ফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলে ”অনন্ত সেন স্পিকিং” বলতেই ওধার থেকে জীবন বলল, ”অন্তু ব্যথাটা কেমন?”
”দ্যাখ জীবন, তুই কাল খুব অন্যায় কাজ করেছিস ওভাবে আনোখাকে বলে।”
”চুলোয় যাক আনোখা। তুই নিজের কথা আগে ভাব। ব্যথা আছে এখনও?”
”না।”
”বাঁচালি। কাল সারারাত আমি…”
অনন্ত ফোন রেখে দিল।
”জীবন ফোন করেছে?”
”সে চমকে ফিরে তাকিয়ে দেখল আনোখা বিছানায় উঠে বসেছে।
”না। আমার এক বন্ধু, এখানেই থাকে। কনগ্র্যাচুলেট করল।”
”তোমার ইনজুরিটা এখন…”
”ঠিক আছে। পারফেক্টলি অলরাইট।”
মাঠে পৌঁছে যখন সে নেটে বল করতে গেল একটা ব্যাপারে সতর্ক থাকল, কোনওভাবেই যেন সে ঝুঁকে না পড়ে। ছুটে আসার ঝাঁকুনিতে মনে হচ্ছে গরম শিক দিয়ে যেন শিরদাঁড়ার নীচে কেউ খোঁচা দিচ্ছে। প্রায় দাঁড়িয়ে সে বল করার চেষ্টা করল, ফলো—থ্রুতে না গিয়ে।
”কী ব্যাপার, এমনভাবে বল করছ কেন? ঠিকভাবে বল করো।” কাম্বাট্টা এগিয়ে এসে বলল।
”হ্যাঁ করছি। হাত—পা’টা ছাড়িয়ে নিচ্ছিলাম।”
এগারো পা ছুটে এসে অনন্ত এর পরের ডেলিভারিটা করেই ঝোঁকা অবস্থায় চার—পাঁচ পা এগিয়ে গেল। যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত হয়ে উঠেছে, কিন্তু মুখ থেকে শব্দ বার হতে দিল না। ব্যাট করছে উসমানি। পিছিয়ে গিয়ে ডিফেন্সিভ খেলেছে। বলটা গড়িয়ে আসছে অনন্তর দিকেই। নিচু হয়ে বলটা তোলার ভরসা তার হল না। পা দিয়ে থামিয়ে হাঁটু ভেঙে হাতটা নামিয়ে দিয়ে সে বলল কুড়োল। ব্যাপারটা লক্ষ করল শুধু দুটি লোক। আনোখা আর স্টেডিয়ামে বসা জীবন।
পরপর তিনটি টেস্টম্যাচ ভারত হেরে যাওয়ায় সিরিজের আকর্ষণ উবে গেছে। তার উপর নামী খেলোয়াড় একজনও নেই। এই টেস্টও তো গোহারান হারবে। তার উপর মেঘলা আকাশ। গত রাত্রে বৃষ্টি হয়ে গেছে, আজ ভোরেও দু’পশলা হয়েছে। খেলা তো যে কোনও সময় বন্ধ হয়ে যাবে, পয়সা উশুল হবে না। তার থেকে বাড়িতে টিভি দেখাই বিবেচকের মতো কাজ হবে। বোধহয় এইসব কারণেই টিকিট বিক্রি হয়নি। স্ট্যান্ডের অধিকাংশ জায়গাই জনশূন্য।
টস জিতেছে কাম্বাট্টা। ভারত ব্যাট করবে। অনন্তর বুক থেকে বিরাট একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল। আজকের দিনটা তা হলে আর বল করতে হচ্ছে না। পুরোই রেস্ট পাওয়া যাবে। ভারত কি সারা দিনটা ব্যাট করে যেতে পারবে না? প্যাড পরে উসমানি আর সারিন চেয়ারে ঠেস দিয়ে বসে। দ্বাদশব্যক্তি বিনয় মারাঠে। অফ স্পিনার গৌড়া স্থানীয় ছেলে। তাকে আর লেগ স্পিনার বোম্বাইয়ের জ্যোতি পটেলকে রিজার্ভে রাখা হয়েছে। দলে মাত্র একজন স্পেশালিস্ট স্পিনার, পঞ্জাবের তারসেম কুমার। অবশ্য কাম্বাট্টা নিজেও ভাল অফ ব্রেক করায়। কিন্তু মাত্র একজন খাঁটি স্পিন বোলার নিয়ে ভারত কবে শেষবার টেস্ট খেলেছে, অনেকেই তা বলতে পারল না। যেমন অনেকেই মনে করতে পারল না, চারজন পেস বোলার নিয়ে—আনোখা, অনন্ত সেন, দুর্গা দাস আর ফারুক মির্জা—ভারত আদৌ কখনও টেস্টম্যাচ খেলেছে কি না!
ভারত দলের এগারো জনের নাম যখন প্রেসবক্সের স্কোরার চেঁচিয়ে জানিয়ে দিচ্ছিল, তখন এক সাংবাদিক সবাইকে শুনিয়ে বিদ্রূপ করে বলে ওঠে: ”ওরে বাবা, অ্যাতো পেস বোলার! ওয়েস্ট ইন্ডিজ হয়ে গেল নাকি ইন্ডিয়া টিম?”
তখন আর একজন টিপ্পনি কাটে: ”ফিরোজ নওরোজি লয়েড কি আমাদের স্কিপার?”
”এইবার গ্রিনিজ আর হেইন্স ব্যাট করতে নামবে। লটন আর ব্রাইটের কী দুর্দশা যে এবার হবে!”
বোলান অস্ট্রেলিয়া দলকে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। তাদের বাঁ হাতি লেগ স্পিনার লেসলি প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলবে। উসমানি আর সারিন মাঠে নামতে কিছু হাততালি পড়ল।
অনন্তর চোখ খুঁজে বার করছে জীবনকে। সামনে থেকে চতুর্থ সারিতে, মাঝামাঝি জায়গায়। তবে ওর চেয়ারের পাশ দিয়েই যাতায়াতের পথ। ড্রেসিং রুমে টি ভি সেট রয়েছে। অনন্ত ঠিক করল, চেয়ারে কাত হয়ে পা ছড়িয়ে সে টিভি—তেই দেখবে। বাইরে ওইভাবে বসে খেলা দেখা সম্ভব নয়।
প্রথম দুটো ওভার মেডেন। প্যাড পরে কামবাট্টা থুতনিতে হাত রেখে টিভি—র সামনে। ওর চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না মনের খবর। অনন্ত বসেছে কাম্বাট্টার পিছনে।
সাত ওভার হয়ে গেছে। উসমানি লটনকে দুটো স্ট্রেট ড্রাইভে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে নয় রানে। ব্রাইটের বল আচমকা লাফাল প্রায় গুড লেংথ থেকে। উসমানি মুখের কাছে ব্যাট তুলল। শর্ট লেগ রজার্সের হাতের মধ্যে বলটা পড়ল। ১২ রানে ভারত প্রথম উইকেট হারল। টিভি পরদায় দেখা গেল নবর নামছে। কাম্বাট্টা পরের ব্যাটসম্যান। ঘর থেকে সে বেরিয়ে গেল। উসমানি গম্ভীরমুখে ঘরে ঢুকল। গোঁজ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে প্যাড খুলতে শুরু করল।
যেন জমি আঁকড়ে পড়ে থাকার প্রতিযোগিতা। সারিন আর নবর, দু’জনে মিলে ৬৫ রান তুলল ৩০ ওভার খেলে। শুধু একবারই সারিন ধৈর্য হারিয়ে পরপর লটনকে দু’বার হুক করে বাউন্ডারিতে পাঠিয়েই নিজেকে ধামাচাপা দিয়ে ফেলে।
ভারতের ৭৭ রানে সারিন উইকেটকিপার ফেলপসের গ্লাভসে অ্যামরোজের একটা অফ—কাটার পৌঁছে দিয়ে ফিরে এল ৩০ রান করে। কাম্বাট্টা নামল এবং অ্যামরোসের প্রথম দুটো বল থেকে হুক করে চার, অন ড্রাইভ করে তিন রান নিল। ঝিমোন মাঠ হঠাৎ গরম হয়ে উঠল।
সারিন ফিরে আসতেই আনোখা জিজ্ঞাসা করল, ”উইকেট কী বুঝছ?”
