”ব্যাটিং উইকেট। স্লো। একটু ভিজে ভিজে। উসমানির বলটা কেন যে লাফাল বুঝতে পারছি না।”
নবর ফিরে এল চায়ের আগের ওভারে, ঠিক সারিনেরই মতো অ্যামরোসের অফ—কাটারে ফেলপসের হাতে। নবরের ৪৩ রান দর্শনীয় নয়, কিন্তু উপযোগিতায় তুলনাহীন। ভারত তিন উইকেটে ১১৬। বেঙ্কটরঙ্গন ফিরে এল পাঁচ রান পরেই। অলরাউন্ডার দুর্গা দাস এসে কাম্বাট্টার সঙ্গে কথা বলে একটা ব্যাপারেই মগ্ন হল—ব্যাটিংয়ের কাজটা অন্যজনের ঘাড়ে তুলে দেওয়া। আর কাম্বাট্টা পেস বোলারদেরই বেছে নিল তার বিরুদ্ধে রটনাকারীদের উদ্দেশ্যে জবাব পৌঁছে দেবার জন্য। ৫৭ রানের জ্বলজ্বলে ইনিংস খেলে স্লিপে লেসলির হাতে ধরা পড়ল লটনের বলে। ভারত ১৬০—৫।
এরপরই অনভিজ্ঞতা বেরিয়ে এল ভারতের ব্যাটিং থেকে। দুর্গা দাস কাম্বাট্টার পিছু পিছুই ফিরে এল ১৬ রান করে এবং লেসলিকে প্রথম টেস্ট উইকেট দিয়ে। সঞ্জয় শুক্ল তার প্রথম টেস্ট ইনিংসে শূন্য রান করল। মির্জা করল এক রান। তিনজনই পিটিয়ে বোলিং ছাতু করতে চেয়েছিল। কিন্তু অনন্ত চেয়েছিল প্রথম বলেই আউট হয়ে ফিরে আসতে।
ব্যাট ধরে ঝুঁকে যাতে স্টান্স না নিতে হয় সেজন্য সোজা হয়ে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে থেকে লেসলির বলে প্রায় চোখ বুঁজেই অনন্ত ব্যাট চালায়। তিন বলে তিনটি ছয় বোলারের মাথার ওপর দিয়ে। চতুর্থ বলে স্টাম্পড। হাঁফ ছেড়ে সে ফিরে এল চেয়ারে বসা কাম্বাট্টার পাশ দিয়েই। তখন একবার কাম্বাট্টা তার মুখের দিকে তাকাল মাত্র। সেই মুখে ছিল থমথমে রাগ।
দিনের শেষে ভারত করল নয় উইকেটে ২০৩ রান।
.
”তোমরা কি একজিবিশন ম্যাচ খেলছ?”
ড্রেসিং রুমে কাম্বাট্টা ঠাণ্ডা গলায় কথাটা বলল। স্বরে কাঠিন্য। সবাই চুপ। অনেকের মাথা নিচু হয়ে গেল।
”এটা পাঁচ দিনের ম্যাচ, ওয়ান—ডে ম্যাচ নয়। বারবার বলে দিলাম, ধরে ধরে খেলো। কেউ শুনলে না। এভাবে টেস্ট খেলা হয় না। কেউ নিজেকে ঢেলে দেবার চেষ্টা করলে না। তোমাদের কি উচ্চচাশা নেই? একটা টেস্ট ম্যাচ খেলেই কি মনে করছ, জীবন সার্থক হয়ে যাবে? তোমাদের উপর বোর্ড ভরসা রেখে প্রতিষ্ঠিত নামী প্লেয়ারদের বাদ দিয়েছে। তার প্রতিদান কি এইভাবে দেবে? তোমাদের নিজেদেরও কি নিজের সম্পর্কে উঁচু ধারণা নেই, মর্যাদাবোধ নেই?”
এরপর কাম্বাট্টা একে একে প্রত্যেকের খেলার ত্রুটির কথা বলতে বলতে অনন্তর দিকে তাকিয়ে বলল, ”তোমার কী হয়েছে? ওইভাবে স্টান্স নিয়ে ব্যাট করার কারণ কী? নিচু হতে অসুবিধে হচ্ছে?”
বুক শুকিয়ে গেল অনন্তর। আমতা আমতা করে বলল, ”তা নয়। লেসলির ফ্লাইট বুঝতে অসুবিধা হয় বলেই দাঁড়িয়ে খেলছিলাম।”
”অ।”
মাত্র একটি শব্দ ও সন্দিগ্ধ চাহনি মারফত কাম্বাট্টা জানিয়ে দিল অনন্তর যুক্তি তার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।
লাক্সারি কোচে হোটেলে ফেরার সময় আনোখা ফিসফিসিয়ে বলল, ”খুবই কি ব্যথা লাগছে? কাল বল করতে হবে।”
অনন্ত মাথা নাড়ল। যার অর্থ হ্যাঁ এবং না দুইই হয়।
হোটেলে কোচটা দাঁড়াতে সবাই সার দিয়ে নামতে শুরু করল। অনন্তর ঠিক আগেই কাম্বাট্টা। রুমালে মুখ মুছছে, কাঁধে একটা চামড়ার ব্যাগ। কোচের দরজা দিয়ে নামার সময় কাম্বাট্টার হাত থেকে রুমালটা জমিতে পড়ে গেল। পিছনে অনন্ত।
”সার, ইওর কারচিফ।”
কাম্বাট্টা এগিয়ে গেছে কয়েক পা, ঘুরে দাঁড়াল। অনন্ত ঝুঁকে তুলতে গিয়ে ”উঃ হ—হ—হ” বলেই সিধে হয়ে গেল। তারপর শরীরটাকে খাড়া রেখে হাঁটু ভেঙে নিচু হল, হাত ঝুলিয়ে।
রুমালটা হাতে নিয়ে কাম্বাট্টা লোহার মতো কঠিন স্বরে বলল, ”এখনই ডাক্তার দেখাও। ঘরে যাও, আমি আসছি।”
কাম্বাট্টা দ্রুত পায়ে ভিতরে ঢুকে গেল। অনন্ত তখন দুটো ব্যাপার বুঝতে পারল। রুমালটা ইচ্ছে করেই ফেলা হয়েছে তার চোট আছে কি না পরীক্ষা করতে আর এবার কপালে প্রচণ্ড দুর্ভোগ আছে।
ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়ে শর্ট—ওয়েভ সেঁক দিয়ে ব্যথা সারার কয়েকটা বড়ি দিলেন খাওয়ার জন্য। বললেন, ”বিশ্রাম ছাড়া আর কিছু করার নেই।”
ফিরে আসামাত্র কাম্বাট্টা তার ঘরে অনন্তকে ডেকে পাঠাল। অনন্ত ঘরে ঢুকে দেখল রাকেশ খান্নাও বসে। দু’জনের মুখ থমথমে।
”তোমার কাছ থেকে এই মিথ্যাচার আমি আশা করিনি। জানো, তুমি কত ক্ষতি করলে, শুধু এই টিমেরই নয়, দেশেরও? তুমি কি ভুলে গেছ, ক্লাবের নয় দেশের হয়ে খেলছ, কোটি কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছ?”
কাম্বাট্টার গলা মৃদু থেকে ধীরেধীরে উচ্চগ্রামে উঠতে শুরু করল। অনন্তর মাথা ক্রমশ নীচের দিকে নেমে এল। খান্না চুপ করে একদৃষ্টে তাকিয়ে তার মুখের দিকে।
”কাল রাতেই তুমি বলতে পারতে। আজ সকালেও বলতে পারতে টিমের নাম সাবমিট করার আগে। তা হলে একটা সুস্থ লোককে দলে নিতে পারতাম! আমার প্ল্যানিংয়ে তুমি একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এখন প্ল্যানটাই ভেঙে পড়ল। সব ওলটপালট, ছত্রাকার হয়ে গেল।”
কাম্বাট্টা মাথা নিচু করে কী যেন ভাবছে। অনন্ত ক্রমশ পাথরে রূপান্তরিত হচ্ছে দেহে রক্ত চলাচল করছে না, শ্বাস—প্রশ্বাস বন্ধ, চোখের পলকও পড়ছে না। তার আর কিছু বলার নেই। অন্যায়, চরম অন্যায় সে করেছে। কোনও কৈফিয়ৎ, কোনও অজুহাত তার দেবার নেই। এত দুঃখজনক অপমানের সামনে সে কখনও দাঁড়ায়নি। এখন মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই তাকে উদ্ধার করতে পারবে না। কিন্তু সে যে পাথর হয়ে যায়নি সেই প্রমাণ দিতেই বোধহয় তার দু’চোখ থেকে টপটপ জল পড়ল।
