলে।
.
আনোখার টু—ইন—ওয়ানটা বিছানায় পড়ে রয়েছে। অনন্তর অনেকবার ইচ্ছে হয়েছে রিলে শোনার। কিন্তু ভয়ে সে হাত বাড়ায়নি।
বারোটার সময় তার ঘরে খাবার দিতে এল যে লোকটি, অনন্তর শরীরের কুশল জিজ্ঞেস করে বলল, ”সাব, খেলার খবর শুনছেন না? নীচে রিসেপশনে টিভি দেখছে, কী ভিড় সেখানে।”
”স্কোর কী এখন?”
”চার উইকেট পড়ে গেছে অস্ট্রেলিয়ার…”
অনন্ত প্রায় ঝাঁপিয়েই টু—ইন—ওয়ানটা তুলে বোতাম টিপল। স্টুডিওতে ফিরে যাবার আগে স্কোর পড়া হচ্ছে।
”ইন্ডিয়া অলআউট ২০৫। দিনের তৃতীয় বলেই তারসেম কুমার লটনের বলে ডিপ পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে আউট হয়েছে। সে সাত রান করেছে। লটন ৬২ রানে তিন উইকেট, ব্রাইট ৩১ রানে দু’উইকেট, অ্যামরোজ ৩৩ রানে দু’উইকেট, লেসলি ৫০ রানে তিন উইকেট।
”অস্ট্রেলিয়া লাঞ্চে চার উইকেটে ৭০। সিন্টার ব্যাটিং ৩৬, লটন ব্যাটিং ৯। চারটি উইকেটই দেশরাজ আনোখা পেয়েছে ১০ ওভারে ৩৪ রান দিয়ে। একসময়ে আনোখা ২৯ বলে সাত রান দিয়ে তিনটি উইকেট পায়। অসাধারণ বল করেছে।
”প্রথমে রজার্স একটা লিফটিং ডেলিভারি থেকে উইকেটকিপার শুক্লাকে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যায়। লেগসাইডে ঝাঁপিয়ে খুব শক্ত ক্যাচ নেয়। রজার্স করে দুই, টোটাল তখন নয়। তারপর গেল আরউইন। ১০ রান করেছে। হুক করতে গিয়ে মিসটাইম করে সহজ ক্যাচ তোলে শর্ট উইকেটে আনোখা নিজেই ধরে নেয়। টোটাল তখন ১৬। উডফোর্ড তৃতীয় বলেই শর্ট লেগে নবরকে ক্যাচ দিয়ে শূন্য করে ফিরে যায়, ওই একই টোটালে। বোলান স্লিপে কাম্বাট্টার হাতে ধরা পড়ে ১১ রানে। তখন টোটাল ৫৭। লাঞ্চে অস্ট্রেলিয়া চার উইকেটে ৭০।”
