”রাবড়িইইই—আনোখা দু’হাত মুঠো করে চিৎকার করে উঠল।
বাথরুম থেকে অনন্তর উৎকণ্ঠিত গলায় ”আমার নাম…” এই কথা দুটো ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গে পিছলে গিয়ে ধপাস করে পড়ার শব্দ শোনা গেল।
”আআহ…জীবন, একবার আয় তো।”
”কী হল, কী হয়েছে অন্তু?” একপাটি চটি ছিটকে বাথটাবের কাছে। দু’হাতে ভর দিয়ে অনন্ত ওঠার চেষ্টা করছে।
”আনোখা, আনোখা।” জীবন বগলের নীচে হাত রেখে অনন্তকে তোলার চেষ্টা করতে করতে ডাকল।
ততক্ষণে আনোখা এসে পড়েছে। নিজের কপালে একটা চড় মেরে সে ”হায়, এ কী কাণ্ড!” বলে সে অনন্তকে টেনে দাঁড় করাল।
”আমারই গলতি হয়ে গেছে। জল দিয়ে সাবান ধুয়ে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ফোনটা আসতেই এত ব্যস্ত হয়ে গেলুম।” আনোখা অনুতপ্ত গলায় বলল।
”আমিই ওকে মুখে—চোখে জল দেবার জন্য বলেছি। তাই শুনেই ও বাথরুমে…” জীবনের গলা ধরে গেল।
”কী বললেন খান্নাসাব?” অনন্ত ধীরে ধীরে হেঁটে এসে খাটে বসল।
আনোখার মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। ”সেন তুমি ফার্স্ট ইলেভেনে আছ।”
”অন্তু, তা হলে তুই টেস্ট খেলছিস।” জীবনের চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল।
”সেন তোমার কোথাও লেগেছে কি না দ্যাখো, তা হলে এখনই ডাক্তারকে খবর দেব।”
”না না, ডাক্তার নয়।” জীবন ব্যস্ত হয়ে বলল, ”অন্তু, হেঁটে চলে দ্যাখ তো।”
অনন্ত উঠে দাঁড়িয়ে ঘরে হাঁটতে লাগল।
”না অ্যাঙ্কেলে বা হাঁটুতে কিছু হয়নি। একেবারে থেবড়ে বসে পড়েছি তো।” অনন্ত তার শিরদাঁড়ার নীচের দিকে লাম্বারেরও তলার অঞ্চলে হাত রেখে বলল।
”একটু সামনে ঝুঁকে দ্যাখো তো?”
আনোখার কথায় সে সামনে ঝুঁকেই বলল, ”সামান্য লাগছে।”
”ফলো থ্রু—র অ্যাকশনে একবার দ্যাখ। জীবনের গলা কেঁপে উঠল।
ঘরের ফাঁকা জায়গায় অনন্ত চার—পাঁচ কদম দ্রুত হেঁটে গিয়ে ডেলিভারি দেবার জন্য লাফিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ল বাঁ পায়ে দেহের ভার রেখে।
”আঃ।” অস্ফুট কাতরানি তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল।
”লাগছে?” আনোখা হাত রাখল অনন্তর পিঠে। ”কাল জীবনের প্রথম টেস্ট খেলতে নামবে। হান্ড্রেড পারসেন্ট ফিট না হলে তোমার মাঠে নামাই হবে না! আর একবার করো, তারপর বলো লাগছে কি না।”
”না না আর করতে হবে না।” জীবন হঠাৎ কেমন রুক্ষ, ব্যস্ত স্বরে বলে উঠল, ”অন্তু হান্ড্রেড পারসেন্টই ফিট রয়েছে।”
”জীবন তুমি বুঝছ না…”
”খুব বুঝছি। আনোখা, ক্রিকেট আমিও একসময় খেলেছি। আজ রাত্তিরটা রেস্ট নিলেই কাল ঠিক হয়ে যাবে ব্যথা—টাথা। ডাক্তার দেখিয়ে আর ঝামেলা পাকাতে হবে না। আনোখা তুমি ডাক্তার ডেকো না আর এই ব্যাপারটা কাউকে বলতেও যেও না।”
”ইনজুরিটা চেপে যাবে!”
”হ্যাঁ যাবে।” জীবন হঠাৎ যেন খেপে উঠল। ”এতদূর পর্যন্ত এগিয়ে এসে অন্তু টেস্ট খেলতে পারবে না! তাই কখনও হয়!”
”কিন্তু খুব ভুল করা হবে তা হলে। স্কিপার যদি জানতে পারে…জীবন তুমি কি এই ম্যাচটার গুরুত্ব বুঝতে পারছ না? বোর্ড কি ঝুঁকি নিয়েছে, এতগুলো নতুন ছেলের কেরিয়ার এই ম্যাচের উপর কতটা নির্ভর করছে, এসব কি তুমি বুঝতে পারছ না?”
”পারছি। কিন্তু অন্তুর এই ঘটনাটা কেন ঘটল বলতে পার? তুমি যদি কেয়ারলেস না হতে, তুমি যদি বাথরুমের মেঝেতে সাবানের ফেনা ছড়িয়ে না রাখতে তা হলে ওর এই অবস্থা হত না।”
”সেন আমি সরি, সত্যিই দুঃখিত। ইচ্ছে করে তো আর এটা করিনি।” আনোখা বিষণ্ণ চোখে তাকাল।
কিন্তু জীবন তাকাল অন্য দৃষ্টিতে চোখ—দুটো সরু করে। তাই দেখে আনোখা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। মুখ থেকে রক্ত সরে গেছে।
”জীবন তুমি কি ভাবছ আমি ইচ্ছে করে…!”
জীবন গম্ভীর হয়ে রইল।
”জীবন, তুই কী বলছিস? একদমই বাজে ধারণা তোর। আনোখা আমার বন্ধু, আমার হিতৈষী। এরকম নোংরা জিনিস ওর মনে কখনওই আসে না।” এতক্ষণ পর অনন্ত কথা বলল। ”আমার কিছু হয়নি। ওটুকু ব্যথা তো যখন তখন হয়। এই তো সেদিন ফিল্ড করার সময় ঝাঁপালাম, কাঁধে লাগল, আবার তিন মিনিট পরেই বল করলাম।”
”আনোখা, তা হলে তুমি ডাক্তার ডেকো না আর। ব্যাপারটা কাউকে বোলো না। শুনলে তো ও নিজেই বলল, ওর লাগেনি।”
আনোখার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে রয়েছে। সে শুধু বলল, ”তাই হবে।
।। পনেরো ।।
ভোরবেলায় অনন্তর ঘুম ভাঙল, প্রথমেই তার মনে এল আজ জীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হবে। বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে অস্ফুটে অনন্তর মুখ থেকে একটা কাতর শব্দ বেরিয়ে এল। সে চকিতে পাশের বিছানার দিকে তাকাল। আনোখা ঘুমিয়ে রয়েছে। দু’হাতে ভর দিয়ে সে উঠে বসল। কী অদ্ভুতভাবেই না অধ্যায়টা শুরু হতে যাচ্ছে। জানলা দিয়ে দেখল ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ মেঘলা।
হাঁটতে অসুবিধা হল না। কিন্তু ব্যথাটা অনুভব করছে। অনন্ত হালকা পায়ে ঘরের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে বিছানায় বসতেই শিরদাঁড়ার নীচের দিকে চাপ পড়ে যন্ত্রণার খোঁচা লাগল। সে উঠে দাঁড়াল। ভাবল, রেস্ট নিলে, গরম সেঁক আর মালিশ করে, কয়েকটা পেইন কিলিং ট্যাবলেট খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এসব করতে গেলেই তো জানাজানি হয়ে যাবে! তার থেকেও বড় কথা, জীবন যে ইঙ্গিতটা কাল করে গেছে তাতে আনোখা রীতিমত আহত হয়েছে, মুষড়েও পড়েছে।
অথচ সত্যিই ওর কোনও দোষ নেই। বেচারিকে দোষমুক্ত করার জন্যই তাকে এই ম্যাচে বল করে বুঝিয়ে দিতে হবে তার কোনও চোট নেই। নয়তো আনোখা মরমে মরে থাকবে। এইভাবে ওর বুকে পাষাণভার চাপিয়ে দেওয়াটা জীবনের উচিত হয়নি। বন্ধুর জন্য উপকার করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বন্ধুকেই সে অপ্রতিভ করে দিয়েছে। ওকে বলতে হবে, তুই বাপু আর বেশি কথা বলিসনি। এই হোটেলে আর আসিসনি।
